প্রথম স্কন্ধ

প্রথম স্কন্ধ 
প্রথম অধ্যায়
মহামুনি বেদব্যাস বিভিন্ন পুরাণ শাস্ত্র রচনা করেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি যেন তৃপ্ত হতে পারেননি। ঠিক সেইসময় মহান দেবর্ষি নারদের উপদেশ তিনি লাভ করলেন। যার দরুণ তিনি শ্রীমৎভাগবত শাস্ত্র প্রণয়ন করতে চাইলেন। এই গ্রন্থে শ্রীভগবান-এর সমস্ত গুণ বর্ণনা করা হয়েছে।

এই শাস্ত্র তিনি যখন প্রণয়ন করতে চলেছেন, তখন তিনি এইরূপে মঙ্গলাচরণ করেছেন যা থেকে এই বিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে, যাতে স্থিতি ও লয়, তেজ, বারি এবং মৃত্তিকার মতো পদার্থের বিনিময়, সেই ধরনের যে ভাগবত স্বরূপে তম, রজ এবং সত্ত্ব গুণের কার্যাদি সত্যের মতোই পতিত হয়, যিনি স্বয়ং অভিজ্ঞ এবং স্বরাট, যে বেদে দৈবগণ স্বয়ং বিমোহিত হয়ে যান, যে বেদ যিনি আদি কবি ব্রহ্মার হৃদয় পদ্মে প্রকাশ করেছিলেন, নিজের তেজের দ্বারা সবসময় যাতে কুহক নিরস্ত হয়ে রয়েছে, সেই সত্য স্বরূপ স্বয়ং পরমেশ্বরকে আমরা নিয়ত ধ্যান করে থাকি।

মহামুনি বেদব্যাস রচিত শ্রীমদভাগবত গ্রন্থে ঈর্ষাশূন্য সাধুদের ঈশ্বর আরাধনার সমস্ত ধর্ম নিরূপিত হয়েছে। এই বর্ণিত ঈশ্বর আরাধনা রূপ গ্রন্থে ধর্মের তিনটি দিক আছে। আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক এবং আধিভৌতিক। যা পরম মঙ্গল দান করে, সেই বাস্তব বস্তু এখান থেকে জানা যায়। শ্রীমদভাগবত যে গ্রন্থটি সেটি বেদরূপ কল্পবৃক্ষের গলিত ফল।

সেই গলিত ফলই শুকদেবের মুখ থেকে পতিত হয়ে পড়েছে পৃথিবীতে। হে রসিক পাঠকগণ, আপনারা অমৃত দ্রব সংযুক্তা এই রসময় ফল রূপ বেদবারি শ্রবণের পরেও বারংবার পান করতে চাইবেন।

বিষ্ণুক্ষেত্র-যার নাম নৈমিষারণ্য, সেই অরণ্যে শৌণক প্রমুখ ঋষিরা সহস্র বছর যাবৎ একটি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে চলেছিলেন। এই রকমই যজ্ঞের অনুষ্ঠান চলাকালীন একদিন শৌণক প্রভৃতি ঋষিরা প্রাতঃকালে নিত্য নৈমিত্তিক হোম সমাপণ করেছেন। এমন সময় সেখানে রোমহর্ষণের পুত্র সূত এলে ঋষিগণ তাঁকে বসতে আসন দিলেন। সেই ঋষিরা সূতকে সাদরে আপ্যায়ণ করে জিজ্ঞাসাও করলেন-হে সূত, তুমি পবিত্র মহাভারত আদি ইত্যাদি ইতিহাস ধর্মশাস্ত্রগুলি অধ্যয়ন করেছ। যে সমস্ত বেদ বিদ্রা রয়েছে, তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভগবান বেদব্যাস এবং অন্যান্য সগুণ ও নিগুর্ণ সমস্ত তত্ত্ববিদ মুনিরা যা জানেন, হে সৌম্য তুমি স্বয়ং সেই তত্ত্ববিদ মুনিদের অনুগ্রহেই সব জানতে পেরেছ। কারণ হিসাবে বলা যায় সমস্ত গুরুরাই তাঁদের প্রিয় শিষ্যের কাছে সমস্ত গোপনীয় তত্ত্ব অনায়াসে ব্যক্ত করেন। হে আয়ুষ্মন, যে সমস্ত অর্থবোধক রাজ্য রয়েছে তাদের মধ্যে কলি ভাবাপন্ন মানুষের যে সমস্ত মঙ্গলময় বলে তুমি মনে করছ তার সব কিছুই আমাদের কাছে বল, হে সভ্য তুমিতো জানোই বর্তমান এই কলিযুগে মানুষের আয়ু তো ক্রমশ কমেই আসছে। দিনে দিনে মানুষ ক্রমশ অলস এবং অল্প বুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে উঠেছে। ফল স্বরূপ নানা রোগ তাদেরকে দিনে দিনে আক্রমণ করে চলেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন শাস্ত্র, বিভিন্ন কর্ম এবং তাদের শ্রবণের বিষয়েও বিবিধ কথা বলা হয়েছে। হে সুজন, আগে উল্লিখিত বিষয়গুলির মধ্যে যা সার বস্তু, সমস্ত মানুষদের কাছে যা কাঙ্খিত, তুমি তার সমস্ত কিছুই ব্যক্ত কর। হে সূত, ভগবান তোমার সদাই মঙ্গল করুক। সমস্ত ভক্তগণদের পালক পিতা স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু যে কাজ করবার জন্য বসুদেবের পত্নী এবং কংসের প্রিয় ভগিনী দেবকীর গর্ভে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তা নিশ্চয়ই তোমার অজানা নয়।

এই মায়াময় ঘোর সংসার প্রবাহে পতিত সমস্ত মানুষ বিবশের বশীভূত হয়েও যার নাম উচ্চারণ করলে সমস্ত ভয় থেকে মুক্তি লাভ করে, যে ভগবানের পাদরূপ পদ্মশ্রিত প্রসন্নচেতা মুনিরা তাদের চরণ প্রান্তে উপনীত সমস্ত জনগণকে দর্শনমাত্র পবিত্র করেন, সঙ্গাদি পুণ্যবারিযুক্ত নদী তীর্থ বারবার স্নানের দ্বারা তাদের পবিত্র করে থাকেন, উচ্চারিত যত পুণ্য শ্লোকসমূহ, প্রশংসিত কর্ম সেই ভগবানের কলুষতা বিনাশক, যশ, শুদ্ধি, কাম সমূহ কোন্ ব্যক্তি না শ্রবণ, করতে ইচ্ছুক?

মানব সমাজের কল্যাণার্থে স্বেচ্ছায় যে ভগবান নারায়ণ অবতার মূর্তি ধারণ করেন, সেই শ্রীকৃষ্ণের লীলাকাহিনি নারদ প্রভৃতি ঋষিগণ কর্তৃক পরিগীত উদার কর্মসমূহ শুনতে শ্রদ্ধাশীল আমরা, আমাদের কাছে তুমি কর্মসমূহের বর্ণনা কর। হে ধীমান, যিনি নিজ মায়ারূপ লীলার দ্বারা নিজের ইচ্ছায় সৃষ্টাদি কর্ম এবং ভূ-ভার হরণরূপ লীলা করে থাকেন, সেই ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণের মঙ্গলময় মৎস্যাদি দশটি অবতার সকলের কথাও আমাদের কাছে বর্ণনা কর। আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ লীলা শ্রবণে কখনই উদাসীন হই না। এই শ্রীকৃষ্ণ লীলা শ্রবণে রসিককুলের অন্তরে ক্ষণে ক্ষণে মধুর থেকে মধুরতর অনুভূতির আবির্ভাব ঘটতে থাকে।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার বিভিন্ন অবতার লীলায় নিজেকে আত্মগোপন করে মানুষের দেহ ধারণ করেছেন। তিনি তার ভ্রাতা রূপে আবির্ভূত বলরামের সাথে অলৌকিক কার্য সমূহও সম্পাদন করেছেন। তুমি তা আমাদের কাছে ব্যক্ত কর। কলিকাল আগত প্রায় জেনে তার ভয়ে দীর্ঘকাল সাধ্য যজ্ঞের ছলে ঐ বৈষ্ণব ক্ষেত্র যাতে আমরা কলির কথা শ্রবণ করার অবসর পেয়েছি। যারা মহাসমুদ্র পার করবার জন্য ইচ্ছুক বা প্রস্তুত সেই সব মানুষের কাছে এই শাস্ত্র মাঝির মতো, যা জীবদের বিচার করার বুদ্ধি বিনষ্ট করে সেই বিনষ্টকারী কলিরূপ দুস্তর সমুদ্র পার হতে আমরা ইচ্ছুক। তাই তো বোধ হয় তোমাকে কর্ণের ন্যায় বীর করে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। সমস্ত ব্রাহ্মণগণের পরিপালক, পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের রক্ষক, সমস্ত যজ্ঞের ঈশ্বর স্বরূপ শ্রীবিষ্ণু এক্ষণে স্বধামে গমন করেছেন। তাহলে এক্ষণে ধর্ম কাকে আশ্রয় করে আবর্তিত হচ্ছে? হে মহাত্মা, তুমি তা আমাদের সবার নিকট বর্ণনা কর।

দ্বিতীয় অধ্যায়
ভগবানদের কথন ও ভক্তির যে মাহাত্ম তার
সমস্ত ঋষিদের প্রশ্নে পরিতুষ্ট হয়ে রোমহর্ষণ পুত্র সূত তাদের সুবাক্যে অভিনন্দিত করে ঋষিগণকে বলতে শুরু করলেন–

এই পৃথিবীতে যার কোনও কর্ম নেই, যিনি পুত্রের বিরহে একাকী সন্ন্যাসী হয়ে অনবরত গমনরত, সেই ঋষি বিরহ কাতর কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস ‘হা পুত্র’ বলে যে মুনির অনবরত অনুগমন করে চলেছেন, যিনি পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের হৃদয়ে অবস্থিতির জন্য বৃক্ষরূপ ধারণ করে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, যিনি সেই বক্তা মুনি শুকদেবকে আমি প্রণাম করছি। যে সমস্ত মানুষ গাঢ় অন্ধকারময় সংসার রূপ ভবসাগর পার হতে চায়, সেই সমস্ত উগ্রশ্রবা সংসারী জনগণের প্রতি কৃপা দেখিয়ে যে অতি গোপনীয় শ্রী ভগবত পুরাণ বলেছেন। মুনিদের মধ্যে মহামুনি, সমস্ত গুণীদের মধ্যে যিনি মহাগুণী, সেই শুকদেবকে আমি সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাচ্ছি। যে পবিত্র অমূল্য গ্রন্থ যা প্রভাব অতুলনীয়, অসাধারণ প্রভাবে যা পরিপূর্ণ, যা সমস্ত শ্রুতির সারবস্তু, যার তুলনীয় গ্রন্থ আর কিছু নাই, বলা যায় যা এক এবং অদ্বিতীয়, যা অধ্যাত্ম তত্ত্ব মূলক সমস্ত বিষয়ের প্রকাশক, সেই অমূল্য পবিত্র গ্রন্থ যিনি বর্তমানে আমি উচ্চারণ করব। হে নারায়ণ নর, সমস্ত নরদের মধ্যে উত্তম, দেবী, সরস্বতী মহর্ষি বেদব্যাসকে নমস্কার জানিয়ে এই মায়াময় সমস্ত বিশ্বসংসার জয় করতে পারা যায় এবং অন্ধকারত্বের মূল কারণ স্বরূপ সংসারের মায়াময় দুঃখ, সমস্ত কষ্ট হরণ করতে পারা যায় এমন পবিত্র অমূল্য বিশ্বজগতের এমন গ্রন্থ পাঠ করবেন।অনলাইনে বেস্টসেলিং বই কিনুন

হে মুনিগণ, আপনাদের এই সুন্দর শান্তিদায়ক পূর্ণ প্রশ্নে আমার চিত্ত সত্যিই বিমোহিত হয়েছে। আপনি আমাকে শ্রীকৃষ্ণ বিষয়ক প্রশ্ন করেছেন। কোনো ইন্দ্রিয় দ্বারাই স্পর্শ যোগ্য নয় সেই অতীন্দ্রিয় তত্ত্ব শ্রীভগবানের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করাই সংসারের জীবমাত্রের সবার বা সমস্ত জীবের পরম ধর্ম, এই ভক্তিকে প্রতিহত করা যায় না, এরূপ ভগবানের প্রতি ভক্তির দ্বারাই আত্মার সম্যকভাবে প্রসন্নতা লাভ হয়। ভগবান বাসুদেবের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করলে জীব সমাজের বৈরাগ্য এবং অহেতুক জ্ঞানের সঞ্চার ঘটে। সমস্ত ধর্ম প্রথম থেকে সুষ্ঠরূপে অনুষ্ঠিত হলেও যদি কৃষ্ণের কথা শুনে ভক্তগণের ভক্তি উৎপন্ন না হয়ে থাকে, তাহলে সেটাকে বলা চলে পন্ডশ্রম। কোন কিছুর প্রতি প্রবৃত্তি এবং কোন কিছু থেকে নিবৃত্তিকে বলা যায় ধর্মের ফল। ভোগের ফল বলতে শুধু ইন্দ্রিয় সমূহকে চরিতার্থ করা বোঝায় না বা, সমস্ত ইন্দ্রিয় উপভূক্ত নয়। এক্ষেত্রে বলা যায়, যে বা যতটুকু ছাড়া জীবন ধারণ করা সম্ভব নয় ঠিক ততটুকুই গ্রহণ করতে হবে এর অতিরিক্ত অগ্রহণযোগ্য।

সমস্ত তত্ত্ববিদরা তাকেই তত্ত্ব বলে থাকেন, যা অদ্বিতীয় যা একক জ্ঞান। এই অদ্বয় জ্ঞানের স্বরূপকে ব্রহ্ম পরমাত্মা বলা হয়ে থাকে। জগতের সমস্ত শ্রদ্ধাশীল মুনিরা বেদ সমূহের শেষভাগ যা বেদান্ত নামে পরিচিত তারা তা শ্রবণের দ্বারা পরম আনন্দরূপ জ্ঞান প্রাপ্ত হন। সেই পরমব্রহ্মরূপ আনন্দরূপ জ্ঞান লাভ করে মুনিরা বৈরাগ্যযুক্ত প্রেমলক্ষণ রূপ ভক্তি দ্বারা তাদের পবিত্র বা বিশুদ্ধ হৃদয় দ্বারা পরম শুদ্ধ পরম আত্মাকে স্বয়ং প্রত্যক্ষ করে থাকেন।

সমস্ত শ্রদ্ধেয় দ্বিজদের মধ্যে পরম শ্রদ্ধেয় শ্রেষ্ঠ দ্বিজগণ, বিভিন্ন বর্ণ অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন যে ধর্ম বিভিন্ন আশ্রম অনুসারে অনুষ্ঠিত ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের যে প্রয়োগ করেন তা হল কিন্তু আসলে কলির আরাধনা করা। পরম সংযমের দ্বারা মনকে একত্র করে সমস্ত জগত সংসারের ভক্তগণের প্রতিপালক ভগবানের কথাই শুধু শ্রবণ করুন। ভগবানের রূপ কীর্তন গানে সমস্ত জগতের বাতাস মুখরিত হোক। যে পরমদেব যার অনুধ্যান অর্থাৎ চিন্তামাত্র বিবেকীগণ অহংকারের দরুন উত্থিত কর্ম গ্রন্থি করে থাকেন, তাঁর কথা শুনতে কে না আগ্রহী, বলা বাহুল্য তার গুণ কীর্তন শুনতে সবাহ-ই আগ্রহী হন।

হে মহান আত্মারা, হে বিপ্রগণ, পুণ্য তীর্থে গমন করলে মহতের সেবা করার পরম সৌভাগ্য হয়, কিন্তু আবার মহৎ সেবার দ্বারা ভগবানের উপাসনায় শ্রদ্ধার জন্ম মানুষের শরীরে হয়ে থাকে। এই শ্রদ্ধার থেকে জন্ম নেয় ভাগবত কথা শ্রবণের ইচ্ছা এইভাবেই মানুষের মধ্যে জন্ম নেয় ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ যা সীমাহীন। সুতরাং ভগবানের গুণ কীর্তন ও তাঁর কথা শ্রবণ করাই হল আমাদের ন্যায় অজ্ঞানের কাছে পুণ্যের কাজ। সমস্ত জগতের সৎ যে মানুষজন তাদের সুহৃদ শ্রীকৃষ্ণ। তার আত্মকথা যারা শ্রবণ করে, তিনি সেই জনগণের হৃদয়ে প্রবিষ্ট হন। তিনি অকৃত বা কৃত সব অমঙ্গল বিধৌত করেন, নিত্য ভাগবত সেবার দ্বারা হৃদয়ের অদৃষ্ট পাপসমূহকে বিনষ্ট করা যায়। শ্রীকৃষ্ণের বর্ণনা মূলক বা স্তবমূলক উত্তম শ্লোকগুলির উচ্চারণ মাত্র শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্তির উদয় করে। সত্ত্ব, রজ, তম প্রভৃতি গুণ সমূহ থেকে যে কামের উদ্বুদ্ধিকরণ ঘটে তার দ্বারা লোভে আবিষ্ট চিত্তকে আর আকড়ে ধরে রাখতে পারে না। চিত্ত স্বত্তগুণে স্থিত থেকে প্রসন্নিত হয়, এইরকমভাবে ভগবানের প্রতি ভক্তি করতে করতে মন চিরকালীন আহ্লাদিত হয়। মানসিক সংযমের আবেশ ঘটে ফলস্বরূপ সকল বিষয়ের প্রতি সমস্ত রকম আসক্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। সংযমের ফলে ত্যাগের ফলে পবিত্র সেই মানুষের ভগবত স্বরূপের সাক্ষাৎকার হয়ে থাকে। সেই পরমাত্মা ঈশ্বর যখন দৃষ্টি গোচর হয়ে যান তখন মানুষের হৃদয়ের সমস্ত গ্রন্থিসমূহের বিনাশ সাধন ঘটে। পরম আস্থা বা বিশ্বাসের আগমন ঘটার দরুন পাপ জনিত সকল সংশয়ের অবসান ঘটে। এতদিন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া জীবের সকল কর্মসমূহ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। সুতরাং হে মনীষীগণ, ভগবান বাসুদেবের পরম পবিত্র শ্লোক উচ্চারণ করুন।

প্রকৃতিতে মোট তিনটি গুণ রয়েছে, সেগুলি হল, সত্ত্ব, তম এবং রজঃ। এই তিনটি গুণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরম পুরুষ এই বিশ্বের সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির জন্য ব্রহ্মাকে, স্থিতি রক্ষার জন্য বিষ্ণুর এবং প্রলয়ের জন্য মহেশ্বর-এর নাম ধারণ করেছেন। এই গুণ তিনটির মধ্যে সত্ত্ব গুণ শ্রী বাসুদেবের হাতেই সমর্পিত হয়েছে। শ্রীবিষ্ণু সকল জীবের মঙ্গল সাধন করে থাকেন। এই রূপ দৃষ্টান্ত থেকে আমাদের জ্ঞান হয় যে, প্রবৃত্তিরূপ প্রকাশ যদি রহিত হয়, পার্থিব কার্যের থেকে ধূম শ্রেষ্ঠ হয়, ধূম থেকে প্রকাশ স্বভাব যে শ্রীময়, অগ্নি সে শ্রেষ্ঠ! কাঠের কিন্তু চলন শক্তিও নেই আবার তার প্রকাশ শক্তিও নেই। তাইতো গমনশীল ধর্মকে কাঠের থেকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। কিন্তু আবার ধূম অপেক্ষা অগ্নি শ্রেষ্ঠ কেননা অগ্নি স্বভাবতই ঊর্ধ্বে গতিশীল ও প্রকাশ করা তার বৈশিষ্ট। সেই অগ্নির দ্বারাই আমরা বেদে উক্ত যজ্ঞাদি সমস্ত কার্যসমূহ সম্পাদন করে থাকি। প্রথমে উল্লিখিত দৃষ্টান্তের ন্যায় জয়শীল তমঃগুণের থেকে ক্রিয়াশীল রজঃগুণ শ্রেষ্ঠ। আবার এদের থেকেও শ্রেষ্ঠ হচ্ছে সত্ত্বগুণ। সব থেকে শ্রেষ্ঠ সত্ত্বগুণের দ্বারাই ব্রহ্মদর্শন মানুষের হয়ে থাকে।

অতীতে বিভিন্ন পুণ্যাত্মা মুনিরা বিশুদ্ধ যে সত্ত্ব মূর্তি অতীন্দ্রিয় তত্ত্ব ভগবান বাসুদেবকেই ভজন করতেন। বর্তমান যুগে যে সমস্ত মানুষ সেই পুণ্যাত্মা মুনিদের পথকে অনুসরণ করে ভগবান বাসুদেবের ভজন করে থাকেন। যাঁরা মোক্ষ লাভ করতে চান। তারা নারায়ণের অবতার মূর্তিকেই চিরন্তন সেবা করবেন। তার মানে এই নয় যে বিষ্ণু বাদে অন্যান্য দেবতাদের আপনারা নিন্দা করবেন। মানুষের মধ্যে যারা রজঃ এবং তমঃ প্রকৃতির তারা স্ত্রী ও পুত্র কামনায় এমনকি ঐশ্বর্যের কামনায় রজঃ ও তমঃ গুণের স্বভাব যুক্ত পিতৃলোক, ভূত ও প্রজাপতির সেবা করে থাকেন। সমস্ত বেদের উপর বাসুদেব প্রত্যক্ষ ভাবে এবং পরম্পরাগত ভাবে বাসুদেবকেই বোঝানো হয়েছে। এই সমস্ত যে যজ্ঞ যোগ নিত্য নৈমিত্তিক আদি ক্রিয়া রূপ যে জ্ঞান, যে সব তপস্যারূপ ধর্ম এবং তারপর কর্ম ফল এই সব কিছুর তাৎপর্য হলেন ভগবান বাসুদেব।

বাসুদেব স্বয়ং সমস্ত গুণের অতীত অর্থাৎ নিগুণ হয়েও এই বাসুদেব ভগবান সদ্ এবং অসদরূপ ত্রিগুণময়ী, নিজ মায়ার দ্বারা আগেই এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন। ভগবান, তার নিজ মায়ার দ্বারা উদ্ভূত আকাশাদি কার্যে অন্তর্যামী রূপে প্রবিষ্ট হয়ে রয়েছেন। তাইত তাকে সত্ত্ব প্রভৃতি গুণ যুক্ত বলে মনে হয়। কিন্তু আসলে তিনি কোনরকমভাবেই গুণযুক্তা নন, কারণ, তিনি স্বীয় চিৎশক্তির দ্বারা সদাই সমস্ত বিশ্বে পরিপূর্ণ। একবার আগুন ধরানো হলে তা বিভিন্ন কাঠে বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ পেলে তাকে আমরা বহু বলে মনেও করতে পারি, এক বিষাত্মা সকলের অন্তর্যামী পরমেশ্বর সকল প্রাণীতে অবস্থিত বলে তাকে বহু বলে মনে করে থাকি আমরা।

সে পরমাত্মা পবিত্র, সমস্ত বিশ্বের আধার রূপ সে ভগবান সূক্ষ্ম এবং স্থূল কারণাত্মক গুণময়। অর্থাৎ নিজে মায়ার দ্বারা রচিত ভাবের দ্বারা নিজের ইচ্ছায় সৃষ্ট চতুর্বিধ প্রাণীতে নিবিষ্ট হয়ে বৈষয়িক সুখ ও দুঃখ ইত্যাদি তিনি ভাগ করে থাকেন। সেই ভগবান দেব, তির্যক এবং নরাদিদের লীলাবশত সেই সকল অপরূপ অদ্ভুত সব অবতার মূর্তি ধারণ করেন। সেই পরমাত্মা ভগবান সে সকল অবতার মূর্তিতে অনুরক্ত হয়ে সত্ত্বগুণের দ্বারা সমস্ত লোককে পালন করে থাকেন। কারণ তিনিই হলেন সমস্ত সংসার জগতের মূল। তথা তিনিই সমস্ত লোকের সৃষ্টিকর্তা।

তৃতীয় অধ্যায়
ভগবানের চতুর্বিংশতি অবতারের বর্ণনা
এর সঙ্গে সূত বিশ্বসৃষ্টির কারণ হিসাবে আরও বলে চললেন,– ভগবান প্রথমে বিশ্ব সৃষ্টি করতে গিয়ে প্রথম পুরুষরূপে বিরাট বিগ্রহ রূপ ধারণ করেছিলেন। এই বিরাট বিগ্রহ মূর্তি মহত্ব অহংকার দ্বারা গঠিত। এই বিরাট মূর্তির একাদশটি ইন্দ্রিয় এবং পঞ্চ মহাভূতের ষোলোটি অংশ ছিল। প্রলয়ের সময় সমুদ্রের গভীরে শয়ন করে যোগ নিদ্রায় সেই একাদশ ইন্দ্রিয় বিশিষ্ট বিরাট পুরুষ নিদ্রিত অবস্থায় ছিলেন। সেই বিরাট পুরুষের নাভিরূপ হ্রদে উৎপন্ন পদ্ম থেকে ব্রহ্মদেব আবির্ভূত হন। যিনি সমস্ত বিশ্বের সৃষ্টিকর্তাদের অধিপতি। এই বিরাট পুরুষরূপ বিষ্ণুর চরণাদি সন্নিবেশের দ্বারা বিশ্ব প্রপঞ্চ নির্মিত হয়েছে। তার এই শায়িত বিরাট একাদশ ইন্দ্রিয় বিশিষ্ট মূর্তি বিশুদ্ধ সত্ত্ব গুণ বিশিষ্ট। অর্থাৎ তম এবং রজঃ গুণ থেকে সম্পর্ক শুন্য। এই পরম আশ্চর্য বিরাট পুরুষরূপ মূর্তিটিই হল ভগবানের আসল রূপ।

এই ভগবানের বিরাট পুরুষ রূপ দর্শন করা সাধারণ দৃষ্টি দিয়ে সম্ভব নয়। এরজন্য জ্ঞান দৃষ্টি প্রয়োজন। আর মুনিগণ সেই জ্ঞান দৃষ্টি দ্বারা ভগবানের সেই বিরাট পুরুষ রূপ দর্শন করে থাকেন। এই মূর্তির অসংখ্য চরণ রয়েছে, উরু, আনন, মশুক, কর্ণ, চক্ষু ও নাসিকা রয়েছে। এর সাথে মুকুট বস্ত্র ও কুন্ডলের সম্পর্ক আছে। ভগবানের এই বিরাট পুরুষ রূপ হল নারায়ণ ভগবানের আদিরূপ, এই একাদশ ইন্দ্রিয় বিশিষ্ট বিরাট পুরুষ বিষ্ণুর নানা অবতারের আশ্রয় স্থান এবং অক্ষয় বীজ স্বরূপ। এই নারায়ণের বিরাট রূপী পুরুষ থেকেই বা তার অংশ থেকে সমস্ত দেবতা, তির্যক জাতি এবং মানুষের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রথম পুরুষ অবতারে কৌমার নামক সৃষ্টিতে ভগবান ব্রহ্মারূপ ধারণ পূর্বক অত্যন্ত দুষ্কর ব্রহ্মচর্য পালন করেছিলেন।

দ্বিতীয় অবতার হল তার বরাহ অবতার। প্রলয় উপস্থিত হলে তিনি বরাহরূপ ধারণ করে পৃথিবীকে তার দন্তে স্থাপন করে রক্ষা করেছিলেন। তৃতীয় অবতার হয়ে ঋষিসর্গে দেবর্ষি নারদ হয়ে বৈষ্ণব তন্ত্রের বর্ণনা দেন। বৈষ্ণব তন্ত্র হল এমন একটি শাস্ত্র, যা পাঠ করলে সমস্ত মানুষ এই লোকের সমস্ত রকম কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়। চতুর্থ অবতারে তিনি ধর্মপত্নীর গর্ভে নর ও নারায়ণ নামে দুজন ঋষি হয়ে জন্মান এবং অত্যন্ত কঠোর তপস্যা করেন যা সবার পক্ষে দুষ্কর। সিদ্ধ পুরুষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কপিল রূপ হল ভগবান বিষ্ণুর পঞ্চম অবতার। এই অবতারে তিনি আসুরি নামক ব্রাহ্মণকে সাংখ্য শাস্ত্র বলেছিলেন। অত্রি পত্নী অনসূয়ার গর্ভে জন্ম হয় ভগবান বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার। তিনি অনসূয়ার প্রার্থনার হেতু তাঁর গর্ভজাত হন। এই অবতারে তিনি অলক ও প্রহ্লাদ প্রভৃতিকে আত্মবিদ্যা উপদেশ করেন। সপ্তম অবতারে তার নাম হয় যজ্ঞ। তিনি রুচির পত্নী আকুতির গর্ভ থেকে জন্ম নেন। তার পুত্র যম প্রভৃতি দেবগণের সাথে এই অবতারে তিনি মন্বন্তর পালন করেছিলেন অর্থাৎ তিনি নিজে ইন্দ্র হয়েছিলেন। অষ্টম অবতারে তার নাম হয় ভগবান ঋষভদেব। নাভির পত্নী মেরুদেবীর গর্ভে ঋষভদেব রূপে অবতীর্ণ হন। তিনি সমস্ত আশ্রম বাসীদের মধ্যে শ্রেষ্ট পরমহংসের পথ দেখান। এটি সকলের দ্বারা সেবিত। ভগবান শ্রীবিষ্ণু তার নবম অবতারে মহারাজ পৃথুরূপে অবতীর্ণ হন। মহারাজ পৃথু পৃথিবী থেকে সমস্ত ঔষধি সমূহ দোহন করেছিলেন। তার জন্য তিনি সবার কাছে পরম শ্রদ্ধেয়। তার দশম অবতার হল মৎস্য অবতার। সেই সময় চাক্ষুষ ভাবে মন্বন্তর যে ঘটেছিল তাতে সমস্ত সমুদ্র প্লাবিত হয়ে পড়ে, তিনি তখন জীব জগৎকে রক্ষার্থে পার্থিব নৌকাতে রৈবস্বত মনুকে স্থাপন করে রক্ষা করেন।

দেবতা ও অসুরেরা যখন সমুদ্র মন্থন করেছিলেন তখন ভগবান একাদশ অবতার রূপ গ্রহণ করেন। সেই অবতারের নাম হল কূর্ম অবতার। মন্থনের দরুণ মন্দার পর্বত যখন সমুদ্রতলে প্রায় নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছিল তখন তিনি কূর্ম রূপ ধারণ করে মন্দার পাহাড়কে পিঠে ধারণ করেন। দ্বাদশ অবতারের নাম ধন্বন্তরি। এই ধন্বন্তরি অবতারে তিনি সমুদ্র থেকে অমৃত ভাণ্ড তুলে নিয়ে আসেন। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর ত্রয়োদশ অবতারের নাম মোহিনী, অমৃত পান করা নিয়ে যখন অসুর ও দেবতাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের উপক্রম উপস্থিত হয়, তখন তিনি মোহিনী রূপ ধারণ করে অসুরদের বিমোহিত করে দেবতাদের অমৃত পান করান। চতুর্দশ অবতারের নাম হল নৃসিংহ অবতার। অদ্ভুত সেই রূপ সিংহের ন্যায় মুখ কিন্তু মানুষের ন্যায় শরীর। এই অবতারে ভক্ত প্রহ্লাদের বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়ে হিরণ্যকশিপুকে ঊর্ধ্বে স্থাপন করে নখের দ্বারা তার বক্ষস্থল বিদীর্ণ করেন। ভগবান শ্রীবিষ্ণু তাঁর পঞ্চদশ অবতারে বামন রূপ ধারণ করে ত্রিপাদ বিশিষ্ট ভূমি প্রার্থনার ছলে স্বর্গরাজ্য কেড়ে নেবার জন্য বলির যজ্ঞে যান।

তার ষোড়শ অবতারটির নাম পরশুরাম। এই অবতারে তার অস্ত্র হল পরশু। এই অবতারে তিনি একবিংশতিবার পৃথিবীকে ক্ষত্রিয় শূন্য করেন। ক্ষত্রিয়দের নিধনের অন্তরালে ছিল রাজন্য বর্গের ব্রাহ্মণদ্বেষী মনোভাব। সপ্তদশ অবতারটি হলেন মহর্ষি ব্যাসদেব। মৎস কন্যা সত্যবতীর গর্ভে ঋষি পরাশরের ঔরসজাত ছিলেন এই বেদব্যাস। এই ব্যাসদেব বেদরূপ বৃক্ষের বহু শাখার উদ্ভাবন করেন। বলা বাহুল্য তিনি বেদকে বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত করেন। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অষ্টাদশ অবতারের নাম হল ভগবান রামচন্দ্র। তিনি ইক্ষাকু বংশীয় রাজা দশরথের পুত্র রূপে দেবতাদের কার্য সাধনের ইচ্ছায় রামচন্দ্র হিসাবে মর্তে আবির্ভূত হন।

একবিংশতি অবতারে ভগবান শ্রীবিষ্ণু যাদবকুলে বলরাম ও কৃষ্ণ নামে জন্ম গ্রহণ করেন। এর পরই উপস্থিত হয় কলিকাল। কলিযুগে সমস্ত দেবতা বিদ্বেষীদের দেবতার প্রতি বিশ্বাস আনার জন্য গয়া প্রদেশে অঞ্জন পুত্র বুদ্ধ নামে আবির্ভূত হন। কলিযুগের শেষাশেষি রাজন্যবর্গ একেবারে ভালোবৃত্তি ছেড়ে দিয়ে দস্যুবৃত্তিতে নেমে আসতে থাকে। সেই জন্য বিষ্ণু যশা নাম ব্রাহ্মণ থেকে ভগবান কল্কি নামে জন্ম গ্রহণ করেন জগৎকে পুনরায় রক্ষার জন্য।

ভগবান হরির অবতার অসংখ্য, যার কোন ক্ষয়ও নেই, পূর্ণ সরোবর থেকে যেমন-হাজার হাজার ক্ষুদ্র প্রবাহ, নির্গত হতে থাকে, তেমনই এই বিষ্ণু ভগবানের বিরাট রূপী মূর্তি থেকে অন্যান্য অবতারের আবির্ভাব ঘটে জগৎ-এর বিভিন্ন কারণ ও উদ্দেশ্যকে সফল করবার জন্য। ঋষি মনুদেব, মনুপুত্র দিকপাল লোকপাল এরা সকলেই হলেন ভগবান হরির অংশ। পূর্বোক্ত সব অবতাররা এবং যা এখনও উক্ত হয়নি সেই অবতাররা এই ভগবান শ্রীহরির বিরাট রূপী পুরুষের অংশ বা কলা। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান অর্থাৎ তিনি কারও অবতার নন। তিনি ত অবতারী। তিনি বিভিন্ন অবতারে অসুরগণ কর্তৃক পীড়িত এই লোককে যুগে যুগে রক্ষা করে সুখী করে থাকেন। যে সকল ব্যক্তিরা শুদ্ধচিত্ত পবিত্র হয়ে এই সকল অবতারের অতি রহস্য জনক জন্মবৃত্তান্ত সন্ধান করে থাকে, তারা দুঃখ ও মায়াময় জগৎ সংসার থেকে মুক্তি পায়।

নিরাকার চৈতন্যময় ভগবানের এই স্কুল ও সূক্ষ্ম কারণাত্মক এ জগৎ রূপ এবং মায়া গুণের দ্বারাই আত্মাকে রচিত করেছে। সমস্ত নির্বোধ মানুষ মেঘকে আকাশের এবং পার্থিব ধূলিকণাকে বাতাসের বর্ণ বলে মনে করে। দ্রষ্টা আত্মাকে দৃশ্য স্নেহ বলে মনে করে। দৃষ্ট এই স্থূল দেহ ছাড়া অন্য সূক্ষ্ম দেহে আছে, যেটা এখনও পরিণত হয় নি এবং মায়ার গুণের দ্বারা রচিত। এটি নিরাকার অর্থাৎ কোন আকারই এর নেই। প্রত্যক্ষের ন্যায় বা দৃষ্টি দ্বারা তাকে উপলব্ধি করা যায় না বা দেখাও যায় না। ইন্দ্রাদি দেবতাদের মতো তা শোনাও যায় না। এই সমস্ত কারণের জন্য জীবাত্মার নাম দেওয়া হয়েছে লিঙ্গশরীর। এই লিঙ্গশরীর, নিয়েই বার বার জীবের জন্ম হয়। স্থূল শরীর এবং সূক্ষ্ম শরীর অবিদ্যার দ্বারা আত্মাতেই কল্পিত রয়েছে। জীবের যে আত্মা পরম ব্রহ্ম জ্ঞান লাভ করে, তার ফলে তার দুটি দেহ সূক্ষ্ম ও স্কুল শরীর বিনষ্ট হলে, সেই জীব ব্রহ্মস্বরূপ লাভ করে। সংসার চক্রে ভগবানের মায়া বিদ্যা রূপিণী হয়ে যদি ক্রিয়া থেকে নিবৃত্ত হয়, তাহলেই জীব পরমব্রহ্মকে লাভ করে। যে সমস্ত পণ্ডিতেরা তত্ত্বদর্শন করে থাকেন, ভগবান অবতার রূপে জন্ম লাভ করলেও তাঁর জন্ম ও কর্ম সবই দিব্য জীবদের ন্যায় প্রকৃত জন্ম কর্ম রহিত হয়ে থাকে। ভগবানের জন্ম ইত্যাদি, অবশ্যই মায়াচিত হয়ে থাকে। তত্ত্বজ্ঞানীরা একথা সব বলে থাকেন।

ঈশ্বর পরিদৃশ্যমান ঠিকই। তিনি সমস্ত বিশ্বের সৃষ্টি পরিচালনা করছেন, তিনি সমস্ত বিশ্বের স্থিতি বজায় রাখছেন এবং সমস্ত দুষ্ট আত্মাদের সংহার করে তিনি বিশ্বজগতকে রক্ষাও করছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল যে, ঈশ্বর কিন্তু তাতে কোন ভাবেই আসক্ত হন না। ভগবান স্বাধীন তিনি কারও বশবর্তী নন। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সমুহের তিনি হলেন নিয়ন্ত্ৰা, তিনি প্রতিটি জীবে অন্তর্যামী রূপে অবস্থিত রয়েছেন। এই ভাবে প্রতিটি জীবে অবস্থিত থেকে তিনি দৃষ্টি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা বিষয়রূপ রস প্রভৃতিকে গন্ধের ন্যায় অনুভব করে চলেছেন। জীবজগৎ–এ যে সমস্ত মানুষেরা নির্বোধ তারা যেমন ভগবানের এই সমস্ত কার্যকলাপ বুঝতে পারে না, ঠিক তেমন ভাবেই দুষ্টবুদ্ধি বা কুবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরা যাদের মধ্যে ভক্তির অভাব রয়েছে, তারা নিপুণ ভাবে যুক্তিতর্কের দ্বারা ভগবানের লীলা রূপ রহস্য ও অনুধাবন করতে পারে না। সম্পূর্ণ জগতের আধার এই ভগবান মনের দ্বারা বহুরূপ প্রকাশ করে থাকেন, এবং বাক্যের দ্বারা বহু নাম প্রকাশ করে থাকেন। যিনি বা যে সমস্ত নির্বোধ মানুষেরা এই দুরন্ত বীর্য চক্রধারী মহা ভগবানের লীলা রহস্য সব জানতে পারেন, তিনি আপ্লুত ভক্তির দ্বারা তার চরণ রূপ কমলে সৌরভের ন্যায় সেবা করেন। হে মুনিগণ, আপনার এই দুশ্চর সাধনায় সমবেত, এই আপনাদের প্রতি ঈশ্বরের অনুরাগ যদি বর্ধিত হয় তাহলে এই সংসারের মোহ, যাতনা, দুঃখ প্রভৃতি থেকে মোক্ষ লাভ করবেন। বলা বাহুল্য যে, আর সংসার রূপ যাতনার পুনরাবর্তন ঘটবে না।

মোক্ষ লাভের আশায় সর্বজ্ঞ ঋষি বেদব্যাস ভাগবত পুরাণ রচনা করেন। মহর্ষি ব্যাসদেব রচিত ভাগবত পুরাণ গ্রন্থ বেদতুল্যই বটে, তার সঙ্গে মঙ্গলবহ এবং সব থেকে সেরা। যিনি আত্মবীর গণের শ্রেষ্ঠ তিনি নিজ পুত্রকে ভাগবত পুরাণ অধ্যয়ন করিয়েছেন। বেদব্যাস রচিত সম্পূর্ণ ভাগবত পুরাণে সমস্ত বেদ এবং ইতিহাসের সারবস্তু সংকলিত রয়েছে। সূত শুকদেব মহারাজ পরীক্ষিতকে ভগবত পুরাণ শ্রবণ করান। রাজা পরীক্ষিত তখন গঙ্গাতীরে অনশন করছিলেন এবং অনশন কৃত ঋষিগণের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। হে মুনিগণ গঙ্গাতীরের সেই সভায় মহা তেজস্বী মহর্ষি শুকদেব ভাগবত কীর্তন করেছিলেন। আমি কিন্তু তাঁরই অনুগ্রহে ভাগবত পুরাণ শ্রবণ করেছি। সেই আমিই তেজস্বী শুকদেব থেকে যা যা অধ্যয়ন করেছি তা আপনাদের শোনাব। কৃষ্ণ তার বিভিন্ন অবতারে ধর্ম, জ্ঞান এবং ঐশ্বর্যের সাথে মিলিত হয়ে নিজের নিত্য লীলায় প্রবিষ্ট হয়েছেন, কিন্তু এই ধর্মের প্রত্যক্ষ জ্ঞান যাদের নেই, যারা বিবেক ও জ্ঞান রহিত, কলিযুগের সেই সব জনগণের জন্য ভাগবত পুরাণ রূপ সূর্যের উদয় প্রত্যক্ষ হচ্ছে।

চতুর্থ অধ্যায়
মহামুনি বেদবাস অপরিতুষ্টর কাছে দেবর্ষি নারদের আগমন
যে সমস্ত মুনিরা যজ্ঞকর্মাদি করেন, তাঁদের মধ্যে বয়ঃবৃদ্ধ কুলপতি শৌণক বললেন– হে সূত, তুমি তো ভাগ্যবান এবং বাগ্মী শ্রেষ্ঠ ভগবান শুকদেব যে তোমার কাছে ভাগবতের কথা ব্যক্ত করেছেন, তুমি সেই ভাগবত মূলক কথনগুলির আমাদের নিকট বর্ণনা কর। কোন্ যুগে কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার হেতু এবং কীভাবে তা প্রবৃত্ত হয়েছিল? কার দ্বারা প্রেরিত হয়ে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস এই বিশাল এবং পবিত্র সমস্ত বেদের মূল স্বরূপ ভাগবত পুরাণ সংহিতা রচনায় নিবিষ্ট হন। তার পুত্র ছিলেন শুকদেব, যিনি মহাযোগী ব্রহ্মজ্ঞ ভেদ বুদ্ধির হিত স্থিত প্রাজ্ঞ এবং মায়া শয্যা থেকে উখিত হয়ে মড়ার মতো পতিত হলেন। একদিন ব্যাসদেবের নগ্নপুত্র শুকদেবের পিছনে গমনকারী ব্যাসদেব কিন্তু বসন পরিহিত ছিলেন, কিন্তু তবুও তাকে দেখে জলক্রিয়ায় ব্যস্ত অপ্সরারা লজ্জায় বস্ত্র পরিধান করল, কিন্তু আশ্চর্য এই যে তার আগেই উলঙ্গ হয়ে পুত্র গমনকালে কিন্তু অপ্সরার ওরূপ কাজ করেনি। এইরূপ অদ্ভুত দৃশ্য দেখে আশ্চর্য চকিত হয়ে বেদব্যাস জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমরা এরূপ করলে, এর অর্থ কি হয়, উত্তরে অপ্সরারা বলেছিল– হে মুনি, তুমি বৃদ্ধ জ্ঞান বুদ্ধি সম্পন্ন ঋষি, সব থেকে বড় কথা এই যে, তোমার শ্রীপুরুষ, সেই ভেদ বুদ্ধি, বিচার ক্ষমতা তোমার মধ্যে আছে। কিন্তু তোমার পুত্ৰ এতে শিশু তার ভেদবুদ্ধি হয় নি।

শুকদেব একদিন কুরু ও জঙ্গল প্রদেশ ভ্রমণ করতে উন্মত্ত গোবাহ জলের মতো বিচরণ করতে করতে হস্তিনাপুরে এসে প্রবেশ করলেন। পুরবাসীরা কি শুকদেবকে চিনতে পেরেছিল। হে বৎস্য আমাদেরকে তুমি বল যে এই শুকদেব মুনির সাথে কীভাবে পাণ্ডববংশীয় রাজর্ষি পরীক্ষিতের আলোচনা হয়েছিল, এবং যার দরুন ভাগবত সংহিতা পবিত্র হয়েছে। মহাভাগ্যবান শুকদেব গৃহস্থের গৃহ পবিত্র করার হেতু কিছুক্ষণ অপেক্ষায় রত থাকতেন। সূত, অভিমন্যু পুত্র পরীক্ষিতকে কেন ভক্তদের মধ্যে উত্তম ভক্ত বলা হয়, তার সমস্ত আশ্চর্য জন্ম এবং কর্মসমূহ আমাদের কাছে বিবৃত কর। পান্ডুবংশের রাজাধিরাজ মানবধর্ম পরীক্ষিতের কী এমন সময় উপস্থিত হয়েছিল যে তিনি তাঁর রাজ্যের উৎকৃষ্ট রাজ্য সম্পদ সমস্ত অনাদর করে গঙ্গাতীরে আমরণ অনশন ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। যে রাজলক্ষ্মীর চরণরূপ পদ্মে শত্রুরা পর্যন্ত নিজেদের মঙ্গলের আশায় নিজেদের সমস্ত ধনসম্পদ সমর্পণ করে প্রণাম করতেন, হে প্রিয়, সেই বীর রাজা পরীক্ষিত কী কারণে রাজলক্ষ্মী ত্যাগ করতে ইচ্ছা করেছিলেন, ভাগবত ভক্তগণ পর্যন্ত ও সমস্ত জনগণের মনোবল সমৃদ্ধির হেতু এবং ঐশ্বর্যের জন্য জীবিত থাকেন, শুধু নিজের জন্য বাঁচেন না, তাহলে সেই মহরাজ কেন পরহিতে নিজের দেহ পরিত্যাগ করলেন। একথাও শুনতে আমরা উদগ্রীব। এছাড়া আরও নানা জ্ঞানমূলক আলোচনা তোমার কাছ থেকে জানতে আমরা আগ্রহী। তুমি শুধু বেদই নয়, সমস্ত শাস্ত্র পারদর্শী।

এই কথা শুনে সূত বলতে শুরু করলেন, তৃতীয়তম যুগ যার নাম দ্বাপর যুগ, এই যুগ উপস্থিত হলে পরাশর মুনির ঔরসে পশুকন্যা সত্যবতীর গর্ভে হরির সপ্তদশ অবতার রূপে ব্যাসদেবের জন্মলাভ ঘটে। কোন একদিন সূর্যোদয়ের পরবর্তী সময়ে সরস্বতী নদীর পবিত্র জলে স্নান করে বদরিকাশ্রমে বসেছিলেন এই সর্বজ্ঞ ব্যাসদেব মুনি, এবং ভাবতে থাকলেন, কালের প্রভাবের দরুণ পৃথিবীতে যুগে যুগে ধর্মের বিপর্যয় ঘটে যায়। পঞ্চভূত দিয়ে এই যে শরীর গঠিত, সেই শরীরের শক্তি ক্রমশ ক্ষয় হয়ে থাকে। গুরুবাক্যে যাদের বিশ্বাস নেই প্রায়, এমনকি শাস্ত্রাদিতেও পর্যন্ত যাদের বিশ্বাস রহিত সেই সমস্ত অল্প আয় বিশিষ্ট জনগণকে দেখে সর্বজ্ঞান সম্পন্ন এই ঋষি ব্যাসদেব বিভিন্ন বর্ণ ও আশ্রমের কথা, তাদের হিতের কথা চিন্তা করছিলেন। বৈদিক কর্ম ইত্যাদি সমস্ত প্রজাগণের শুদ্ধিকরণ করে বিচার করে তিনি বেদকে চারভাগে বিভক্ত করলেন। চারটি বেদ হল–ঋক্, যজুঃ, সাম ও অথর্ব। এই চার নামে বেদ উদৃত হল। ইতিহাস মূলক পুরাণকে পঞ্চম বেদ বলা হয়ে থাকে। ঋগ্বেদে যে সমস্ত মুনিরা রয়েছেন তাদের মধ্যে নিপুণ হলেন হৈম মুনি, সামবেদের মুনিদের মধ্যে প্রধান হলেন জৈমিনি, এবং বৈশুসম্পায়ন একাই ছিলেন যজুঃবেদের নিপুণ মুনি। এবং অথর্ব বেদের মুনি দিগের মধ্যে সুমন্ত মুনি প্রধান। তিনি আবার অঙ্গিরসেরও জ্ঞাতা ছিলেন। এই সমস্ত বেদের ঋষিরা নিজ নিজ বেদকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেন। এই সমস্ত বেদের মুনিদের শিষ্য, প্রশিয্য এমনকি তাদেরও শিষ্যদের দ্বারা বেদের বহুশাখা উৎপন্ন হয়।

জীবজগতের অল্প বুদ্ধি সম্পন্ন পাঠকেরা যাতে বেদ অধ্যয়ন করার পর তার অর্থ অনুধাবন করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্য লাভ করার জন্যই দয়ালু ভগবান ব্যাসদেব বেদকে বিভক্ত করেন। স্ত্রী শুদ্ধ জাতি কিন্তু অধম, তাই ত স্ত্রী জাতিদের বেদ অধ্যয়ন করতে বা শ্রবণ করতে নেই। কিন্তু স্ত্রী জাতিদের বেদ শ্রবণ না করলে মঙ্গল হবে কি করে, তাই ত বেদব্যাস ভগবান কৃপাপূর্বক মহাভারত রচনা করেন স্ত্রীদের মঙ্গলের জন্য। হে ব্রাহ্মণরা এই রূপ ভাবে ভগবান ব্যাসদেব সর্ব সময় সর্বতোভাবে জীবনের কল্যাণ সাধন করার হেতু নিজেকে নিবৃত্ত রেখে তিনি সরস্বতী নদীর পবিত্র তটে নির্জনে বসে ভাবতে থাকলেন। ভগবান ব্যাসদেব চিরকাল ব্রহ্মচর্য পালন করে বেদ, গুরু, অগ্নি, যজ্ঞাদির পূজো করেছেন। এমনকি এই সমস্ত বিষয় সমূহের মধ্যে যে অনুশাসন রয়েছে তাও তিনি গ্রহণ করেছেন। মহাভারত রচনার দ্বারা বেদেরই অর্থ আসলে প্রকাশ পেয়েছে। ব্যাসদেবের দ্বারা লিখিত এই মহাভারতে স্ত্রী এবং শুদ্রের আসল ধর্মের কথা বলা হয়েছে। তার দেহে স্থিত যে জীব সে পরিপূর্ণ হলেও কিন্তু সে সম্পূর্ণ নয়। বেদের অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনার দ্বারা তেজস্বী হলেও নিজেকে কিন্তু অসম্পূর্ণের মতোই মনে হচ্ছে। হে পরমহংস ভক্তদের প্রিয় ভাগবতে ধর্মের বিশেষ রূপের কথা বলা হয় নি এই ধর্ম ভগবানের অতি প্রিয়। বেদব্যাস তখন নিজেকে অত্যন্ত হীন মনে করে অত্যন্তভাবে দুঃখিত হয়েছিলেন। ঠিক তখন মহর্ষি বেদব্যাসের আশ্রমে দেবর্ষি নারদের আগমন ঘটে। সঙ্গে সঙ্গে মহর্ষি বেদব্যাস দেবপুরীতে নারদকে অভ্যর্থনা করেন।

পঞ্চম অধ্যায়
নারদ এবং মহর্ষি বেদব্যাসের মধ্যে বিভিন্ন আলাপচারিতা
দেবর্ষি নারদ বেদব্যাসের আশ্রমে প্রবেশ করে মহর্ষি বেদব্যাসকে প্রশ্ন করলেন– হে পরাশর মুনি পুত্র মহাভাগ্যবান ব্যাস, তোমার শুদ্ধ আত্মা, পবিত্র শরীর ও মন প্রসন্ন তো? তুমি সমস্ত ধর্মসমূহ জ্ঞাত হয়েছ, আবার তুমিই পরিপূর্ণ সুবিস্তীর্ণ মহাভারতও রচনা করেছ। সবার কাছে যেটা সনাতন ধর্ম, তা তুমি বিচার করেছ। এত কিছু করার পর নিজেকে কেন তুমি অকৃতার্থ মনে করে দুঃখ পাচ্ছো? এর কারণ আমাকে বল।

দেবর্ষি নারদের প্রশ্নের উত্তরে মহর্ষি বেদব্যাস বললেন– হে দেবর্ষি, তুমি আমার সম্পর্কে যা যা বললে তা যথার্থই। কিন্তু আমার আত্মা কিছুতেই পরিতুষ্ট হতে পারছে না। আমার এই অসন্তুষ্টির কারণ যে কী তা আমি কিছুতেই অনুধাবন করে উঠতে পারছি না। হে দেবর্ষি নারদ তুমি তো ব্রহ্মার পুত্র এবং তাঁর সঙ্গে অসীম জ্ঞান সম্পন্ন। তাই তো আমার অপরিতুষ্টতার কারণ হিসেবে যে প্রশ্ন তা তোমার কাছে উত্থাপন করছি। হে মুনি নারদ তোমার কাছ থেকে গোপনীয় তথ্য লুকানো নেই। তুমি পুরাণ পুরুষ উপাসনা করেছো। তুমি তো সূর্য যেমন ভ্রমণ করে চলেছে সর্বদা, ঠিক তেমনই তুমিও ত্রিভুবন ভ্রমণ করে সব কিছু দেখেছ, সেই তুমি বায়ুর মতন সবার অন্তরে প্রবেশ করে সবার অন্তরের ভাবগুলিকে দেখতে পাও। আমি যোগ রূপ বলের দ্বারা পরমব্রহ্ম লাভ করেছি এবং অধ্যায়নাদির দ্বারা বেদ বিষয়ে আমি নিপুণতাও পর্যন্ত লাভ করেছি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার অন্তরভাগ কেন দুঃখে পরিপূর্ণ তার কারণ আমি বুঝতে পারছি না, তাই তার কারণ আমায় বল।

বেদব্যাসের প্রশ্নের উত্তরে মহর্ষি নারদ বললেন– তুমি তো ভগবানের নির্মল যশ বলোনি, আর সেই যশ প্রকাশ করা ব্যতীত ব্রহ্মজ্ঞানের যে ভগবান তিনি পরিতুষ্ট হন না। হে মুনি শ্রেষ্ঠ বেদব্যাস, তুমি সমস্ত ধর্মের বর্ণনা এমন কি পুরুষার্থও বর্ণনা করেছ। কিন্তু বাসুদেবের মহিমা বর্ণনা করোনি। যে সমস্ত গ্রন্থে রস, অলঙ্কার সমূহ উপস্থিত রয়েছে, কিন্তু সমস্ত জগতের দেবতা, সমস্ত জগতকে পবিত্রকারী হরি যশকীর্তন না করা হয়ে থাকে, তা কিন্তু কাকতীর্থ তুল্য অর্থাৎ কোন ফলই লাভ হয় না সেই গ্রন্থ থেকে। মানস নামক সরোবর হংসতুল্য ভাগবত কিন্তু পরমহংসরা তাতে রমণ করবেন না উদাহরণস্বরূপ এই বলা চলে। অপার শব্দাদি যুক্ত হলেও যে বাক্যের প্রতি শ্লোক সমূহে ভগবানের মহিমান্বিত নাম যশ কীর্তিত হয়, তা কিন্তু সাধুরা শ্রবণও করে থাকেন, এবং তার সাথে কীর্তনও করে থাকেন। যে সমস্ত বাক্যে ভগবানের যশ ও নাম কীর্তন মূলক শ্লোকসমূহ রয়েছে সেই সব বাক্যের উচ্চারণে সবার পাপ বিনাশ করে। মোক্ষ লব্ধ যে সাধক অবিদ্যারূপ নিবর্তক জ্ঞান সমূহ ও যদি অচ্যুত, ভাবোথিত হয় তবে কিন্তু তা তার মতন সাধকের শোভা পায় না। নিরন্তর যা দুঃখ দিয়ে যাচ্ছে সেই কাম্য ধর্ম অথবা নিষ্কাম কর্ম যদি ভগবানকে অর্পণ না করা হয়, তা হলে কী সেই সাধকের তা শোভা পায়। হে পরাশর পুত্র মহাভাগ্যবান বেদব্যাস, তুমি অব্যর্থ জ্ঞান লাভ করেছো, সুতরাং তুমি শ্রীকৃষ্ণের অদ্ভুত অপূর্ব লীলাবলী স্মরণ করে তার বর্ণনা কর।

এই বিশ্বজনীন জগতের ভগবান রূপ ভাগবত লীলা ব্যতীত অন্য বিষয়ে যদি তোমার লক্ষ্য হয় তাহলে সেই পৃথক দর্শন জনিত রূপ ও নামের দ্বারা তোমার মতি কিন্তু অস্থির হবে। বায়ুর দ্বারা তাড়িত নৌকার যেমন কোন স্থিরতা নেই, তেমনই তোমারও মন কখনও কোথাও স্থির হবে না। হে মহাভাগ্যবান ব্যাসদেব তুমি যে সমস্ত বিষয়ে আসক্ত, জনগণের কল্যাণের জন্য নিন্দিত কাম্য কর্মকে ধর্ম বলে উপদেশ করায় তোমার কিন্তু মহা অন্যায় হয়েছে। তোমার কথা মত সমস্ত অধর্ম রূপ কাম্য, কর্মকেই তারা মানে। সাধারণ মানুষ ধর্ম বলে স্থির করেছে। ফল স্বরূপ এখন তাদের নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা তা মানছে না। যে সমস্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি যারা নিয়তির দ্বারা পরমেশ্বর ভগবানের বিশ্বস্বরূপ আনন্দময় রূপ অনুভব করতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে যারা আপ্ততত্ত্বে অনভিজ্ঞ দেহাত্মবাদী মায়া দ্বারা এমন সত্ত্ব, রজ ইত্যাদি গুণের দ্বারা পরিচালিত সেই সমস্ত মানুষদের জন্য তুমি ভগবানের আনন্দময় লীলা বর্ণনা কর। অধর্মসমূহ পরিত্যাগ করে ধর্ম সঙ্গে হরির চরণরূপ কমল ভজনা করতে করতে অপরিপক্ক অবস্থায় যদি সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়, অথবা তার সাধন পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়, তাহলে কী তার মঙ্গল হবে না। ভাগবতের ভজনা করতে করতে কোন মানুষ যদি স্বধর্ম আচরণ করে, তা হলে তার কী লাভ বা ক্ষতি হবে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে যারা বিবেকীজন তারা ভাগবত রূপ যে ভক্তি সুখ, তার জন্য যত্ন করবে, আর এই আনন্দময় সুখ কিন্তু ওপরে অবস্থিত সত্যলোক থেকে নীচে নরক পর্যন্ত পাওয়া যাবে না। দুঃখ যেমন অনায়াসেই আসে ঠিক তেমনই কর্মফল রূপ যে সুখ তা সর্বতোভাবে পাওয়া যায়। হে মহাভাগ্যবান প্রিয় মুকুন্দসেবী যে সব মানুষ, তারা নিম্ন জাতিতে জন্ম নিলেও কর্মী সমস্ত জনের মত বিষয় সমূহে আকৃষ্ট চিত্ত হয়ে কখনই সংসারে আবিষ্ট হয় না।

এই বিশ্বচরাচর, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কিন্তু ভগবানের থেকে পৃথক কিছু নয়, সব একই। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, ভগবান জগৎ থেকে পৃথক। এই ভগবানের শক্তিতেই সৃষ্টি, স্থিতি, এবং লয় হয়ে থাকে। এ সমস্ত বিষয়ে তুমি ত অবজ্ঞাত, হে মহাভাগ্যবান অব্যর্থ দ্রষ্টা বেদব্যাস, তুমি স্বয়ং পরমাত্মা

পুরুষের অংশে জগতের কল্যাণের হেতু জন্মগ্রহণ করেছ। বিরাট রূপী পুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পরমাশ্চর্য লীলা অধিকরূপে কীর্তন করে। এই আশ্চর্য লীলা বর্ণনাকারী উত্তম শ্লোক সমূহ ভগবানের গুণবর্ধনকারী। মানুষের তপস্যা শাস্ত্র শ্রবণ, আর সেই সমস্ত লোকসমূহের শোভনসমূহের শোভনযোগ্য অধ্যয়ন করা হলে জ্ঞানদানের অক্ষয় ফল লাভ হয়।

আমি পূর্বকল্প পূর্ব জন্মে এক ব্রাহ্মণের দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলাম। বর্ষাকাল সমাগত হলে যে ব্রাহ্মণগৃহে আমি একত্র বাস করছিলাম, সেখানে সমস্ত গুণী জন সব মুনিদের সমাগম ঘটলে বাল্যকালে আমি সেই মুনিদের সেবার নিমিত্ত নিযুক্ত ছিলাম। সেই ব্রাহ্মণের গৃহে সমাগত সব মুনিরা ছিলেন সমদর্শী। কিন্তু সেই সময় আমি যে সব ক্রীড়া শান্তর আগমন ঘটায় তা পরিত্যাগ করে সেই মুনিদের আজ্ঞানুবর্তী হয়ে থাকি। সমাগত সেই সব সমদর্শী মুনিদের উচ্ছিষ্ট পাত্রের অবশিষ্ট অংশে একবার মাত্র ভোজন করতে পারতাম। যার দরুণ আমার সমস্ত পাপ বিদূরিত হয়ে যায়। এবং তাদের ধর্ম হরি ভক্তিতেই আমার রুচি উৎপাদিত হতে থাকে ক্রমশ।

সেই সব ব্রাহ্মণরা প্রতিদিন কৃষ্ণ কথা গান করতেন, আর আমি অনুগ্রহ হয়ে শ্রীকৃষ্ণের প্রতিটি কথা শ্রদ্ধা পূর্বক শুনতাম। ঐ ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে শ্রীকৃষ্ণ লীলা মূলক গানসমূহ শোনার ফলে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আমার রতি জন্ম হয়। হে পরাশর পুত্র মহামতি বেদব্যাস সেই মধুর কীর্তিশালী ভগবানে আমার অবিহচ্যতিতে মতি হয়েছিল। সেই মতি দ্বারা আমি দর্শন করলাম, এই পরিদৃশ্যমান পৃথিবী জগৎ সংসার, স এবং অসদরূপ যোগমায়ার দ্বারা কল্পিত হয়েছে। সেই রূপ আমাদের সূক্ষ্ম ও স্থূল শরীর নিজের অবিদ্যার দ্বারাই নিত্য মুক্তস্বরূপ তার আত্মাতে কল্পিত হচ্ছে। বর্ষাকাল শরৎকালের প্রতি সন্ধ্যায় মহাত্মাগণেরা যে হরির অমল যশমূলক গান সংকীর্তন করতেন, তা আমি শ্রবণ করতাম। এই রকমভাবে হরির অমল অদ্ভুত সব যশমূলক সংকীর্তন শ্রবণ করার হেতু আমার রজঃ ও তমগুণের বিনাশ সাধন ঘটে এবং শ্রী হরির প্রতি ভক্তির উদয় হয়েছিল। সেই শ্রীহরির যশকীর্তন শুনতে শুনতে আমি শ্রীভগবানের অত্যন্ত অনুরক্ত বিনীত, শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠি এবং সমস্ত পাপেরও বিনাশ সাধন আমার ঘটেছিল। তার সঙ্গে আমি অত্যন্ত সংযত এবং সেই মুনিদের অনুগত হয়েছিলাম সেই জন্য সেই মুনিরা প্রত্যাগমনের সময় অত্যন্ত প্রীতির সঙ্গে কৃপাপূর্বক আমাকে গোপন জ্ঞান উপদেশ করেন। যা আমি ভগবান ব্রহ্মাকে বলেছিলাম। মুনিদের দ্বারা সৃষ্ট সেই জ্ঞানের দ্বারা আমি সমস্ত জগতের মায়া প্রবর্তক ভগবান বাসুদেবের প্রভাব জেনেছিলাম। আর এরই দ্বারা কিন্তু ভক্ত ভগবান ধর্মে গমন করে থাকেন। হে ব্রাহ্মণ, সবকিছুর নিয়ামক এই ভগবান যে সমস্ত কর্ম সমর্পণ বা যার দ্বারা কর্মসমূহ সম্পন্ন করা হয়, তা আধিভৌতিক, আধিদৈবিক এবং আধ্যাত্মিক তাপত্রয় বিনাশক।

হে সুব্রত, যে দ্রব্যসমূহের দ্বারা বা ব্যবহারের হেতু প্রাণীদের দেহে রোগ জন্ম নেয়, সেই দ্রব্য দ্বারাই কিন্তু কখনও রোগের নিরাময় করা যায় না। কিন্তু দ্রব্যান্তরের দ্বারা মিশ্রিত হলে তা রোগ নিরাময়ের কারণ হয়। যে সমস্ত কর্ম সমূহ করলে মানুষের বন্ধনের উৎপত্তির কারণ হয়, অর্থাৎ সেসব কর্ম যদি পরমেশ্বরকে অর্পণ করা যায়, তাহলে কিন্তু তা তাদের মোক্ষের কারণ হয়ে থাকে। ভগবানকে প্রীতি দেওয়ার জন্য যে কর্মসমূহ করা হয় তা ভক্তিযোগে নিষ্কাম কর্মযোগে জ্ঞান দান করে থাকে যা ভক্তিযুক্ত ভগবানের শিক্ষা অনুসারে বারংবার কোন কাম ছাড়া কর্ম করতে করতে শ্রীকৃষ্ণের গুণ স্মরণ হয়ে থাকে। যদি কোন মানুষ পূজা করার সময় তুমি ভগবান বাসুদেব, তোমাকে প্রণাম করি এই ভাবে যিনি মন্ত্রে নির্দিষ্ট মূর্তির নাম উল্লেখ করে যজ্ঞ করে থাকেন তিনি অবশ্যই ব্ৰহ্মতত্ত্ব দর্শন করেন। তার দেওয়া নিজের সেই উপদেশ আমি পালন করছি। সেই ভগবান বাসুদেব আমাকে জ্ঞান, ঐশ্বর্য এবং প্রেম দান করেছেন। তুমি মহাভাগ্যবান যে পরাশর পুত্র ও যশস্বী, তুমি ভগবানের বিশ্ব রূপ যশ বর্ণনা করো।

এই যশকীর্তিমূলক গ্রন্থ পাঠ করলে জ্ঞানী গণেরও জানার ইচ্ছার নিবৃত্তি হবে, নিরন্তর দুঃখের দ্বারা সৃষ্ট জনগণের লেশ নিবারণের আর অন্য কোনো উপায় নেই এই জগতে বলে বিবেকীগণ মনে করে থাকেন।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post