চতুর্থ অধ্যায়-জ্ঞান যোগ

 

শ্লোক:1:
শ্রীভগবানুবাচ
ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্ ।
বিবস্বান্মনবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেহব্রবীৎ ।।১।।
ইমম্বিবস্বতেযোগম্প্রোক্তবান্অহম্অব্যয়ম্,
বিবস্বান্মনবেপ্রাহমনুঃইক্ষ্বাকবেঅব্রবীৎ ।।১।।
অর্থ:- পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন- আমি পূর্বে সূর্যদেব বিবশ্বানকে এই অব্যয় নিষ্কাম কর্মসাধ্য জ্ঞানযোগ বলেছিলাম। সূর্য তা মানবজাতির জনক মনুকে বলেছিলেন এবং মনু তা ইক্ষ্বাকুকে বলেছিলেন।
 
শ্লোক:2:
এবং পরম্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ ।
স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ ।।২।।
 এবম্পরম্পরা-প্রাপ্তম্ইমম্রাজর্ষয়ঃবিদুঃ,
সঃকালেনইহমহতাযোগঃনষ্টঃপরন্তপ ।।২।।
অর্থ:- এভাবেই পরম্পরা মাধ্যমে প্র্রাপ্ত এই পরম বিজ্ঞান রাজর্ষিরা লাভ করেছিলেন৷ কিন্তু কালের প্রভাবে পরম্পরা ছিন্ন হয়েছিল এবং তাই সেই যোগ নষ্টপ্রায় হয়েছে।
 
শ্লোক:3:
স এবায়ং ময়া তেহদ্য যোগঃ প্রোক্তঃ পুরাতনঃ ।
ভক্তোহসি মে সখা চেতি রহস্যং হ্যেতদুত্তমম্ ।।৩।।
 সঃএবঅয়ম্ময়াতেঅদ্যযোগঃপ্রোক্তঃপুরাতনঃ,
ভক্তঃঅসিমেসখাইতিরহস্যম্হিএতৎউত্তমম্ ।।৩।।
অর্থ:- সেই সনাতন যোগ আজ আমি তোমাকে বললামকারণ তুমি আমার ভক্ত ও সখা এবং তাই তুমি এই বিজ্ঞানের অতি গুঢ় রহস্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে।
 
শ্লোক:4:
অর্জুন উবাচ
অপরং ভবতো জন্ম পরং জন্ম বিবস্বতঃ ।
কথমেতদ্ বিজানীয়াং ত্বমাদৌ প্রোক্তবানিতি ।।৪।।
অপরম্ভবতঃজন্মপরম্জন্মবিবস্বতঃ,
কথম্এতৎবিজানীয়াম্ত্বম্আদৌপ্রোক্তবান্ইতি ।।৪।।
অর্থ:- অর্জুন বললেন- সূর্যদেব বিবশ্বানের জন্ম হয়েছিল তোমার অনেক পূর্বে। তুমি যে পুরাকালে তাঁকে এই জ্ঞান উপদেশ করেছিলেতা আমি কেমন করে বুঝব ?
 
শ্লোক:5:
ভগবান উবাচ
বহূনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন ।
তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ ।।৫।।
 বহূনিমেব্যতীতানিজন্মানিতবঅর্জুন,
তানিঅহম্বেদসর্বাণিত্বম্বেত্থপরন্তপ ।।৫।।
অর্থ:- পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে পরন্তপ অর্জুন ! আমার ও তোমার বহু জন্ম অতীত হয়েছে ৷ আমি সেই সমস্ত জন্মের কথা স্মরণ করতে পারিকিন্তু তুমি পার না।
 
শ্লোক:6:
অজোহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোহপি সন্ ।
প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া ।।৬।।
 অজঃঅপিসন্অব্যয়াত্মাভূতানাম্ঈশ্বরঃঅপিসন্,
প্রকৃতিম্স্বাম্অধিষ্ঠায়সম্ভবামিআত্মমায়য়া ।।৬।।
অর্থ:- যদিও আমি জন্মরহিত এবং আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় এবং যদিও আমি সর্বভূতের ঈশ্বরতবুও আমার অন্তরঙ্গা শক্তিকে আশ্রয় করে আমি আমার আদি চিন্ময় রূপে যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।
 
শ্লোক:7:
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত ।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ ।।৭।।
যদাযদাহিধর্মস্যগ্লানিঃভবতিভারত,
অভ্যুত্থানম্অধর্মস্যতদাআত্মানম্সৃজামিঅহম্ ।।৭।।  
অর্থ:- হে ভারত ! যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যূত্থান হয়তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই।
 
শ্লোক:8:
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।৮।।
পরিত্রাণায়সাধূনাম্বিনাশায়দুষ্কৃতাম্,
ধর্ম-সংস্থাপনার্থায়সম্ভবামিযুগেযুগে।।৮।।
অর্থ:- সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।
 
শ্লোক:9:
জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ ।
ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন ।।৯।।
জন্মকর্মমেদিব্যমএবম্যঃবেত্তিতত্ত্বতঃ,
ত্যক্ত্বাদেহম্পুনঃজন্মএতিমাম্এতিসঃঅর্জুন ।।৯।।
অর্থ:- হে অর্জুন ! যিনি আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম ও কর্ম যথাযথভাবে জানেনতাঁকে আর দেহত্যাগ করার পর পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয় নাতিনি আমার নিত্য ধাম লাভ করেন।
 
শ্লোক:10:
বীতরাগভয়ক্রোধা মন্ময়া মামুপাশ্রিতাঃ ।
বহবো জ্ঞানতপসা পূতা মদ্ভাবমাগতাঃ ।।১০।।
বীত-রাগ-ভয়-ক্রোধাঃমৎ-ময়াঃমাম্উপাশ্রিতাঃ,
বহবঃজ্ঞান-তপসাপূতাঃমদ্-ভাবম্আগতাঃ ।।১০।।
অর্থ:- আসক্তিভয় ও ক্রোধ থেকে মুক্ত হয়েসম্পূর্ণরূপে আমাতে মগ্ন হয়েএকান্তভাবে আমার আশ্রিত হয়েপূর্বে বহু বহু ব্যক্তি আমার জ্ঞান লাভ করে পবিত্র হয়েছে- এবং এভাবেই সকলেই আমার অপ্র্রাকৃত প্রীতি লাভ করেছে।
 
শ্লোক:11:
যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্।
মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।১১।।
যেযথামাম্প্রপদ্যন্তেতান্তথাএবভজামিঅহম্,
মমবর্ত্মঅনুবর্তন্তেমনুষ্যাঃপার্থসর্বশঃ।।১১।।
অর্থ:- যারা যেভাবে আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করেআমি তাদেরকে সেভাবেই পুরস্কৃত করি। হে পার্থ ! সকলেই সর্বতোভাবে আমার পথ অনুসরণ করে।
 
শ্লোক:12:
কাঙ্ক্ষন্তঃ কর্মণাং সিদ্ধিং যজন্ত ইহ দেবতাঃ ।
ক্ষিপ্রং হি মানুষে লোকে সিদ্ধির্ভবতি কর্মজা ।।১২।।
কাঙ্ক্ষন্তঃকর্মণাম্সিদ্ধিম্যজন্তেইহদেবতাঃ,
ক্ষিপ্রম্হিমানুষেলোকেসিদ্ধিঃভবতিকর্মজা ।।১২।।
অর্থ:- এই জগতে মানুষেরা সকাম কর্মের সিদ্ধি কামনা করে এবং তাই তারা বিভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনা করে। সকাম কর্মের ফল অবশ্যই অতি শীঘ্রই লাভ হয়।
 
শ্লোক:13:
চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ ।
তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্ ।।১৩।।
 চাতুর্বর্ণ্যম্ময়াসৃষ্টম্গুণ-কর্ম-বিভাগশঃ,
তস্যকর্তারম্অপিমাম্বিদ্ধিঅকর্তারম্অব্যয়ম্ ।।১৩।।
অর্থ:- প্রকৃতির তিনটি গুণ ও কর্ম অনুসারে আমি মানব-সমাজে চারটি বর্ণবিভাগ সৃষ্টি করেছি । আমি এই প্রথার স্রষ্টা হলেও আমাকে অকর্তা এবং অব্যয় বলে জানবে।
 
শ্লোক:14:
ন মাং কর্মাণি লিম্পন্তি ন মে কর্মফলে স্পৃহা ।
ইতি মাং যোহভিজানাতি কর্মভির্ন স বধ্যতে ।।১৪।।
মাম্কর্মাণিলিম্পন্তিমেকর্মফলেস্পৃহা,
ইতিমাম্যঃঅভিজানাতিকর্মভিঃসঃবধ্যতে ।।১৪।।
অর্থ:- কোন কর্মই আমাকে প্রভাবিত করতে পারে না এবং আমিও কোন কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা করি না। আমার এই তত্ত্ব যিনি জানেনতিনিও কখনও সকাম কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হন না।
 
শ্লোক:15:
এবং জ্ঞাত্বা কৃতং কর্ম পূর্বৈরপি মুমুক্ষুভিঃ ।
কুরু কর্মৈব তস্মাত্বং পূর্বৈঃ পূর্বতরং কৃতম্ ।।১৫।।
এবম্জ্ঞাত্বাকৃতম্কর্মপূর্বৈঃঅপিমুমুক্ষুভিঃ,
কুরুকর্মএবতস্মাৎত্বম্পূর্বৈঃপূর্বতরম্কৃতম্ ।।১৫।। 
অর্থ:- প্রাচীনকালে সমস্ত মুক্ত পুরুষেরা আমার অপ্রাকৃত তত্ত্ব অবগত হয়ে কর্ম করেছেন। অতএব তুমিও সেই প্রাচীন মহাজনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তোমার কর্তব্য সম্পাদন কর।
 
শ্লোক:16:
কিং কর্ম কিমকর্মেতি কবয়োহপ্যত্র মোহিতাঃ ।
তত্তে কর্ম প্রবক্ষ্যামি যজ্ জ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসেহশুভাৎ ।।১৬।।
 কিম্কর্মকিমঅকর্মইতিকবয়ঃঅপিঅত্রমোহিতাঃ,
তৎতেকর্মপ্রবক্ষ্যামিযৎজ্ঞাত্বামোক্ষ্যসেঅশুভাৎ ।।১৬।।
অর্থ:- কাকে কর্ম ও কাকে অকর্ম বলেতা স্থির করতে বিবেকী ব্যক্তিরাও মোহিত হন। আমি সেই কর্ম বিষয়ে তোমাকে উপদেশ করব। তুমি তা অবগত হয়ে সমস্ত অশুভ অবস্থা থেকে মুক্ত হবে।
 
শ্লোক:17:
কর্মণো হ্যপি বোদ্ধব্যং বোদ্ধব্যং চ বিকর্মণঃ ।
অকর্মণশ্চ বোদ্ধব্যং গহনা কর্মণো গতিঃ ।।১৭।।
 কর্মণঃহিঅপিবোদ্ধব্যম্বোদ্ধব্যম্বিকর্মণঃ,
অকর্মণঃবোদ্ধব্যম্গহনাকর্মণঃগতিঃ ।।১৭।।
অর্থ:- কর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন। তাই কর্মবিকর্ম ও অকর্ম সম্বন্ধে যথাযথভাবে জানা কর্তব্য।
 
শ্লোক:18:
কর্মণ্যকর্ম যঃ পশ্যেদকর্মণি চ কর্ম যঃ ।
স বুদ্ধিমান্মনুষ্যেষু স যুক্তঃ কৃৎস্নকর্মকৃৎ ।।১৮।।
 কর্মণিঅকর্মযঃপশ্যেৎঅকর্মণিকর্মযঃ,
সঃবুদ্ধিমান্মনুষ্যেষুসঃযুক্তঃকৃৎস্নকর্মকৃৎ ।।১৮।।
অর্থ:- যিনি কর্মে অকর্ম দর্শন করেন এবং অকর্মে কর্ম দর্শন করেনতিনিই মানুষের মধ্যে বুদ্ধিমান। সব রকম কর্মে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত।
 
শ্লোক:19:
যস্য সর্বে সমারম্ভাঃ কামসংকল্পবর্জিতাঃ ।
জ্ঞানাগ্নিদগ্ধকর্মাণাং তমাহুঃ পণ্ডিতং বুধাঃ ।।১৯।।
যস্যসর্বেসমারম্ভাঃকাম-সংকল্প-বর্জিতাঃ,
জ্ঞান-অগ্নি-দগ্ধ-কর্মাণাম্তম্আহুঃপণ্ডিতম্বুধাঃ ।।১৯।।
অর্থ:-যাঁর সমস্ত কর্ম প্রচেষ্টা কাম ও সংকল্প রহিততিনি পূর্ণ জ্ঞানে অধিষ্ঠিত। জ্ঞানীগণ বলেন যেতাঁর সমস্ত কর্মের প্রতিক্রিয়া পরিশুদ্ধ জ্ঞানাগ্নি দ্বারা দগ্ধ হয়েছে।
 
শ্লোক:20:
ত্যক্ত্বা কর্মফলাসঙ্গং নিত্যতৃপ্তো নিরাশ্রয়ঃ ।
কর্মণ্যভিপ্রবৃত্তোহপি নৈব কিঞ্চিৎ করোতি সঃ ।।২০।।
ত্যক্ত্বাকর্মফল-আসঙ্গম্নিত্যতৃপ্তঃনিঃ-আশ্রয়ঃ,
কর্মণিঅভিপ্রবৃত্তঃঅপিএবকিঞ্চিৎকরোতিসঃ ।।২০।।
অর্থ:- যিনি কর্মফলের আসক্তি সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে সর্বদা তৃপ্ত এবং কোন রকম আশ্রয়ের অপেক্ষা করেন নাতিনি সব রকম কর্মে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও কর্মফলের আশায় কোন কিছুই করেন না।
 
শ্লোক:21:
নিরাশীর্যতচিত্তাত্মা ত্যক্তসর্বপরিগ্রহঃ ।
শারীরং কেবলং কর্ম কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্ ।।২১।।
 নিঃ-আশীঃযত-চিত্ত-আত্মাত্যক্ত-সর্বপরিগ্রহঃ,
শারীরম্কেবলম্কর্মকুর্বন্আপ্নোতিকিল্বিষম্ ।।২১।।
অর্থ:- এই প্রকার জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁর মন ও বুদ্ধিকে সর্বতোভাবে সংযত করে কার্য করেন। তিনি প্রভুত্ব করার প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে কেবল জীবন ধারণের জন্য কর্ম করেন। এভাবেই কর্ম করার ফলে কোন রকম পাপ তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।
 
শ্লোক:22:
যদৃচ্ছালাভসন্তুষ্টো দ্বন্দ্বাতীতঃ বিমৎসরঃ ।
সম সিদ্ধাবসিদ্ধৌ চ কৃত্বাপি ন নিবধ্যতে ।।২২।।
 যদৃচ্ছা-লাভ-সন্তুষ্টঃদ্বন্দ্ব-অতীতঃবিমৎসরঃ,
সমঃসিদ্ধৌঅসিদ্ধৌকৃত্বাঅপিনিবধ্যতে ।।২২।।
অর্থ:- যিনি অনায়াসে যা লাভ করেনতাতেই সন্তুষ্ট থাকেনযিনি সুখ-দুঃখ রাগ-দ্বেষ আদি দ্বন্দ্বের বশীভূত হন না এবং মাৎসর্যশূন্যযিনি কার্যের সাফল্য ও অসাফল্যে অবিচলিত থাকেনতিনি কর্ম সম্পাদন করলেও কর্মফলের দ্বারা কখনও আবদ্ধ হন না।
 
শ্লোক:23:
গতসঙ্গস্য মুক্তস্য জ্ঞানাবস্থিতচেতসঃ ।
যজ্ঞায়াচরতঃ কর্ম সমগ্রং প্রবিলীয়তে ।।২৩।।
 গতসঙ্গস্যমুক্তস্যজ্ঞান-অবস্থিত-চেতসঃ,
যজ্ঞায়আচরতঃকর্মসমগ্রম্প্রবিলীয়তে ।।২৩।।
অর্থ:- জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়েচিন্ময় জ্ঞাননিষ্ঠ ব্যক্তি যজ্ঞের উদ্দেশ্যে যে কর্ম সম্পাদন করেনসেই সকল কর্ম সম্পূর্ণরূপে লয় প্রাপ্ত হয়।
 
শ্লোক:24:
ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবির্ব্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্ ।
ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকর্মসমাধিনা ।।২৪।।
 ব্রহ্মঅর্পণম্ব্রহ্মহবিঃব্রহ্মাগ্নৌব্রহ্মণাহুতম্,
ব্রহ্মএবতেনগন্তব্যম্ব্রহ্মকর্মসমাধিনা ।।২৪।।   অর্থ:- যিনি কৃষ্ণভাবনায় সম্পূর্ণ মগ্ন তিনি অবশ্যই চিৎজগতে উন্নীত হবেনকারণ তাঁর সমস্ত কার্যকলাপ চিন্ময়। তাঁর কর্মের উদ্দেশ্য চিন্ময় এবং সেই উদ্দেশ্যে তিনি যা নিবেদন করেনতাও চিন্ময়।
 
শ্লোক:25:
তদৈবমেবাপরে যজ্ঞং যোগিনঃ পর্যুপাসতে ।
ব্রহ্মাগ্নাবপরে যজ্ঞং যজ্ঞেনৈবোপজুহ্বতি ।।২৫।।
 দৈবম্এবঅপরেযজ্ঞম্যোগিনঃপর্যুপাসতে,
ব্রহ্মাগ্নৌঅপরে যজ্ঞম্যজ্ঞেনএবউপজুহ্বতি ।।২৫।।     
অর্থ:-কোনও কোনও যোগী দেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করার মাধ্যমে তাঁদের উপাসনা করেনআর অন্য অনেকে ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে সব কিছু নিবেদন করার মাধ্যমে যজ্ঞ করেন।
 
শ্লোক:26:
শ্রোত্রাদীনীন্দ্রিয়াণ্যন্যে সংযমাগ্নিষু জুহ্বতি ।
শব্দাদীন্ বিষয়ানন্য ইন্দ্রিয়াগ্নিষু জুহ্বতি ।।২৬।।
 শ্রোত্রাদীনিইন্দ্রিয়াণিঅন্যেসংযম-অগ্নিষুজুহ্বতি,
শব্দাদীন্বিষয়ান্অন্যেইন্দ্রিয়-অগ্নিষুজুহ্বতি ।।২৬।।     
অর্থ:- কেউ কেউ (শুদ্ধ ব্রহ্মচারীরা) মনঃসংযমরূপ অগ্নিতে শ্রবণ আদি ইন্দ্রিয়গুলিকে আহুতি দেনআবার অন্য অনেকে ( নিয়মনিষ্ঠ গৃহস্থেরা) শব্দাদি ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলিকে ইন্দ্রিয়রূপ অগ্নিতে আহুতি দেন।
 
শ্লোক:27:
সর্বাণীন্দ্রিয়কর্মাণি প্রাণকর্মাণি চাপরে ।
আত্মসংযমযোগাগ্নৌ জুহ্বতি জ্ঞানদীপিতে ।।২৭।।
 সর্বাণিইন্দ্রিয়কর্মাণিপ্রাণকর্মাণিঅপরে ।
আত্ম-সংযম-যোগ-অগ্নৌজুহ্বতিজ্ঞানদীপিতে ।।২৭।।      
অর্থ:- মন ও ইন্দ্রিয়-সংযমের মাধ্যমে যাঁরা আত্মজ্ঞান লাভের প্রয়াসীতাঁরা তাঁদের সমস্ত ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপ ও প্রাণবায়ু জ্ঞানের দ্বারা প্রদীপ্ত আত্মাসংযমরূপ অগ্নিতে আহুতি দেন।
 
শ্লোক:28:
দ্রব্যযজ্ঞাস্তপোযজ্ঞা যোগযজ্ঞাস্তথাপরে ।
স্বাধ্যায়জ্ঞানযজ্ঞাশ্চ যতয়ঃ সংশিতব্রতাঃ ।।২৮।।
 দ্রব্যযজ্ঞাঃতপোযজ্ঞাঃযোগযজ্ঞাঃতথাঅপরে,
স্বাধ্যায়-জ্ঞান-যজ্ঞাঃযতয়ঃসংশিতব্রতাঃ ।।২৮।।
অর্থ:- কঠোর ব্রত গ্রহণ করে কেউ কেউ দ্রব্য দানরূপ যজ্ঞ করেন। কেউ কেউ তপস্যারূপ যজ্ঞ করেনকেউ কেউ অষ্টাঙ্গ-যোগরূপ যজ্ঞ করেন এবং অন্য অনেকে পারমার্থিক জ্ঞান লাভের জন্য বেদ অধ্যয়নরূপ যজ্ঞ করেন।
 
শ্লোক:29:
অপানে জুহ্বতি প্রাণং প্রাণেহপাণং তথাপরে ।
প্রাণপানগতী রুদ্ধ্বা প্রাণায়ামপরায়ণাঃ ।
অপরে নিয়তাহারাঃ প্রাণান্ প্রাণেষু জুহ্বতি ।।২৯।।
অপানেজুহ্বতিপ্রাণম্প্রাণেঅপাণম্তথাঅপরে,
প্রাণ-অপানগতীরুদ্ধ্বাপ্রাণায়াম-পরায়ণাঃ ।
অপরেনিয়তআহারাঃপ্রাণান্প্রাণেষুজুহ্বতি।।২৯।।   
অর্থ:- আর যাঁরা প্রাণায়াম চর্চায় আগ্রহীতাঁরা অপান বায়ুকে প্রাণবায়ুতে এবং প্রাণবায়ুকে অপান বায়ুতে আহুতি দিয়ে অবশেষে প্রাাণ ও অপান বায়ুর গতি রোধ করে সমাধিস্থ হন। কেউ আবার আহার সংযম করে প্রাণবায়ুকে প্রাণবায়ুতেই আহুতি দেন।
 
শ্লোক:30:
সর্বেহপ্যেতে যজ্ঞবিদো যজ্ঞক্ষপিতকল্মষাঃ ।
যজ্ঞশিষ্টামৃতভুজো যান্তি ব্রহ্ম সনাতনম্ ।।৩০।।
 সর্বেঅপিএতেযজ্ঞবিদঃযজ্ঞক্ষপিত-কল্মষাঃ,
যজ্ঞ-শিষ্ট-অমৃত-ভুজঃযান্তিব্রহ্মসনাতনম্ ।।৩০।।
অর্থ:- এঁরা সকলেই যজ্ঞতত্ত্ববিৎ এবং যজ্ঞের প্রভাবে পাপ থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা যজ্ঞাবশিষ্ট অমৃত আস্বাদন করেনএবং তার পর সনাতন প্রকৃতিতে ফিরে যান।
 
শ্লোক:31:
নায়ং লোকোহ্স্ত্যযজ্ঞস্য কুতোহন্যঃ কুরুসত্তম ।।৩১।।
অয়ম্লোকঃঅস্তিঅযজ্ঞস্যকুতঃঅন্যঃকুরুসত্তম ।।৩১।।
অর্থ:- হে কুরুশ্রেষ্ঠ ! যজ্ঞ অনুষ্ঠান না করে কেউই এই জগতে সুখে থাকতে পারে নাতা হলে পরলোকে সুখপ্রাপ্তি কি করে সম্ভব ?
 
শ্লোক:32:
এবং বহুবিধা যজ্ঞা বিততা ব্রহ্মণো মুখে ।
কর্মজান্ বিদ্ধি তান্ সর্বানেবং জ্ঞাত্বা বিমোক্ষ্যসে ।।৩২।।
 এবম্বহুবিধাঃযজ্ঞাঃবিততাঃব্রহ্মণঃমুখে,
কর্মজান্বিদ্ধিতান্সর্বান্এবম্জ্ঞাত্বাবিমোক্ষ্যসে ।।৩২।।
অর্থ:- এই সমস্ত যজ্ঞই বৈদিক শাস্ত্রে অনুমোদিত হয়েছে এবং এই সমস্ত যজ্ঞ বিভিন্ন প্রকার কর্মজাত। সেগুলিকে যথাযথভাবে জানার মাধ্যমে তুমি মুক্তি লাভ করতে পারবে।
 
শ্লোক:33:
শ্রেয়ান্ দ্রব্যময়াদ্ যজ্ঞাজ্ জ্ঞানযজ্ঞঃ পরন্তপ ।
সর্বং কর্মাখিলং পার্থ জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে ।।৩৩।।
 শ্রেয়ান্দ্রব্যময়াৎযজ্ঞাৎজ্ঞানযজ্ঞঃপরন্তপ,
সর্বম্কর্মঅখিলম্পার্থজ্ঞানেপরিসমাপ্যতে ।।৩৩।।
অর্থ:- হে পরন্তপ ! দ্রব্যময় যজ্ঞ থেকে জ্ঞানময় যজ্ঞ শ্রেয়৷ হে পার্থ ! সমস্ত কর্মই পূর্ণরূপে চিন্ময় জ্ঞানে পরিসমাপ্তি লাভ করে।
 
শ্লোক:34:
তদ্ বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া ।
উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ ।।৩৪।।
 তৎবিদ্ধিপ্রণিপাতেনপরিপ্রশ্নেনসেবয়া,
উপদেক্ষ্যন্তিতেজ্ঞানম্জ্ঞানিনঃতত্ত্বদর্শিনঃ ।।৩৪।।        
অর্থ:- সদ্ গুরু শরণাগত হয়ে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করার চেষ্টা কর। বিনম্র চিত্তে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কর এবং অকৃত্রিম সেবার দ্বারা তাঁকে সন্তুষ্ট কর ৷ তা হলে সেই তত্ত্বদ্রষ্টা পুরুষেরা তোমাকে জ্ঞান উপদেশ দান করবেন।
 
শ্লোক:35:
যজ্ জ্ঞাত্বা ন পুনর্মোহমেবং যাস্যসি পাণ্ডব ।
যেন ভূতান্যশেষাণি দ্রক্ষ্যস্যাত্মন্যথো ময়ি ।।৩৫।।
 যৎজ্ঞাত্বাপুনঃমোহম্এবম্যাস্যসিপাণ্ডব,
যেনভূতানিঅশেষাণিদ্রক্ষ্যসিআত্মনিঅথোময়ি ।।৩৫।।
অর্থ:- হে পাণ্ডব ! এভাবে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করে তুমি আর মোহগ্রস্ত হবে নাকেন না এই জ্ঞানের দ্বারা তুমি দর্শন করবে যেসমস্ত জীবই আমার বিভিন্ন অংশ অর্থাৎ তারা সকলেই আমার এবং তারা আমাতে অবস্থিত ।
 
শ্লোক:36:
অপি চেদসি পাপেভ্যঃ সর্বেভ্যঃ পাপকৃত্তমঃ ।
সর্বং জ্ঞানপ্লবেনৈব বৃজিনং সন্তরিষ্যসি ।।৩৬।।
 অপিচেৎঅসিপাপেভ্যঃসর্বেভ্যঃপাপকৃত্তমঃ,
সর্বম্জ্ঞানপ্লবেনএববৃজিনম্সন্তরিষ্যসি ।।৩৬।।
অর্থ:- তুমি যদি সমস্ত পাপীদের থেকেও পাপিষ্ঠ বলে গণ্য হয়ে থাকতা হলেও এই জ্ঞানরূপ তরণীতে আরোহণ করে তুমি দুঃখ-সমুদ্র পার হতে পারবে।
 
শ্লোক:37:
যথৈধাংসি সমিদ্ধোহগ্নির্ভস্মসাৎ কুরুতেহর্জুন ।
জ্ঞানাগ্নি সর্বকর্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা ।।৩৭।।
 যথাএধাংসিসমিদ্ধঃঅগ্নিঃভস্মসাৎকুরুতেঅর্জুন,
জ্ঞানাগ্নিঃসর্বকর্মাণিভস্মসাৎকুরুতেতথা ।।৩৭।।
অর্থ:- প্রবলরূপে প্রজ্জ্বলিত অগ্নি যেমন কাষ্ঠকে ভস্মসাৎ করেহে অর্জুন ! তেমনই জ্ঞানাগ্নিও সমস্ত কর্মকে দগ্ধ করে ফেলে।
 
শ্লোক:38:
ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে ।
তৎ স্বয়ং যোগসংসিদ্ধঃ কালেনাত্মনি বিন্দতি ।।৩৮।।
 হিজ্ঞানেনসদৃশম্পবিত্রম্ইহবিদ্যতে,
তৎস্বয়ম্যোগসংসিদ্ধঃকালেনআত্মনিবিন্দতি ।।৩৮।। 
অর্থ:- এই জগতে চিন্ময় জ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছুই নেই। এই জ্ঞান সমস্ত যোগের পরিপক্ক ফল৷ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনের মাধ্যমে যিনি সেই জ্ঞান আয়ত্ত করেছেনতিনি কালক্রমে আত্মায় পরা শান্তি লাভ করেন।
 
শ্লোক:39:
শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ।
জ্ঞানং লব্ধ্বা পরাং শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি ।।৩৯।।
 শ্রদ্ধাবান্লভতেজ্ঞানম্তৎপরঃসংযত-ইন্দ্রিয়ঃ,
জ্ঞানম্লব্ধ্বাপরাম্শান্তিম্অচিরেণঅধিগচ্ছতি ।।৩৯।।
অর্থ:- সংযতেন্দ্রিয় ও তৎপর হয়ে চিন্ময় তত্ত্বজ্ঞানে শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি এই জ্ঞান লাভ করেনসেই দিব্য জ্ঞান লাভ করে তিনি অচিরেই পরা শান্তি প্রাপ্ত হন।
 
শ্লোক:40:
অজ্ঞশ্চাশ্রদ্দধানশ্চ সংশয়াত্মা বিনশ্যতি ।
নায়ং লোকোহস্তি ন পরো ন সুখং সংশয়াত্মনঃ ।।৪০।।
 অজ্ঞঃঅশ্রদ্দধানঃসংশয়াত্মাবিনশ্যতি,
অয়ম্লোকঃঅস্তিপরঃসুখম্সংশয়াত্মনঃ ।।৪০।।
অর্থ:- অজ্ঞ ও শাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাহীন ব্যক্তি কখনই ভগবদ্ভক্তি লাভ করতে পারে না। সন্দিগ্ধ চিত্ত ব্যক্তি ইহলোকে সুখভোগ করতে পারে না এবং পরলোকেও সুখভোগ করতে পারে না।
 
শ্লোক:41:
যোগসংন্যস্তকর্মাণং জ্ঞানসংছিন্নসংশয়ম্ ।
আত্মবন্তং ন কর্মাণি নিবধ্নন্তি ধনঞ্জয় ।।৪১।।
যোগসংন্যস্ত-কর্মাণম্জ্ঞান-সংছিন্ন-সংশয়ম্,
আত্মবন্তম্কর্মাণিনিবধ্নন্তিধনঞ্জয় ।।৪১।।
অর্থ:- অতএবহে ধনঞ্জয় ! যিনি নিষ্কাম কর্মযোগের দ্বারা কর্মত্যাগ করেনজ্ঞানের দ্বারা সংশয় নাশ করেন এবং আত্মার চিন্ময় স্বরূপ অবগত হনতাঁকে কোন কর্মই আবদ্ধ করতে পারে না।
 
শ্লোক:42:
তস্মাদজ্ঞানসম্ভূতং হৃৎস্থং জ্ঞানাসিনাত্মনঃ ।
ছিত্ত্বৈনং সংশয়ং যোগমাতিষ্ঠোত্তিষ্ঠ ভারত ।।৪২।।
 তস্মাৎঅজ্ঞান-সম্ভূতম্হৃৎস্থম্জ্ঞান-অসিনাআত্মনঃ,
ছিত্ত্বাএনম্সংশয়ম্যোগম্আতিষ্ঠউত্তিষ্ঠভারত ।।৪২।।          
অর্থ:-অতএবহে ভারত ! তোমার হৃদয়ে যে অজ্ঞানপ্রসূত সংশয়ের উদয় হয়েছেতা জ্ঞানরূপ খড়গের দ্বারা ছিন্ন কর। যোগাশ্রয় করে যুদ্ধ করার জন্য উঠে দাঁড়াও।
 
ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে 'জ্ঞানযোগোনাম চতুর্থোঽধ্যায়ঃ ॥৪॥
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post