অস্ত্রশিক্ষা প্রদর্শন

অস্ত্রশিক্ষা প্রদর্শন

একদিন ব্যাসদেব, কৃপাচার্য্য, ভীষ্ম, বিদুর প্রভৃতির সমক্ষে দ্রোণাচার্য্য ধৃতরাষ্ট্রকে বলিলেন-মহারাজ, কুমারদের অস্ত্রশিক্ষা সম্পূর্ণ হইয়াছে। এক্ষণে আপনি অনুমতি দান করিলে তাহারা নিজ নিজ শিক্ষা প্রদর্শন করিতে পারে। ধৃতরাষ্ট্র সন্তুষ্ট হইয়া অনুমতি দিলেন। তৎপরে ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে এবং দ্রোণাচার্য্যের নির্দেশে বিদুর সমতল স্থানে এক বিশাল রঙ্গভূমি নির্মাণ করাইলেন।

নির্দিষ্ট দিনে যথাসময়ে ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্রাদি পৌরবর্গ এবং গান্ধারী কুস্তী প্রভৃতি পুরনারিগণ প্রেক্ষাগারে রঙ্গমঞ্চে গিয়া বসিলেন। রঙ্গমঞ্চ লোকে লোকারণ্য হইয়া গেল। শুক্ল বেশে দ্রোণাচার্য্য সশিষ্য রঙ্গমঞ্চে প্রবেশপূর্ব্বক আদেশ দান করিলে রাজকুমারগণ একে একে নিজ নিজ অস্ত্রবিদ্যা ও রণকৌশল প্রদর্শন করিতে লাগিল। দর্শকগণ মুগ্ধ হইয়া ধন্য ধন্য করিতে লাগিল। ভীম ও দুর্যোধন গদাহস্তে মস্ত হস্তীর ন্যায় পরস্পরের সম্মুখীন হইয়া যুদ্ধ করিত লাগিলেন। পরিণাম গুরুতর হইবার ভয়ে দ্রোণাচার্য্যের আদেশে অশ্বত্থামা উভয়কে নিরস্ত করিলেন।

সর্ব্বশেষে অর্জুন তাঁহার অত্যদ্ভুত অস্ত্র প্রয়োগকৌশল ও রণনৈপুণ্য প্রদর্শন করিলেন। দর্শকগণ তাহা দর্শনে শতমুখে প্রশংসা করিতে লাগিলেন। এমন সময়ে মহাদর্পে কর্ণ রঙ্গভূমিতে প্রবেশ করিয়া বলিলেন-অর্জুন তুমি যাহা দেখাইয়াছ আমি তাহা সমস্তই দেখাইব। আচার্য্যের অনুমতি লইয়া কর্ণ সর্ব্ব বিদ্যা দেখাইলেন। দুর্য্যোধন কর্ণের কৃতিত্ব দর্শন করিয়া তাহাকে সখারূপে বরণ করিলেন। অর্জুন অপমানিত বোধ করিলেন। কিছুক্ষণ বাদানুবাদের পর কর্ণার্জুন যুদ্ধার্থ প্রস্তুত হইলেন।

কর্ণকে চিনিতে পারিয়া দুই পুত্রের বিবাদের আশঙ্কায় কুত্তী মূর্ছিত হইয়া পড়িলেন। এইসময় কৃপাচার্য্য আসিয়া বলিলেন-কর্ণ, অর্জুন কুরুবংশজাত পান্ডুর পুত্র। তুমি কোন্ রাজকূলে জন্মগ্রহণ করিয়াছ? তোমার পিতামাতার পরিচয় দাও। রাজপুত্রেরা হীনকুলশীল প্রতিদ্বন্দ্বীর সহিত যুদ্ধ করেন না। এইকথা শুনিয়া কর্ণ মলিন মুখে মস্তক অবনত করিলেন। দুর্য্যোধন তৎক্ষণাৎ বলিলেন-অর্জুন যদি রাজা ভিন্ন অন্যের সহিত যুদ্ধ না করেন, তাহা হইলে আমি এখনই কর্ণকে অঙ্গরাজ্যে অভিষিক্ত করিতেছি। এই বলিয়া দুর্য্যোধন রত্নময় পীঠোপরি বসাইয়া কর্ণকে অঙ্গরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন।

ইতিমধ্যে ষষ্ঠিধারী কম্পিতকায় বৃদ্ধ অধিরথ রঙ্গভূমিতে প্রবেশ করিলেন। পিতাকে দেখিয়া কর্ণ সাগ্রহে ভক্তি-পূর্ব্বক তাঁহাকে প্রণাম করিলেন। এতক্ষণে কর্ণকে চিনিতে পারিয়া ভীম তাহাকে বিদ্রূপ করিয়া বলিলেন-সারথির পুত্র হইয়া তুমি অর্জুনের সহিত যুদ্ধের স্পর্দ্ধা করিতেছ? যাও রথের রশ্মি ধরিয়া কুলোচিত কাজ কর গিয়া। উহা শুনিয়া ক্রোধে কর্ণের ওষ্ঠযুগল কম্পিত হইল। তিনি দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া আকাশস্থ সূর্য্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। তখন দুর্য্যোধন ক্রোধে উত্তেজিত হইয়া ভীমকে বলিলেন-

ক্ষত্রিয়স্য বলং জ্যেষ্ঠং যোদ্ধব্যং ক্ষত্রবন্ধুনা।
শূরানাঞ্চ নদীনাঞ্চ দুর্বিদাঃ প্রভবাঃ কিল।।
-আদিপর্ব্ব, ১৩২/১১
ক্ষত্রিয়দের বলই শ্রেষ্ঠ; ক্ষত্রিয়দের বন্ধুর সহিতও যুদ্ধ করা উচিত; আর বীরগণ ও নদীগণের উৎপত্তি জানা খুব দুষ্কর।

এমন সময় সূর্যাস্ত হইল। দুর্য্যোধন কর্ণের হস্ত ধারণ করিয়া প্রস্থান করিলেন। পাণ্ডবগণ দ্রোণাচার্য্য, কৃপাচার্য্য, পিতামহ ভীষ্ম সকলেই নিজ নিজ গৃহে গমন করিলেন।

কর্ণ অঙ্গদেশের রাজা হইলেন দেখিয়া কুন্তী মনে মনে আনন্দিত হইলেন। কর্ণকে বন্ধুরূপে পাইয়া দুর্য্যোধনের অর্জুনভয় দূরীভূত হইল। এদিকে যুধিষ্ঠিরের এইরূপ ধারণা জন্মিল যে কর্ণের তুল্য ধনুর্দ্ধর পৃথিবীতে আর নাই।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post