গীতায় এক প্রত্যয়ের ম‌হিমা

জীবাত্মায় এক অং‌শে পরমাত্মা অপর অং‌শে প্রকৃ‌তির অ‌ধিষ্ঠান । জীবাত্মা যখন পরমাত্মার দি‌কে অগ্রসর হয় , তখন তার ম‌ধ্যে নিশ্চয়া‌ত্মিকা বু‌দ্ধি আ‌সে আর যখন সে প্রকৃ‌তির অংশ শরীর ও সংসা‌রের দি‌কে চা‌লিত হয় , তখন তার বু‌দ্ধি বহু দি‌কে ধা‌বিত হয় , ত‌ার অব্যবসা‌য়া‌ত্মিকা ব‌ু‌দ্ধি হয় ।
তাৎপর্য এই যে , পারমা‌র্থিক সাধ‌কের এইপ্রকার নিশ্চয়া‌ত্মিকা বু‌দ্ধি হয় যে , " পরমাত্মা‌কে পে‌তে হ‌বে , তা‌তে যাই হোন না কেন । ' কিন্তু যে ব্য‌ক্তি সাংসা‌রিক ধন - সম্পত্তি সংগ্রহ কর‌তে ও জাগ‌তিক সুখ‌ভোগ কর‌তে চায় , তার পরমাত্মাপ্রা‌প্তির উপায়স্বরূপ নিশ্চয়া‌ত্মিকা বু‌দ্ধি হয় না ।
অপরপ‌ক্ষে জাগ‌তিক ভোগ প্রা‌প্তির জন্য তার ম‌নে বিচা‌রের শেষ থা‌কে না । এর কারণ হ‌চ্ছে যে , পরমাত্মা এক এবং তাঁ‌কে পাবার নিশ্চয়া‌ত্মিকা বু‌দ্ধিও একই হয় । সাংসা‌রিক ভোগ অসংখ্য এবং তা ভোগ করবার ( ধন - সম্পত্তি ) সাধনও অ‌নেক , তাই সেইসব প্রা‌প্তির এক‌নিষ্ঠ বু‌দ্ধিও হয় না ।
পরমাত্মা সগুণ , নির্গুণ ইত্যা‌দি স্বরূ‌পের ভেদ থাক‌লে‌ও এইসকল স্বরূপ তত্ত্বতঃ এক এবং নিত্য । সুতরাং পরমাত্মার কোন এক‌টি স্বরূ‌পের প্রা‌প্তির নিশ্চয়তাও একই হয় । পরমাত্মাপ্রা‌প্তির লক্ষ্য য‌দি এক নিশ্চয় হয় , তাহ‌লে সমস্ত সাধনই সহজ সরল হ‌য়ে যায় এবং উ‌দ্দে‌শ্যে সি‌দ্ধির জন্য তৎপরতাও স্বতঃই হ‌য়ে যায় ।
যেমন কেউ য‌দি নি‌জে‌কে ঈশ্ব‌রের ভক্ত ব‌লে মে‌নে নেয় , তাহলে ঈশ্ব‌রের ভ‌ক্তি করা তার প‌ক্ষে স্বাভাবিক হ‌য়ে যায় । অর্থাৎ ভ‌ক্তি সম্বন্ধীয় কথা সে তখন গ্রহণ ক‌রে এবং ভ‌ক্তি -‌বি‌রোধী কথা সে তৎক্ষণাৎ ত্যাগ ক‌রে । কারণ সে তখন এই কথাই ভা‌বে যে , ' আ‌মি ভক্ত , কা‌জেই ভ‌ক্তি -‌বিরুদ্ধ কাজ আম‌ার করা উ‌চিত নয় । '
কিন্তু যা‌দের লক্ষ্য থা‌কে সংসা‌র- ভো‌গের , তা‌দের কখনও এ‌দি‌কে কখনও ও‌দি‌কে , এইরূপ নানারকম বাসনা ম‌নে জন্মা‌তে থা‌কে । সেই বাসনার কখনও অন্ত হয় না , কেননা এক বাসনা পূ‌রিত হবার সঙ্গে স‌ঙ্গে নতুন বাসনা উৎপন্ন হ‌তে থা‌কে । ফলে জীবন দুঃ‌খে প‌রিপূর্ণ হয়ে যায় ।
এই ব্যবসায়া‌ত্মিকা ( নিয়শ্চা‌ত্মিকা ) বুুদ্ধির এমনই ম‌হিমা যে অতি দুরাচার বা অ‌তি পাপ্র‌ি ব্য‌ক্তিও য‌দি , " আ‌মি পরমাত্ম‌া‌কে প্রাপ্ত হব ' - এইরূপ সিদ্ধান্ত ক‌রে , তাহ‌লে সে খুব শীঘ্র ধর্মাত্মা হ‌য়ে যায় । শুধু ধর্মাত্মাই নয় , তার নিত্য শা‌ন্তি লাভ হয় অর্থাৎ তার উ‌দ্দেশ্য সিদ্ধ হয় ।
অব্যবসায়া‌ত্মিকা বুদ্ধিযুক্ত মানুষ যতবার জন্ম নেয় ততবারই সে নানা উ‌দ্যোগ , প‌রিশ্রম কর‌তে থা‌কে , কিন্তু তার বাসনার পরিপূ‌র্তি হয় না । আস‌লে , নতুন নতুন বাসনা জন্মা‌তে থা‌কে , যার কখনো শেষ হয় না । য‌দি কখনও কোনও বাসনার পূ‌র্তি হয় , তাহ‌লে সেটিও ভ‌বিষ্য‌তে নতুন - নতুন কামনা সৃ‌ষ্টির কার‌ণ প‌রিণত হবে ।
এই তাৎপর্য এই যে , ব্যবসায়া‌ত্মিকা বু‌দ্ধি হ‌লে অব্যবসায়া‌ত্মিকা ব‌ু‌দ্ধি চ‌লে যায় , কিন্তু অব্যবসায়া‌ত্মিকা বু‌দ্ধি থাক‌া‌তে কখনো ব্যবসায়া‌ত্মিকা ( নিশ্চয়া‌ত্মিকা ) বু‌দ্ধি হয় না । সুতরাং মানু‌ষের উ‌চিত যে ,সে যেন শীঘ্র পরমাত্মা - প্রাপ্তি‌কে স্থির লক্ষ্য ক‌রে নেয় । কারণ পরমাত্মা - প্র‌া‌প্তির জন্য শরীর পাত হ‌য়ে গে‌লে আমরা ভগবৎপ্রা‌প্তি থে‌কে ব‌ঞ্চিতই র‌য়ে যায় ।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post