অশ্বত্থামা দ্রৌপদী পুত্রদের বিনাশ এবং অর্জুনের জন্য প্রদান
শৌনক বললেন– হে সূত, নারদ বনে গেলে ভগবান তার অভিপ্রায় জেনে কি করেছিলেন?
সূত বললেন– ব্রহ্মনদী সরস্বতীর পশ্চিম তীরে শ্যামাপ্রস নামে একটি আশ্রম আছে। সেখানে ব্যাসদেব উপস্থিত হলেন। জলস্পর্শ করে সমাধির দ্বারা মন স্থির হল। ভগবান এবং তাঁর মায়াকে দেখলেন। এই মায়ার দ্বারা সম্মোহিত হয়ে জীব গুণাতীত হয়েও ত্রিগুণাত্ম মনে করে ভগবানে, ভক্তিযোগেই সাক্ষাৎ অনর্থপশম– এটা দেখে অজ্ঞ লোকের হিতের জন্য তিনি শ্রীমদ ভাগবত প্রস্তুত করলেন।
শৌণক বললেন– হে সূত। শুকদেব সংসারের প্রতি নিস্পৃহ ছিলেন। কোনো বস্তুর প্রতি তার বিন্দুমাত্র আসক্তি ছিল না। তিনি আত্মারাম হয়েও এই বৃহৎ সংহিতা কী ভাবে অভ্যাস করলেন।
সূত জবাব দিলেন– আত্মারাম বন্ধনরহিত মুনিরাও অহেতুক ভক্তি করে থাকেন। হরি এইজাতীয় গুণবিশিষ্ট, হরির গুণে ভগবান শুকদেব মহৎ ভাগবত অধ্যয়ন করেছিলেন। হে শৌণক, এবার আমি রাজর্ষি জন্ম, কর্ম, মুক্তি এবং মহাপ্রস্থানের কথা বলব। এইভাবে কৃষ্ণ-কথার উদয় হবে।
কুরু-পাণ্ডবের ভয়ংকর যুদ্ধের অবসান ঘটে গেল। নিহত বীররা স্বর্গে গমন করলেন। ভীমের গদার আঘাতে দুর্যোধনের উরু’ভঙ্গ হল। দুর্যোধনের প্রিয় কার্য হয় মনে করে দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা নিদ্রিত দ্রৌপদীর শিশু পুত্রদের শিরচ্ছেদ করে দুর্যোধনকে উপহার দিলেন। এই নিন্দিত কর্মে সকলেই নিন্দা করে থাকেন। মাতা দ্রৌপদী শিশুদের নিকট বার্তা শুনে অশ্রু পরিপূর্ণ লোচনে কাঁদছিলেন। অর্জুন তাকে সান্তনা দিয়ে বললেন–হে ভদ্রে, যখন আততায়ী ব্রাহ্মণ্যধর্ম অশ্বত্থামার মস্তক গাণ্ডীব থেকে নিক্ষিপ্ত তীরের দ্বারা তোমাকে উপহার দেব তখন তোমার মনে আনন্দের উদ্রেক হবে। এই মিষ্ট বাক্যে দ্রৌপদীকে সান্ত্বনা দিয়ে অর্জুন গুরু পুত্র অশ্বত্থামার পেছনে ধাবিত হলেন। অশ্বত্থামা অর্জুনকে দূর থেকে আসতে দেখে রথে করে পালাতে লাগলেন।
যখন অশ্বত্থামা নিজেকে নিরাশ্রয় এবং অশ্বরা ক্লান্ত হয়েছে বুঝতে পারলেন তখন ব্রহ্মাস্ত্রকেই প্রাণরক্ষার উপায় বলে মনে করেন। সেই অস্ত্র থেকে প্রচণ্ড তেজ আবির্ভূত হল। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বললেন– হে কৃষ্ণ, ভক্তদের অভয়পদ মহাবাহ, তুমি একমাত্র মুক্তি দাতা তুমি প্রকৃতির অতীত পুরুষ, তুমি কারণ, তুমি সাক্ষাৎ ঈশ্বর, তুমি নিজ প্রভাবে মায়ার দ্বারা বিমোহিত চিত্ত জীবগণের ধর্মাদিরূপ মঙ্গল বিধান করো। এই তোমার অবতার রূপ পৃথিবীর ভার অপনোদনের জন্য। এটা কী বা কোথা থেকে আসছে তা আমি বুঝতে পারছি না। এই তেজ সবদিক থেকে ধেয়ে আসছে।
শ্রী ভগবান বললেন–হে অর্জুন, এটা ব্রহ্মাস্ত্র। প্রাণ সংকট উপস্থিত হয়েছে বলে অশ্বত্থামা এটা প্রয়োগ করেছে। কিন্তু এই অস্ত্রের উপসংহার কৌশল সে জানে না। এই অস্ত্রের প্রতিস্পর্ধী অপর কোনো অস্ত্র নেই। তুমি অস্ত্রবিদ্যায় অভিজ্ঞ, নিজের প্রযুক্ত ব্রহ্মাস্ত্র তেজের দ্বারা এই অস্ত্রের তেজ বিনাশ করো।
শত্রু নিহন্তা অৰ্জুন ভগবানের কথা শুনলেন। তিনি কৃষ্ণকে পরিক্রমা করে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করলেন। দুটি অস্ত্রের তেজ পরস্পরকে আক্রমণ করল। দ্যুলোক, ভূর্লোক, অন্তরীক্ষে তা ছড়িয়ে পড়ল। মনে হল প্রলয়কালে উপস্থিত হয়েছে। সূর্য এবং অগ্নি যেন আকাশে বর্ধিত হচ্ছে।
অর্জুন গৌতমীপুত্ৰ অশ্বত্থামাকে ধরে রঞ্জুর দ্বারা পশুর মতো বন্ধন করে শত্রুকে শিবিরে নিয়ে যাচ্ছেন, তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন–হে পার্থ, একে রক্ষা করা উচিত নয়। এই হত্যাকারীদের বধ করো। যে রাত্রিবেলায় গুপ্তভাবে নিরপরাধ বালকদের বধ করেছে, সে যে নির্দয় খলব্যক্তি। পরপ্রাণের দ্বারা নিজের প্রাণ পরিপুষ্ট করে তাকে বধ করা মঙ্গলজনক এটাই তার প্রায়শ্চিত্ত, না হলে তাকে নরকে গমন করতে হবে। দ্রৌপদীর কাছে তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে যে তোমার পুত্রহন্তারককে ছিন্ন মস্তক তাকে উপহার দেবে। এই আততায়ী আত্মীয় বন্ধুগণের পাপ স্বরূপ। এ কুলাঙ্গার শুধু তোমাদের নয়, নিজ প্রভু দুর্যোধনেরও অপ্রিয় আচরণ করেছে।
কৃষ্ণের দ্বারা উৎসাহিত হয়েও অর্জুন কিন্তু পুত্রহস্তা গুরুপুত্রকে বধ করতে চাইলেন না। তারপর দ্রৌপদীর কাছে অশ্বত্থামাকে সমর্পণ করলেন। পাঞ্চালী রজ্জবদ্ধ পশুর মতো আনীত গুরুপুত্রকে দেখে কৃপা পূর্বক প্রণাম করলেন। তারপর বললেন– হে ব্রাহ্মণ পূজণীয়, একে ছেড়ে দাও, তুমি যার অনুগ্রহে বিভিন্ন অস্ত্রের উপসংহার শিখেছো, সেই ভগবান দ্রোণাচার্য পুত্ররূপে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁর পত্নী কৃপীও আছেন। বীর প্রসবিণীর জন্য পতি সহমরণ করেননি। হে ধর্মজ্ঞ, তুমি গুরুর বংশকে দুঃখিত করো না। মৃতবৎসা আমি যেমন অশ্রু মুখে রোদন করছি, পতিব্রতা এ জননী, গৌতমী যাতে ক্রন্দন না করেন, সেই ব্যবস্থা করো।
ধর্মপুত্র রাজা যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীর যুক্তি পক্ষপাত শূন্য বাক্যের অনুমোদন করলেন। নকুল, সহদেব, সাত্যকি, অর্জুন, দেবকীপুত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং তথায় উপস্থিত অসংখ্য পুরুষ ও রমণীরাও এই বাক্যের অনুমোদন করলেন। ভীম এই বাক্যের বিরুদ্ধে গিয়ে বললেন– যে ব্যক্তি প্রভুর স্বার্থ দেখে না, সে যে শিশুদের বিনাশ করেছে, তাঁর বধই উত্তম। ভীম এবং দ্রৌপদীর কথা শুনে সখা অর্জুনের মুখের দিকে চেয়ে শ্রীকৃষ্ণ বললেন– হে অর্জুন ব্রাহ্মণ অধম হলেও বধের যোগ্য নয়, আততায়ী বধের যোগ্য। আমি এই দুজনকেই বলেছি, আমার এই উপায় অনুশাসন তুমি পালন করো। দ্রৌপদীকে সান্ত্বনা দিতে তুমি যে প্রতিজ্ঞা করেছিলে, তা যেন সত্যে পরিণত হয়। ভীমসেন, দ্রৌপদী এবং আমার যাতে ভীতি সঞ্চরন ঘটে তার ব্যবস্থা করো।
সূত বললেন– অর্জুন হঠাৎ শ্রীকৃষ্ণের অভিপ্রায় বুঝতে পারলেন। তিনি অশ্বত্থামার কেশের সঙ্গে যুক্ত শিরভুষণ মণি অসির দ্বারা ছেদন করলেন। শিশু হত্যার জন্য অশ্বত্থামা তখন বিষণ্ণ। এখন মণিহীন হওয়ায় নিস্তেজ অশ্বত্থামাকে আরো ভয় পাবার কোনো কারণ থাকলো না। তাকে রঞ্জুর বন্ধন মুক্ত করে শিবির থেকে বাইরে বের করে দেওয়া হল। মস্তক মুন্ডন, ধনু গ্রহণ, এবং বাসস্থান থেকে নির্বাসন– এই তিনটি হল ব্রাহ্মণদের কাছে বধতুল্য। এছাড়া তাদের কোন দন্ড নেই।
শোকাকুল পাণ্ডবরা মৃত জ্ঞাতিদের জন্য পরলৌকিক কার্য সম্পাদন করলেন।