জতুগৃহদাহ-বারণাবত

জতুগৃহদাহ-বারণাবত

অতঃপর দুর্য্যোধন পাণ্ডবদের বিনাশের জন্য মাতুল শকুনি, দুঃশাসন ও কর্ণের সহিত মন্ত্রণা করিতে লাগিলেন। তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে বলিলেন-পিতা, পুরবাসিগণ আপনাকে ও পিতামহ ভীষ্মকে অনাদর করিয়া যুধিষ্ঠিরকে রাজা করিতে চায়। আপনি জন্মান্ধ বলিয়া রাজত্ব পান নাই; পাণ্ডু পাইয়াছিলেন। কিন্তু পাণ্ডুর পুত্ররাই যদি বংশানুক্রমে রাজত্ব পায়, তাহা হইলে আমরা ও আমাদের বংশ চিরকাল অবজ্ঞাত হইয়া থাকিবে। সুতরাং আপনি কৌশল করিয়া পাণ্ডবদের বারণাবতে নির্বাসিত করুন। তাহা হইলে আমরা নির্ভয়ে রাজত্ব করিতে পারিব।

ধৃতরাষ্ট্র বলিলেন-পাণ্ডু যেমন প্রজাদের প্রিয় ছিলেন, যুধিষ্ঠিরও নিজগুণে সেইভাবে প্রজাদের প্রিয় হইয়াছেন। তাঁহার সহায়-সম্পদও আছে। এই অবস্থায় আমি কিরূপে তাঁহাকে নির্বাসিত করিব? তাছাড়া ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর, কূপ কেহই তাহা সমর্থন করিবেন না। দুর্য্যোধন বলিলেন-আমি অর্থ ও সম্মান দিয়া প্রজাদের বশীভূত করিয়াছি। মন্ত্রিগণ এবং ধনাগারও আমাদের হাতে রহিয়াছে। অশ্বথামা আমাদের পক্ষে আছেন; সুতরাং দ্রোণাচার্য্য পুত্রের অনুসরণ করিবেন, কৃপাচার্য্যও নিজ ভাগিনেয়কে পরিত্যাগ করিবেন না। পিতামহ ভীষ্মের কাহারও প্রতি পক্ষপাত নাই, আর বিদুর আমাদের অর্থে পালিত হইয়াও গোপনে পাণ্ডবদের পক্ষপাতী। কিন্তু তিনি একাকী আমাদের বিরুদ্ধচারণ করিতে পারিবেন না। অতএব আপনি আজই মাতা কুত্তীসহ পঞ্চপাণ্ডবকে বারণাবতে প্রেরণ করুন।

ধৃতরাষ্ট্রের উপদেশ অনুসারে কয়েকজন মন্ত্রী পাণ্ডবদের নিকট গিয়া বারণাবতের খুব প্রশংসা করিতে লাগিল। ধৃতরাষ্ট্রও তাহাদের বারণাবতে যাইবার জন্য পরামর্শ দিলেন। তখন যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রের অভিপ্রায় ও নিজের অসহায় অবস্থা বুঝিয়া, অনিচ্ছা সত্ত্বেও বারণাবতে গমন করিতে সম্মত হইলেন এবং ভীষ্ম, দ্রোণ প্রভৃতি গুরুজনদের আশীর্ব্বাদ লইয়া মাতা ও ভ্রাতাগণসহ সেখানে যাত্রা করিলেন।

দুর্য্যোধন অতিশয় আনন্দিত হইয়া পুরোচন নামক এক বিশ্বস্ত মন্ত্রীকে সত্ত্বর দ্রুতগামী রখে সেখানে পাঠাইয়া দিলেন এবং তাহাকে বলিয়া দিলেন সেখানে একটি সহজদাহ্য গৃহ নির্মাণ করিয়া তাহাতেই পাণ্ডবদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করিতে, যাহাতে তাহারা সহজেই অগ্নিদগ্ধ হইয়া মারা যায়।

এদিকে বিদুর দুর্য্যোধনের দুষ্ট অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া যুধিষ্ঠিরের যাত্রাকালে অন্যের অবোধ্য ম্লেচ্ছ ভাষায় শত্রুর অভিসন্ধি এবং তাহা হইতে নিস্তারের উপায় বলিয়া দিলেন। পরে একজন বিশ্বস্ত খনককে সেখানে প্রেরণ করিলেন। সেই লোক রাত্রিকালে গোপনে গৃহের মধ্যে সুড়ঙ্গ প্রস্তুত করিল। পাণ্ডবেরা দিনের বেলা মৃগয়া করিবার ছলে বনদেশের রাস্তাঘাট চিনিয়া রাখিতেন এবং রাত্রিতে সেই সুড়ঙ্গের মধ্যে বাস করিতেন। এইরূপে এক বৎসর সেই সুড়ঙ্গের মধ্যে বাস করিলেন। এইরূপে এক বৎসর অতীত হইলে এক কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর রাত্রিতে ভীম নিজেই সেই গৃহে এবং পুরোচনের গৃহে অগ্নি-সংযোগ করিয়া সকলকে লইয়া সুড়ঙ্গ-পথে পলায়ন করিলেন। প্রবল বায়ুতে জতুগৃহের চতুর্দিকে আগুন জ্বলিয়া উঠিল এবং সেই আগুনে পুরোচনও দগ্ধ হইয়া মারা গেল।

অগ্নির উত্তাপে ও শব্দে সুপ্ত নগরবাসিগণ জাগ্রত হইয়া পরস্পর বলিতে লাগিল- পাপিষ্ঠ পুরোচন দুর্য্যোধনের আদেশে এই গৃহ দাহ করিয়া পাণ্ডবদের বধ করিয়াছে। দুর্বৃদ্ধি ধৃতরাষ্ট্রকে ধিক্; যিনি নির্দোষ পাণ্ডবগণকে শত্রুর ন্যায় দগ্ধ করিয়া হত্যা করিয়াছেন। ভাগ্যক্রমে পাপাত্মা পুরোচনও দগ্ধ হইয়া মরিয়াছে।

এদিকে পঞ্চপাণ্ডব ও কুস্তী সকলের অলক্ষ্যে সুড়ঙ্গ পথ ধরিয়া বহুদূরে গিয়া বাহির হইলেন। তাঁহারা দ্রুত চলিতে অক্ষম হওয়ায় মহাবল ভীম মাতা কুন্তীকে স্কন্ধে এবং নকুল-সহদেবকে ক্রোড়ে করিয়া দ্রুতবেগে চলিতে লাগিলেন। এইরূপে তাঁহারা গঙ্গাতীরে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন- সেখানে বিদুর অনুচরসহ একখানি যন্ত্রচালিত নৌকা পাঠাইয়া দিয়াছেন। তাহাতে নদী পার হইয়া তাঁহারা নক্ষত্র দেখিয়া পথ নির্ণয় করিয়া দক্ষিণদিকে চলিতে লাগিলেন। এইভাবে দীর্ঘপথ অতিক্রম করিয়া সন্ধ্যাকালে তাঁহারা এক ঘোর অরণ্যে উপস্থিত হইলেন। ক্লান্ত হইয়া সকলে সেখানে নিদ্রামগ্ন হইলেন। কেবলমাত্র ভীম জাগ্রত থাকিয়া পাহারা দিতে লাগিলেন।

এদিকে এই সংবাদ হস্তিনাপুরে পৌঁছাইলে ধৃতরাষ্ট্র বহু কপট বিলাপ করিলেন এবং সকলকে লইয়া কুন্তী ও পাণ্ডবদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও তর্পনাদি করিলেন। সকলেই পাণ্ডবদের জন্য শাক করিতে লাগিল। কেবলমাত্র বিদুর অধিক শোক প্রকাশ করিলেন না।

মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বিরচিত মহাভারত
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post