প্রথম স্কন্দ - নবম অধ্যায়

ভীষ্মের কাছে যুধিষ্ঠির এবং অন্যান্যদের গমন, বিবিধ ধর্মের উপদেশ, শ্রীকৃষ্ণের স্তব করতে করতে ভীষ্মের মহানির্বাণ

সূত বললেন– প্রাণী হত্যার ভয়ে ভীত যুধিষ্ঠির ভীষ্মের শরশয্যার অঞ্চলে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তখন অন্যান্য ভ্রাতারা তাকে অনুসরণ করলেন। ব্যাসদেব ধৌম্য প্রভৃতি ব্রাহ্মণেরা অশ্বযুক্ত স্বর্ণভূষিত রথে অনুগমন করলেন। ভগবান অর্জুনের সাথে রথে চড়ে বসলেন। রাজা যুধিষ্ঠির তাদের পরিবেষ্টিত হয়ে কুবেরের মতো শোভিত হলেন। স্বর্গভ্রষ্ট দেবতার মতো ভূমিতে পতিত ভীষ্মকে দেখে তারা সকলে প্রণাম করলেন। মহর্ষি, দেবর্ষি রাজর্ষিরা ভরত বংশ প্রধান ভীষ্মকে দেখার জন্য সেখানে সমাগত হলেন। এলেন পর্বত, নারদ, ধৌম্য, ভগবান ব্যাসদেব, বৃহস্মন ভরদ্বাজ এবং সশিব্য পরশুরাম, এলেন বশিষ্ঠ, ইন্দ্র, প্রমদ, ক্রীত, গৃৎসবাদ, অসিত, কাক্ষীবান, গৌতম, অত্রি, ঐবিশ্বামিত্র এবং সুদর্শন। এলেন কাশ্যপ, বৃহস্পতি প্রভৃতি ঋষিগণ।

বসুশ্রেষ্ঠ ভীষ্মদেব সকলকে দেখে সম্মান করলেন। শ্রীকৃষ্ণকেও ভীষ্মদেব পূজো করলেন, বিনয় এবং অনুরাগে পরিপূর্ণ পাণ্ডবেরা তার কাছে বসেছিলেন। ভীষ্মদেব স্নেহাশ্রুতে আকুল নয়নে বললেন–হে ধর্মনন্দনগণ, তোমরা কষ্ট করে জীবিত থাকার যোগ্য নও। ব্রাহ্মণধর্ম এবং অচ্যুতের আশ্রয়ে থেকেও যে ক্লেশে তোমাদের কালাতিবাহিত করতে হল এটি খুবই কষ্টের বিষয়। বীর পাণ্ডুর মৃত্যুর পর কুন্তী বধু ছিলেন এবং তোমরাও ছিলে বালক, তোমাদের জন্য তিনি অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করেছেন বারবার। মেঘসকল, যেমন বাসুর অধীন, তেমনই লোকপালদের সাথে সমস্ত লোকই কালের অধীন। ধর্মপুত্ররাজ যুধিষ্টির, গদাধারী ভীম, ধনুন্বীর অর্জুন, গাণ্ডীব যার ধনু, যাদের বন্ধু স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ সেখানেও বিপদ উপস্থিত হয়েছে। এই কৃষ্ণের অভিপ্রায় কী তা কি আমরা জানতে পারি। হে ভরতশ্রেষ্ঠ, হে নাথ, হে প্রভু এই সব দুঃখ দৈবের অধীন। এই দেহ সেই কৃষ্ণ। তাঁর অনুবর্তী অনাথ প্রজাদের পালন করে।

এই যে কৃষ্ণকে দেখছ, ইনি স্বয়ং ভগবান আদি পুরুষ মহশ্রেষ্ঠ নারায়ণ, ইনি মায়ার দ্বারা লোককে বিমোহিত করেন। ইনি যদুবংশে বিচরণ করছেন। হে নৃপ, এই কৃষ্ণের গোষ্ঠনীয় প্রভাব ভগবান শিব দেবর্ষি নারদ সাক্ষাৎ ভগবান কপিল জানেন। যাঁকে তোমরা তোমাদের নতুন পুত্র আন্তরিক বন্ধু বলে মনে করছ তাকে তোমরা প্রীতিবশত মন্ত্রী, দূত আর রথের সারথি করেছ। হে মহারাজ, একান্ত ভক্তের প্রতি তার অনুকল্প দেখো। সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ মরণকালে নিজে এসেই উপস্থিত হয়েছেন। যতক্ষণ আমি এই দেহ ত্যাগ না করছি, ততক্ষণ চতুর্বাহু আমার ধ্যান পথের পথিক ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমার সম্মুখে অপেক্ষা করবেন।

সূত বললেন– যুধিষ্ঠির তা শুনে মুনিদের সমক্ষে শর শয্যায় শায়িত ভীষ্মকে ধর্মের কথা জিজ্ঞাসা করলেন –মানুষ মাত্র স্বভাবজনিত যে ধর্ম, বর্ণ এবং আশ্রম বিহিত যে ধর্ম সংসারে বিরহ এবং অনুরঞ্জনের বিদগ্ধ, নিবৃত্তি এ প্রবৃত্তি ধর্ম বদ্যধর্ম, দানধর্ম, মোক্ষধর্ম সংক্ষেপে এবং বিস্তার পূর্বক বললেন। ভীষ্মদেব নানা আখ্যানে ইতিহাসে বর্ণিত ধর্ম, কাম, মোক্ষ এবং তাদের প্রাপ্তির উপায়গুলি সংক্ষেপে আলোচনা করলেন। ধর্মের কথা বলতে বলতে ইচ্ছামৃত্যু যোগী ভীষ্মের বাঞ্ছিত উত্তরায়ণ কাল উপস্থিত হল। যুদ্ধে যিনি সহস্র রথীদের রক্ষা করতেন, সেই ভীষ্ম কথা বলা বন্ধ করলেন। শূন্য পীতবসন পরিহিত আদিপুরুষ চতুর্ভুজ শ্রীকৃষ্ণের আসক্তি শূন্য মন নিযুক্ত করলেন। তাঁর অশুভগুলি বিনষ্ট হল ভগবানের কৃপা অবলোকনে। অস্ত্রাষ্টতের শতনা চলে গেলে ইন্দ্রিয়ের চাঞ্চল্য দূরীভূত হল। তিনি শ্রীকৃষ্ণের স্তব করতে লাগলেন। যার প্রকৃতি থেকে সৃষ্টি প্রবাহ হয় এবং যিনি লীলা খেলার জন্য কখনও নিজ প্রকৃতিকে স্বীকার করে থাকেন, সেই কৃষ্ণকে প্রণাম করি। ত্রিভুবনের মধ্যে কমনণীয় তমালের মতো কৃষ্ণবর্ণ সূর্যকিরণের মতো উজ্জ্বল বসন পরিহিত কেশদামে আবৃত নয়নকমল যার বিগ্রহ সেই অর্জুনের প্রিয়সখা শ্রীকৃষ্ণে আমার নির্মল মতি হোক।

আমার শরের দ্বারা যার দেহ ক্ষত বিক্ষত হয়ে গাত্রাবরণ ছিন্ন বিছিন্ন হয়েছিল যুদ্ধ ক্ষেত্রে অশ্বখুরস্থিত ধুলির দ্বারা ধূসরবর্ণ এবং বিক্ষিপ্ত তেজ সমুহের সাথে সংলগ্ন কর্মে সুশোভিত আসন বিশিষ্ট শ্রীকৃষ্ণে আমার মন যুক্ত হোক।

অর্জুনের কথা শুনে তৎক্ষণাৎ কুরু এবং পাণ্ডব রথ স্থাপন করে বললেন, যিনি কাল দৃষ্টির দ্বারা বিপক্ষ সৈন্যদের আয়ু হরণ করেছিলেন সেই অর্জুনসখা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আমার ব্রতী হোক, দূরস্থিত বিপক্ষ সৈন্যের প্রধানদের দোষ ও বুদ্ধিতে স্বজন বধ থেকে নিবৃত্ত অর্জুনের অজ্ঞানতা যিনি আত্মবিদ্যায় দূরীভূত করেছিলেন, সেই সর্বোত্তম কৃষ্ণের প্রতি আমার মন স্থাপিত হোক। যিনি নিজের প্রতিষ্ঠা বিসর্জন দিয়ে আমার প্রতিজ্ঞা সত্যে পরিণত করার জন্য রথ থেকে নেমে এসে রথচক্র ধারণ করেছিলেন, তার প্রতি আমার সমস্ত শ্রদ্ধা আপ্লুত হোক। যিনি স্বলিত উত্তরীয় হয়ে আমার দিকে ছুটে এসেছিলেন এবং আততায়ী আমার তীক্ষ্ম বাণের দ্বারা বিধ্বস্ত কবচ রক্ষাপুত আমাকে বধের জন্য বলপূর্বক আমার দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। সেই ভগবান মুকুন্দ আমার গতি হোক। এই যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিগণ যাকে দেখে মুক্তিলাভ করেছিলেন, অর্জুনের রথকে যিনি কুটুম্বের মতো রক্ষা করে জল হাতে অশ্বতাড়নের জন্য চাবুক এবং ডানহাতে অশ্বের রজ্জ্ব ধারণ করে শোওমান হলে সেই ভগবানের। প্রতি আমার মতি হোক।

যাঁর সুন্দর গমন, মধুর হাবভাব, মৃদুমন্দ হাসি এবং প্রণয়পূর্বক অবলোকনের দ্বারা সম্মানিত গোপনাঙ্গ প্রেমে উন্মত্ত হয়ে গোবর্ধন ধারণাদি কর্মের অনুকরণ করে কৃষ্ণের স্বরূপ লাভ করেছিলেন, সেই কৃষ্ণে আমার গতি হোক।

যিনি নিজ কল্পিত প্রাণীদের প্রতি হৃদয়ের অন্তর্যামী রূপে অধিষ্ঠিত, এক সূর্য যেমন প্রত্যেকের চক্ষুতে বহু বলে মনে হয়, এক অদ্বিতীয় এই আমার সামনে উপস্থিত সেই কৃষ্ণকে আমি লাভ করেছি।

সূত বললেন– ভীষ্ম মন, বাক্য এবং চক্ষু ক্রিয়ার দ্বারা ভগবান পরমাত্মা কৃষ্ণর সন্নিবিষ্ট হয়ে অন্তরের প্রাণের বায়ু বিলীন করে নিবৃত্ত হলেন। তার প্রাণবায়ু বহির্গত না হয়ে অন্তর আত্মা শ্রীকৃষ্ণে লীন হয়ে গেল।

দিবাবসানে পক্ষীগণের মতো সকলে নীরব হলেন। দেবতা এবং মানবের দ্বারা বাদিত হয়ে দুন্দুভি বেজে উঠল। রাজাদের মধ্যে যাঁরা অসূয়া শূন্য সাধু। তারা ভীষ্মের প্রশংসা করলেন। আকাশ থেকে পুষ্প বৃষ্টি হতে থাকলো। হে শৌণক, মোক্ষ প্রাপ্ত হলেও ভীষ্মের দেহাদি সংস্কার করায় যুধিষ্ঠির ক্ষণকাল দুঃখিত হলেন। মুনিরা আনন্দিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণকে গোপনীয় নামের দ্বারা স্তব করতে থাকলেন। তারপর নিজ নিজ আশ্রমে ফিরে গেলেন। কৃষ্ণের সাথে যুধিষ্ঠির হস্তিনাপুরে গিয়ে ধৃতরাষ্ট্র এবং তপস্বিনী গান্ধারীকে সান্ত্বনা দিলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতি ক্রমে এবং কৃষ্ণের অনুমোদন প্রাপ্ত হয়ে পিতৃ পিতামহের রাজ্য ধর্মানুসারে শাসন করতে থাকলেন।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post