দ্রুপদের পরাজয়- দ্রোণাচার্য্যের প্রতিশোধ

দ্রুপদের পরাজয়- দ্রোণাচার্য্যের প্রতিশোধ

মহামুনি বৈশম্পায়ন বলিলেন-
পাণ্ডবান্ ধার্তরাষ্ট্রাংশ্চ কৃতাস্ত্রান্ প্রসমীক্ষ্য সঃ।
গুর্ব্বর্থ-দক্ষিণাকালে প্রাপ্তেহমন্যত বৈ গুরুঃ।।
-আদিপর্ব্ব, ১৩৩/১
-দ্রোণাচার্য্য পাণ্ডুর ও ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণকে অস্ত্রশস্ত্রে সুশিক্ষিত দেখিয়া গুরুদক্ষিণা গ্রহণ করিবার ইচ্ছা করিলেন।

তিনি শিষ্যগণকে আহ্বান করিয়া বলিলেন যুদ্ধে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে জীবন্ত অবস্থায় ধরিয়া আনয়ন কর তাহাই তোমাদের শ্রেষ্ঠ গুরুদক্ষিণা হইবে। রাজকুমারগণ সম্মত হইয়া দ্রোণাচার্য্যের সহিত সসৈন্যে পাঞ্চালরাজ্য আক্রমণ করিলেন।

দ্রুপদ রাজা ও তাঁহার ভ্রাতাগণ অগ্রসর হইয়া কৌরবদের সহিত যুদ্ধ আরম্ভ করিলেন। দুর্য্যোধনাদির দর্প দেখিয়া বুদ্ধিমান অর্জুন দ্রোণাচার্য্যকে বলিলেন গুরুদেব, উহারা হয়তো রাজা দ্রুপদকে বন্দী করিতে পারিবে না। অগ্রে উহারা যুদ্ধ করুক; তারপর আমরা যুদ্ধ করিব। এই কথা বলিয়া তিনি নগর হইতে অর্দ্ধ ক্রোশ দূরে ভ্রাতাদের সহিত অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর কৌরবগণ পাঞ্চালগণের বাণবর্ষণে জর্জরিত ও পরাজিত হইল।

তখন অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে যুদ্ধ করিতে নিষেধ করিয়া অপর তিন ভ্রাতাসহ যুদ্ধে অগ্রসর হইলেন। পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ ভ্রাতা সত্যজিতের সহিত অর্জুনের প্রতি ধাবিত হইলেন। কিন্তু ভীমার্জুনের অতুল পরাক্রমে পাঞ্চাল সৈন্য পরাস্ত হইল। মহাবীর অর্জুন রাজা দ্রুপদ ও তাঁহার অমাত্যকে বন্দী করিয়া গুরু দ্রোণাচার্য্যকে উপহার দিলেন। আচার্য্য সন্তুষ্ট হইয়া অর্জুনকে আশীর্ব্বাদ করিলেন।

তৎপরে দ্রোণাচার্য্য দ্রুপদকে বলিলেন-আমি বলপূর্ব্বক তোমাকে পরাস্ত করিয়া রাজধানী অধিকার করিয়াছি। তোমার জীবনও এখন শত্রুর অধীন; এখন পূর্ব্বের বন্ধুত্ব স্মরণ করিয়া কি প্রার্থনা কর, বল! তুমি প্রাণের ভয় করিও না। আমরা ক্ষমাশীল ব্রাহ্মণ। তুমি বাল্যকালে আমার সহিত গুরুগৃহে একত্রে ক্রীড়াদি করিয়াছ। সেজন্য তোমার প্রতি আমার এখনও স্নেহ ও ভালবাসা আছে। আমি তোমাকে অর্দ্ধরাজ্য দান করিতেছি। গঙ্গার দক্ষিণ তীরে তুমি রাজা হইলে আর আমি উত্তর তীরের রাজা হইলাম। এখন যদি ইচ্ছা কর তাহা হইলে আমাকে সখা বলিয়া মনে করিতে পার। কারণ সমানে সমানে ভিন্ন বন্ধুত্ব হয় না।
দ্রুপদ বলিলেন-
অনার্য্যশ্চমিদং ব্রহ্মহ্মন্ বিক্রান্তেষু মহাত্মসু।
প্রীয়ে ত্বয়াহং ত্বত্তশ্চ প্রীতিমিচ্ছামি শাশ্বতীম্।।
-ঐ, ১৩৩/৭১
হে ব্রাহ্মণ, শক্তিমান মহাত্মার পক্ষে এইরূপ আচরণ আশ্চর্য্য নহে। আমি প্রীত হইয়াছি। আপনার নিকট চিরস্থায়ী প্রণয় লাভ করিতে ইচ্ছা করি।

দ্রোণাচার্য্য সন্তুষ্ট হইয়া দ্রুপদকে মুক্তি দিলেন। গঙ্গার দক্ষিণে চৰ্ম্মন্বতী নদী পর্য্যন্ত দ্রুপদের অধিকারে রহিল; আর দ্রোণাচার্য্য গঙ্গার উত্তর দিকের অহিচ্ছত্র দেশ লাভ করিলেন। পরাজিত মনঃক্ষুণ্ণ রাজা দ্রুপদ দ্রোণাচার্য্যের বিনাশের জন্য শক্তিমান পুত্রলাভের চেষ্টা করিতে লাগিলেন।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post