ধৃতরাষ্ট্রের ঈর্ষা ও কণিকের পরামর্শ
এক বৎসর পর ধৃতরাষ্ট্র পিতামহ ভীষ্মের পরামর্শে যুধিষ্ঠিরকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। যুধিষ্ঠির অল্পকাল মধ্যেই ধৈর্য্য, স্থৈর্য্য, সহিষ্ণুতা, সরলতা, দয়া প্রভৃতি সদ্গুণে তাঁহার পিতা পাণ্ডুর কীর্তিও অতিক্রম করিলেন। ভীম বলরামের নিকট অসিযুদ্ধ, গদাযুদ্ধ প্রভৃতি উত্তমরূপে শিক্ষা করিলেন। অর্জুন সর্ব্ববিধ অস্ত্রের প্রয়োগে নিপুণতা লাভ করিলেন। নকুল দ্রোণাচার্য্যের শিক্ষার গুণে অতিরথ নামে বিখ্যাত হইলেন। সহদেব সমস্ত নীতিশাস্ত্রে অভিজ্ঞ হইলেন। অর্জুন ভীমের সহায়ে বহুদেশ জয় করিয়া নিজেদের রাজ্য বিস্তার করিলেন এবং রাশি রাশি ধন আনয়ন করিয়া রাজকোষ পূর্ণ করিলেন।
পাণ্ডবদের বিক্রম এবং সুখ্যাতি অতিশয় বৃদ্ধি পাইতেছে শুনিয়া ধৃতরাষ্ট্রের মন দূষিত হইল। দুশ্চিন্তায় তাঁহার নিদ্রার ব্যাঘাত হইতে লাগিল, তিনি রাজনীতিজ্ঞ মন্ত্রিশ্রেষ্ঠ কণিককে জিজ্ঞাসা করিলেন-পাণ্ডবদের উৎকর্ষে আমার মনে অসূয়া জন্মিতেছে। তাহাদের সহিত কিরূপ ব্যবহার করা উচিত, আমাকে উপদেশ দিন।
মন্ত্রিবর কণিক বলিলেন রাজা সর্ব্বদাই সৈন্যগণকে সজ্জিত রাখিবেন এবং শত্রুর ছিদ্র পাইলেই তাহাকে আক্রমণ করিবেন।
নাসম্যক্-কৃতকারী স্যাদুপক্রম্য কদাচন।
কন্টকো হ্যাপিদুশ্চন্ন আস্রাবং জনয়েচ্চিরম্।।
-ঐ, ১৩৫/৯
রাজা কোন সময়েই কোন কার্য্য আরম্ভ করিয়া তাহা সমাপ্ত না করিয়া নিবৃত্ত হইবেন না। কারণ, শরীর-বিদ্ধ কণ্টকেরও অল্পাংশ অবশিষ্ট রাখিয়া দিলে তাহাতে চিরস্থায়ী ব্রণ জন্মায়।
আর মহারাজ শত্রু দুর্ব্বল হইলেও তাহাকে কখনও অবজ্ঞা করিতে নাই। কারণ অগ্নিও আশ্রয় পাইলে সমস্ত বনভূমি দগ্ধ করিয়া থাকে।
নাবজ্ঞেয়ো রিপুস্তাত দুর্ব্বলোহপি কথঞ্চন।
অল্লোহপ্যাগ্নির্বনং কৃৎস্নং দহত্যাশ্রয়-সংশ্রয়াৎ।।
-ঐ, ১৩৫/১১-১২
মন্ত্রিবর কণিক রাজনীতি বিষয়ক এইরূপ বিবিধ উপদেশের প্রসঙ্গে বলিলেন-
বহেদমিত্রং স্কন্ধেন যাবৎ কালস্য পর্য্যয়ঃ।
ততঃ প্রত্যাগতে কালে ভিন্দ্যাদ্-ঘটমিরাশ্মনি।।
-ঐ, ১৩৫/২১
যতদিন উপযুক্ত কাল না আসে ততদিন শত্রুকে কলসের ন্যায় স্কন্ধে বহন করিতে হয়। তারপর সুযোগ আসিলেই পাথরের উপরে কলসী যেমন আছাড়াইয়া ভাঙ্গিয়া ফেলে, সেইভাবে শত্রুকেও বিধ্বস্ত করিবেন। সাম, দান, ভেদ বা দণ্ড যে কোন উপায়েই হউক শত্রুকে ধ্বংস করিবেন।
মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করিলেন-হে মন্ত্রিবর; সাম, দান, ভেদ ও দণ্ড দ্বারা কিভাবে শত্রু নিধন করিব তাহা যথাযথভাবে বলুন। উত্তরে কণিক বলিলেন পূর্ব্বকালে এক বনে এক বুদ্ধিমান নীতিশাস্ত্রজ্ঞ শৃগাল তাহারা চারি বন্ধু-ব্যাঘ্র, মুষিক, বক ও নকুলের সহিত বাস করিত। একদিন তাহারা সেই বনের মধ্যে একটি বৃহৎ ও বলিষ্ঠ মৃগ দেখিয়া তাহাকে হত্যা করিতে ইচ্ছা করিল। বুদ্ধিমান শৃগালের পরামর্শে মৃগটি যখন নিদ্রা যাইতেছিল, তখন মুষিক গিয়া তাহার পদদ্বয়ের নীচে ক্ষত করিল। তাহাতে মৃগটি আর দৌড়াইতে না পারিয়া ব্যাঘ্রের হস্তে নিহত হইল।
তৎপরে যখন তাহারা সানন্দে মৃগটিকে ভক্ষণ করিতে যাইবে, তখন ধূর্ত শৃগাল বলিল-আমি মৃগশরীর রক্ষা করিতেছি, তোমরা সকলে স্নান করিয়া আইস। শৃগালের কথানুসারে সকলেই নদীতে স্নান করিতে গেল। এদিকে শৃগাল খুব চিন্তার ভান করিয়া বসিয়া রহিল। প্রথমেই ব্যাঘ্রটি সত্ত্বর স্নান করিয়া আসিয়া শৃগালকে চিন্তান্বিত দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, হে বন্ধু, তোমাকে এরূপ চিন্তাগ্রস্ত দেখিতেছি কেন? ধূর্ত শৃগাল বলিল-হে মহাবীর, মুষিক কি বলিয়াছে শুনুন। সে বলিয়াছে-পশুরাজ ব্যাঘ্রের বলে ধিক্। কারণ তিনি আজ আমারই দ্বারা নিহত মৃগকে ভক্ষণ করিতে উদ্যত হইয়াছেন।
ব্যাঘ্র বলিল-মুষিক যদি এইরূপ বলিয়া থাকে, তাহা হইলে আমি আর ইহার মাংস ভক্ষণ করিব না। আমি নিজ বাহুবলে অন্য পশু বধ করিয়া তাহার মাংস ভক্ষণ করিব। এই কথা বলিয়া ব্যাঘ্র বনের ভিতরে চলিয়া গেল। এমন সময় মুষিক ফিরিয়া আসিল। তাহাকে দেখিয়া ধূর্ত শৃগাল বলিল নকুল কি বলিয়াছে শুন। নকুল বলিয়াছে-আমি এই মৃগের মাংস খাইব না। কারণ ইহাকে ব্যাঘ্র উচ্ছিষ্ট করিয়াছে, আমি মুষিককেই খাইব। এই কথা শুনিয়া মুষিক ভীত হইয়া গর্তে প্রবেশ করিল।
এমন সময় সেখানে বুক স্নান করিয়া আসিল। তাহাকে দেখিয়া শৃগাল বলিল-পশুরাজ ব্যাঘ্র তোমার উপর খুবই ক্রুদ্ধ হইয়াছেন। তিনি এখনই সস্ত্রীক এখানে আসিতেছেন। কাজেই তুমি যাহা করিতে হয় তাহা শীঘ্র কর। ইহা শুনিয়া বুক ভয়ে পলায়ন করিল। তারপর নকুল আসিল। শৃগাল তাহাকে বলিল-আমি বাহুবলে ব্যাঘ্র প্রভৃতি সকলকে জয় করয়াছি। তাহারা সকলে আমার ভয়ে পলায়ন করিয়াছে। এখন তুমি আমাকে যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া এই মৃগ মাংস ভক্ষণ কর। নকুল বলিল-তুমি যখন এই সকল বীরকে পরাস্ত করিয়াছ, তখন আমি নিজেই পরাজয় স্বীকার করিলাম। এই কথা বলিয়া নকুলও চলিয়া গেল। তখন সেই চতুর শৃগাল একাকী দীর্ঘদিন ধরিয়া ঐ মৃগমাংস ভক্ষণ করিল।
এই কাহিনী বলিয়া মন্ত্রীবর কণিক মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে বলিল-মহারাজ, শত্রুর সহিত বুদ্ধিপূর্বক এইরূপ ব্যবহার করিতে পারিলে অনায়াসেই উন্নতি লাভ করিতে পারিবেন।
এবং সমাচরন্নিত্যং সুখমেধেত ভূপতিঃ।
ভয়েন ভেদয়েদ্ভীরুং শূরমঞ্জলি-কর্মণা।।
লুব্ধমর্থপ্রদানেন সমঃ ন্যূনং তথৌজসা।
এবং তে কথিতং রাজন!
শৃণু চাপ্যপরং তথা।।
-ঐ, আদিপর্ব, ১৩৫/৫০-৫১
-ভয় দেখাইয়া ভীরুকে বিতাড়িত করিবেন, আর করজোড়ে শক্তিমানকে, ধন দান করিয়া সমবল-সম্পন্ন লুব্ধকে এবং বল প্রকাশ করিয়া দুর্ব্বলকে পরাস্ত করিবেন। ক্রুদ্ধ হইয়াও বাহিরে সেই ক্রোধ প্রকাশ করিবেন না। মৃদু হাস্য করিয়া কথা বলিতে হইবে এবং ক্রুদ্ধ হইলেও কোন সময় অন্যের মর্যাদা হানিকর তিরস্কার করিবেন না। অবিশ্বাসী লোককে বিশ্বাস করিবেন না, বিশ্বাসী লোককেও অতিবিশ্বাস করিবেন না, কারণ বিশ্বস্ত লোক হইতে ভয় জন্মিলে সেই ভয় মূলকেও ছেদন করিয়া থাকে।
ন বিশ্বসেদ-বিশ্বস্তে বিশ্বস্তে নাতিবিশ্বসেৎ।
বিশ্বাসাস্তয়মুৎপন্নং মূলান্যপি নিকৃস্তুতি।।
-ঐ, আদিপর্ব্ব, ১৩৫/৬২
ক্ষুদ্র শত্রুকেও উপেক্ষা করিলে সে সময় পাইয়া অতি বৃহৎ হইয়া উঠে। যেমন বনে নিক্ষিপ্ত অগ্নি-স্ফুলিঙ্গ ক্রমে সমগ্র বনকেও ভস্মীভূত করিয়া ফেলে। হে মহারাজ, আপনি উক্ত নীতি সকল অনুসরণ করিয়া চলিলে শত্রুগণ হইতে মুক্ত হইতে পারিবেন। পাণ্ডবগণ যখন দুর্য্যোধনাদি হইতে অধিকতর বলবান, তখন আপনি পুত্রগণের সহিত মিলিত হইয়া এমন উপায় শীঘ্র অবলম্বন করুন, যাহাতে শেষে অনুতাপ করিতে না হয়। এই কথা বলিয়া কণিক নিজগৃহে প্রস্থান করিলেন।