কৃপাচার্য-দ্রোণাচার্য-অশ্বত্থামা-অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব

কৃপাচার্য-দ্রোণাচার্য-অশ্বত্থামা-অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব

মহর্ষি গৌতমের শরদ্বান নামে এক শিষ্য ছিলেন। ধনুর্বিদ্যা অভ্যাসে তাঁহার খুব দক্ষতা ছিল। শরবণে তাঁহার একটি পুত্র ও একটি কন্যা জন্মগ্রহণ করে, তাহাদের নাম কূপ ও কৃপী। মহারাজ শান্তনু সেই যমজ সন্তানদ্বয়কে নিজ সন্তানতুল্য যত্নে প্রতিপালন করেন। ঋষি শরদ্বান স্বীয় পুত্র কৃপকে যথাযথ শিক্ষাদান করিয়া ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী করেন। ইনিই কৃপাচার্য্য নামে বিখ্যাত এবং কৌরব ও পাণ্ডবদের প্রথম অস্ত্র-গুরু ছিলেন।

মহর্ষি ভরদ্বাজ হিমালয়ে গঙ্গোত্রী প্রদেশে তপস্যা করিতেন। তাঁহার পুত্রের নাম দ্রোণ; তিনি অগ্নিবেশ্য মুনির নিকট উত্তমরূপে ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা করেন। পাঞ্চালরাজ পৃষত মহর্ষি ভরদ্বাজের সখা ছিলেন। তাঁহার পুত্র দ্রুপদ ভরদ্বাজপুত্র দ্রোণের সঙ্গে গুরুগৃহে একসঙ্গে বাল্যক্রীড়াদি করিতেন। এইরূপে তাঁহাদের উভয়ের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব হয়। যথাকালে পিতার আদেশে দ্রোণ কৃপীকে বিবাহ করেন। তাঁহাদের একটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে। সে ভূমিষ্ঠ হইয়াই অশ্বের ন্যায় চিৎকার করিয়াছিল বলিয়া তাহার নাম হয় 'অশ্বত্থামা'।

মহর্ষি ভরদ্বাজের দেহরক্ষার পর দ্রোণ পিতার আশ্রমে থাকিয়া তপস্যা ও অস্ত্রবিদ্যা চর্চ্চা করিতে লাগিলেন। একদিন তিনি শুনিলেন যে-অস্ত্রজ্ঞগণের শ্রেষ্ঠ মহাত্মা জমদগ্নিনন্দন পরশুরাম ব্রাহ্মণদিগকে তাঁহার সমস্ত ধনরত্নাদি দান করিতেছেন। ইহা শ্রবণ করিয়া দ্রোণ মহেন্দ্র পর্ব্বতে গমন পূর্ব্বক ভগবান্ পরশুরামের নিকট ধন প্রার্থনা করেন। তিনি বলিলেন আমার সব ধনসম্পদ ব্রাহ্মণদিগকে দান করিয়াছি। এখন শুধু আমার শরীর ও অস্ত্রশস্ত্রাদি অবশিষ্ট আছে। ইহার মধ্যে তুমি কি চাও বল? দ্রোণ বলিলেন-আপনার সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র প্রয়োগ ও প্রত্যাহরণ বিধিসহ আমাকে কৃপা করিয়া প্রদান করুন। পরশুরাম দ্রোণের প্রার্থনা পূরণ করিলেন। দ্রোণ কৃতার্থ হইয়া প্রীতি মনে প্রিয়সখা দ্রুপদ সমীপে গমন করিলেন। কিন্তু দ্রুপদ ঐশ্বর্য্যগর্ব্বে গর্বিত হইয়া বাল্যসখা দ্রোণের অপমান করিলেন। তখন দ্রোণ ক্রোধে অভিভূত হইয়া হস্তিনাপুরে গমনপূর্ব্বক কৃপাচার্যের গৃহে গোপনে বাস করিতে লাগিলেন।

একদিন রাজকুমারগণ নগরের বাহিরে গিয়া লৌহগুলিকা লইয়া খেলা করিতেছিল। দৈবক্রমে সেই গুলিকা একটি জলশূন্য কূপমধ্যে পতিত হইল। তাহারা অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও তাহা উঠাইতে পারিল না। সেই সময় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ দ্রোণাচার্য সেখান দিয়া যাইতেছিলেন। তাঁহাকে দেখিয়া রাজকুমারগণ ঘিরিয়া দাঁড়াইলেন। দ্রোণাচার্য সহাস্যে বলিলেন-তোমাদের ক্ষাত্রবল ও অস্ত্রশিক্ষা বৃথা; যেহেতু তোমরা ভরতবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াও এই সামান্য কূপ হইতে গুলিকাটি উদ্ধার করিতে পারিলে না। আমি তোমাদের গুলিকা ও আমার এই অঙ্গুরীয় ঈষিকা (বাণ) দ্বারা উঠাইয়া আনিব, আমাকে তোমরা কি আহার দিবে বল? এই কথা বলিয়া তিনি স্বীয় অঙ্গুরীয়টিও সেই শুষ্ক কূপমধ্যে নিক্ষেপ করিলেন।

যুধিষ্ঠির বলিলেন- কৃপাচার্যের অনুমতি হইলে আপনি প্রত্যহ আহার পাইবেন। দ্রোণাচার্য প্রথমে একটি বাণদ্বারা সেই গুলিকা বিদ্ধ করিলেন। তৎপরে আর একটি বাণদ্বারা প্রথম বাণটি বিদ্ধ করিলেন। এইরূপে পর পর বাণ মারিয়া উপরের বাণটি ধরিয়া সেই গুলিকা উদ্ধার করিলেন। সেইভাবে অঙ্গুরীয়টিও উদ্ধার করিলেন। রাজপুত্রেরা বিস্মিত হইয়া উৎফুল্ল নয়নে তাঁহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। দ্রোণাচার্য বলিলেন-তোমরা গিয়া মহামতি ভীষ্মকে আমার রূপ ও গুণ বিশেষরূপে বর্ণনা কর।

কুমারগণ পিতামহ ভীষ্মকে সমস্ত বিবরণ বলিলেন। তাহা শুনিবামাত্র মহাত্মা ভীষ্ম বুঝিতে পারিলেন যে দ্রোণাচার্য আগমন করিয়াছেন। ইতিপূর্ব্বেই তিনি একজন সুশিক্ষকের হস্তে রাজকুমারগণকে সমর্পণ করিবার মনস্থ করিয়াছিলেন। এক্ষণে দ্রোণাচার্য্যের আগমন সংবাদে তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া সত্ত্বর দ্রোণাচার্যের সমীপে গমন করিলেন এবং সসম্মানে তাঁহাকে স্বীয় ভবনে আনয়নপূর্ব্বক তাঁহার আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন।

দ্রোণাচার্য বলিলেন পাঞ্চালরাজপুত্র দ্রুপদ ও আমি মহর্ষি অগ্নিবৈশ্যের নিকট অস্ত্রশিক্ষা করিয়াছিলাম। বাল্যকাল হইতে দ্রুপদ আমার প্রিয়সখা ছিলেন। শিক্ষা সমাপ্ত হইলে গৃহে প্রত্যাগমনের সময় তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন আমি পাঞ্চালরাজ্যে অভিষিক্ত হইলে আমার রাজ্য তোমারও হইবে। সেইকথা আমার স্মরণে ছিল।

একদা আমার পুত্র বালক অশ্বত্থামা ক্রীড়াসঙ্গী ধনী পুত্রদের দুগ্ধপান করিতে দেখিয়া আমার নিকট আসিয়া কাঁদিতে লাগিল। তাহাতে আমি দুঃখিত হইয়া বহু চেষ্টা করিয়াও ধৰ্ম্মসঙ্গত উপায়ে কোন দুগ্ধবতী গাভী সংগ্রহ করিতে পারিলাম না। অশ্বত্থামার সঙ্গী বালকেরা তাহাকে পিষ্টোদক (পিঠুলী গোলা) পান করিতে দিল। দুগ্ধ পান করিতেছি মনে করিয়া সে আনন্দে নৃত্য করিতে লাগিল। তাহা দেখিয়া বালকেরা আমাকে উপহাস করিতে লাগিল। তাহাতে আমার বুদ্ধিভ্রংশ হইল। পূর্ব্বের বন্ধুত্ব স্মরণ করিয়া আমি স্ত্রী-পুত্রসহ দ্রুপদ রাজার নিকট গেলাম। আমি তাহাকে সখা বলিয়া সম্বোধন করায় তিনি অসন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন ব্রাহ্মণ, তোমার বুদ্ধি অমার্জিত, সেজন্য আমাকে সখা বলিতেছ, বন্ধুত্ব হয় সমানে সমানে। ধনী-দরিদ্রে, রাজায়-প্রজায়, ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণে পণ্ডিত-মুর্খে কখনও বন্ধুত্ব হয় না। তোমাকে একরাত্রির জন্য আহার্য্য দিতেছি।

সৌহৃদং মে ত্বয়া হ্যাসীৎ পূর্ব্বং সামর্থ্যবন্ধনম্।
নাশ্রোত্রিয়ঃ শ্রোত্রিয়স্য নারথী রথিনঃ সখা।।
সাম্যাদ্ধি সখ্যং ভবতি বৈবম্যাশ্রোপ-পদ্যতে।
ন সখ্যমজরং লোকে বিদ্যতে কস্যচিৎ ক্বচিৎ।।
ন হানাঢ্যঃ সখাঢ্যস্য নাবিদ্বান্ বিদূষঃ সখা।
ন শূরস্য সখা ক্লীবঃ সখিপূর্ব্বং কিমিষ্যতে।।
-আদিপর্ব্ব, ১২৭/৬৬-৬৭, ৭০
অর্থাৎ পূর্ব্বে আমরা একত্র অধ্যয়ন করিতাম বলিয়া হয়তো তোমার সহিত আমার সখ্যতা ছিল। কিন্তু অব্রাহ্মণের সহিত ব্রাহ্মণের এবং অরথীর সহিত রথীর কখনও বন্ধুত্ব হয় না।

আর সমানে সমানেই বন্ধুত্ব হয়। বৈষম্য থাকিলে হয় না। তাছাড়া জগতে কোথাও কাহারও বন্ধুত্ব চিরকাল অক্ষয় থাকে না। বাস্তবিক পক্ষে দরিদ্রের সহিত ধনীর এবং মূর্খের সহিত পণ্ডিতের কখনও সখ্যতা হয় না। সেইরূপ সবলের (বীরের) সহিত দুর্ব্বলের কখনও বন্ধুত্ব হয় না।
ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের মহান, প্রতিষ্ঠাতা যুগাচার্য শ্রীমৎ স্বামী প্রণবানন্দজীও বলিয়াছেন, "বন্ধুত্ব হয় সমানে সমানে, সবলে-দুর্ব্বলে কখনও বন্ধুত্ব হয় না। যাহারা দুর্ব্বল তাহাদেরকে সঙ্ঘবদ্ধ ও শক্তিমান করিয়া তোলাই সমস্ত সমাধানের সহজ উপায়।"

দ্রোণাচার্য বলিলেন- দ্রুপদের নিকট অপমানিত হইয়া আমি অতিশয় ক্রুদ্ধভাবে প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞা করিয়া কুরুদেশে চলিয়া আসিয়াছি। মহামতি ভীষ্ম, এখন আপনি বলুন, আপনার কোন্ প্রিয়কার্য করিব? ভীষ্ম বলিলেন-আপনি রাজকুমারদের অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা দিন এবং এখানে সসম্মানে বাস করিয়া সমস্ত ঐশ্বর্য ভোগ করুন। এই রাজ্যের আপনিই প্রভু; কৌরবেরা আপনার আজ্ঞাবহ হইয়া থাকিবে আপনি আমার পৌত্রদের আচার্য হউন।

এই কথা বলিয়া ভীষ্ম দ্রোণাচার্য্যের বসবাসের জন্য একটি সুপরিচ্ছন্ন উত্তম গৃহের ব্যবস্থা করিলেন এবং পৌত্রদের শিক্ষার ভার তাঁহার হস্তে সমর্পণ করিলেন। দ্রোণাচার্য্য তাহাদের শিষ্যত্বে গ্রহণ করিয়া নির্জনে কহিলেন, আমি তোমাদের উত্তমরূপে অস্ত্রশিক্ষা প্রদান করিব। কিন্তু পরিশেষে তোমাদিগকে আমার অভিলষিত একটি কাজ সম্পাদন করিতে হইবে; এক্ষণে তাহা অঙ্গীকার করা। তাহা শুনিয়া দুর্য্যোধন প্রভৃতি কৌরবগণ সকলেই মৌন রহিলেন। কেবলমাত্র অর্জুন তাঁহার বাক্য স্বীকার করিয়া বলিলেন- গুরুদেব, আপনি যাহা আদেশ করিবেন আমি তাহা অবশ্যই পালন করিব। আচার্য্য দ্রোণ অর্জুনের প্রতিজ্ঞা-বাক্য শ্রবণ করিয়া অতিশয় আনন্দিত হইলেন।

অনন্তর দ্রোণাচার্য্য কুরুরাজকুমারগণকে বিবিধ অস্ত্রশস্ত্র শিক্ষা দান করিতে লাগিলেন। এই সংবাদ শুনিয়া বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশীয় এবং অন্যান্য নানা দেশের রাজপুত্রগণ দ্রোণাচার্য্যের নিকট অস্ত্রশিক্ষার জন্য আসিলেন, সূতপুত্র কর্ণও তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিলেন। কিন্তু সমাগত সমস্ত শিষ্যগণের মধ্যে অর্জুনই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ এবং দ্রোণাচার্যের সর্ব্বাপেক্ষা প্রিয় হইয়া উঠিলেন। কারণ তিনি অধিকতর আন্তরিকভাবে গুরুর প্রতি অনুরক্ত, শ্রদ্ধাবান এবং অনন্যচিত্তে গুরুর আদেশ প্রতিপালনে ও প্রসন্নতা বিধানে সমান ছিলেন।

একদা রাত্রিকালে ভোজনের সময়ে গুরুদেব সহসা দীপশিখা নির্ব্বাপণ করিয়া দিলেন। কিছুক্ষণ পর প্রদীপ পুনরায় প্রজ্জ্বলিত হইল। ইহাতে অন্য সকলের মনে প্রশ্ন না জাগিলেও বুদ্ধিমান অর্জুনের জিজ্ঞাসু মনে ইহার রহস্যের উদ্ভেদ হইল। অর্জুন দেখিলেন অভ্যাসবশে অন্ধকারেও হস্তদ্বারা মুখেই খাদ্য যাইতেছে। সুতরাং অভ্যাস করিলে রাত্রিকালেও অস্ত্রচালনা অভ্যাস করা যাইতে পারে। গুরুদেবের এই ইঙ্গিত উপলব্ধি করিয়া অর্জুন সেইদিন হইতে রাত্রিতে সকলে যখন নিদ্রিত হইত তিনি তখন অস্ত্রচালনা অভ্যাস করিতেন। একদিন শব্দ শুনিয়া দ্রোণাচার্য্য আসিয়া দেখিলেন যে অর্জুন অন্ধকারে শরচালনা করিতেছে। একমাত্র অর্জুনই তাঁহার ইঙ্গিতের মর্ম্ম উপলব্ধি করিয়াছে বুঝিয়া গুরু দ্রোণাচার্য্য অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া অর্জুনকে অজস্র আশীর্ব্বাদ করিয়া বলিলেন-বৎস, আমি সত্য করিয়া বলিতেছি-এই ধরাধামে তুমি যাহাতে অদ্বিতীয় ধনুর্দ্ধর হেিত পার আমি সেইরূপ বিধান করিব।

তদবধি অর্জুন নিদ্রা জয় করিয়া দিন ও রাত্রিতে বিনিদ্র ও অতন্দ্রভাবে অস্ত্রাভ্যাস করিতেন। নিদ্রাজয়ী ছিলেন বলিয়া তাঁহার এক নাম গুড়াকেশ। অবিরত অভ্যাসের ফলে অর্জুন উভয় হস্তে সমানভাবে অস্ত্রচালনা করিতে পারিতেন। এজন্য তাঁহার অপর নাম 'সব্যসাচী'। সব্য শব্দের অর্থ বাম এবং 'সাচী' শব্দের অর্থ দক্ষিণ। এইসব ঘটনা থেকে বুঝা যায় অর্জুন ছিলেন গীতার সেই শ্রেষ্ঠ উপদেশের প্রতিমূর্তি "শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ"- (গীতা ৪/৩৯) অর্থাৎ গুরুর প্রতি ঐকান্তিক শ্রদ্ধা, তাঁহার আদেশ পালন তৎপর ও ইন্দ্রিয় সংযম দ্বারাই জ্ঞান লাভ করিতে পারা যায়। এই মহৎ গুণগুলি অর্জুনের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল বলিয়াই অর্জুন জগতের শ্রেষ্ঠ বীর ও শ্রীভগবানের প্রিয়পাত্র হইতে পারিয়াছিলেন।

নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্য অস্ত্রশিক্ষার্থে দ্রোণাচার্যের নিকট গেলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় ভিন্ন অপর কাহাকেও অস্ত্রশিক্ষা দিবেন না বলিয়া তিনি তাহাকে শিষ্যত্বে গ্রহণ করিলেন না। তখন একলব্য দ্রোণাচার্য্যকে প্রণাম করিয়া বনে গমনপূর্ব্বক দ্রোণাচার্য্যের একটি মৃন্ময়ী মূর্তিকে আচার্য্য-রূপবন্দনা করিয়া নিজের চেষ্টায় অস্ত্রবিদ্যা অভ্যাস করিতে থাকেন।

দ্রোণাচার্যের শিক্ষার ফলে ভীম ও দুর্যোধন গদাযুদ্ধে, অশ্বত্থামা গুপ্ত অস্ত্রের প্রয়োগে, নকুল, সহদেব, অসিযুদ্ধে যুধিষ্ঠির রথচালনায় এবং অর্জুন বুদ্ধি, বল, উৎসাহ ও সমস্ত প্রকার অস্ত্রের প্রয়োগে শ্রেষ্ঠ হইলেন।

বুদ্ধিযোগ-বলোৎসাহৈঃ সর্ব্বাস্ত্রেষু চ নিষ্ঠিতঃ।
অস্ত্রে গুর্ব্বনুরাগে চ বিশিষ্টোহ-ভবদৰ্জ্জুনঃ।।
-আদি পর্ব্ব, ১২৮/৭৩
অর্থাৎ, বুদ্ধিযোগ বল, উৎসাহ, সর্ব্বপ্রকার অস্ত্রের প্রয়োগে এবং গুরুভক্তিতে অর্জুন সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হইলেন। কিন্তু দুরাত্মা ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণ ভীম ও অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব সহ্য করিতে পারিতেন না।

একদা দ্রোণাচার্য্য একটি কৃত্রিম পক্ষী বৃক্ষের উপর রাখিয়া রাজকুমারদের বলিলেন-তোমরা এই পক্ষীকে লক্ষ্য করিয়া স্থির হইয়া থাক; আমি যাহাকে বলিব সে শরাঘাতে উহার মস্তকচ্ছেদ করিবে, সকলে শরসন্ধান করিলে পর দ্রোণাচার্য্য যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করিলেন কি দেখিতেছ? যুধিষ্ঠির থেকে আরম্ভ করিয়া সকলেই উত্তর করিলেন- আপনাকে ভ্রাতৃগণকে বৃক্ষকে ও পক্ষীটিকে দেখিতেছি, বিরক্ত হইয়া আচার্য তাহাদের বলিলেন-সরিয়া যাও, তোমরা লক্ষ্যভেদ করিতে পারিবে না। সর্ব্বশেষে অর্জুনকে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন-আমি শুধু পক্ষীটিকে দেখিতেছি। আচার্য্যদেব বলিলেন-পুনরায় বল। অর্জুন বলিলেন-আমি শুধু পক্ষীর মস্তকটিকে দেখিতেছি। আনন্দে রোমাঞ্চিত হইয়া দ্রোণাচার্য্য বলিলেন-এইবার শরসন্ধান কর। তৎক্ষণাৎ অর্জুনের ক্ষুরধার অস্ত্রে পক্ষীর ছিন্ন মস্তক ভূতলে পতিত হইল। দ্রোণাচার্য্য সানন্দে অর্জুনকে আশীর্ব্বাদ করিলেন। ইহাতে বুঝিতে পারা যায় অর্জুনের মনঃসংযম ছিল অতুলনীয়। আর মন যাহার বশীভূত সে জগতের সমস্ত কার্য্যেই সফলতা লাভ করিতে পারে।

অপর একদিন দ্রোণাচার্য্য সশিষ্য গঙ্গায় স্নান করিতে গেলেন। তিনি জলে অবগাহন করিবামাত্র একটি ভয়ঙ্কর কুম্ভীর তাঁহার জঙ্ঘা আক্রমণ করিল। তিনি নিজেকে মুক্ত করিতে সমর্থ হইলেও শিষ্যদের শক্তি পরীক্ষার নিমিত্ত সকলকে ডাকিয়া বলিলেন-তোমরা শীঘ্র আমাকে রক্ষা কর। তাঁহার আদেশের সঙ্গে সঙ্গে অর্জুন পাঁচটি তীক্ষ্ণ শরে কুম্ভীরকে খণ্ড করিয়া গুরুদেবকে মুক্ত করিলেন। অন্য শিষ্যরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। দ্রোণাচার্য্য অতিমাত্র সন্তুষ্ট হইয়া অর্জুনকে প্রয়োগ ও উপসংহারের সহিত ব্রহ্মশির নামক অস্ত্র দান করিয়া বলিলেন-জগতে অসাধারণ এই অস্ত্র কখনও মানুষের উপর প্রয়োগ করিবে না; মনুষ্য ভিন্ন যদি অন্য কোন শত্রু তোমাকে আক্রমণ করে তবেই ইহা প্রয়োগ করিবে। এই বলিয়া দ্রোণাচার্য্য অর্জুনকে আশীর্ব্বাদ করিয়া বলিলেন-

ভবিতা ত্বৎসমো নান্যঃ পুমান্ লোকে ধনুর্দ্ধরঃ।
অজেয়ঃ সর্ব্বশত্রুণাং কীর্তিমাংশ্চ ভবিষ্যসি।।
-আদিপর্ব্ব, ১২৮/১১১
হে অর্জুন, জগতে কোন পুরুষই তোমার তুল্য ধনুর্দ্ধর হইবে না। তুমি সকল শত্রুরই অজেয় হইবে এবং জগতে অতুলনীয় যশস্বী হইবে।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post