প্রথম স্কন্দ - একাদশ অধ্যায়

দ্বারকাবাসীগণ কর্তৃক শ্রীকৃষ্ণের সংবর্ধনা এবং নগরে প্রবেশ

সূত বললেন–ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকায় উপনীত হলেন। প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত করার জন্য পাঞ্চজন্য শঙ্খ বাজালেন। তার করকমলে বর্তমান শুভ্র শঙ্খ শব্দ করতে করতে রক্তবর্ণ কমলসমূহের মধ্যে কলহংসের মতো শোভা পেতে লাগলো। প্রভুর দর্শন ইচ্ছায় প্রজা সকল তার নিকট এসে উপস্থিত হল। সুর্যের কোন আলোকের অপেক্ষা না থাকলেও লোকেরা যেমন দিকদান করে থাকে তেমন ভাবেই শ্রীকৃষ্ণকে প্রজারা নানাবিধ উপহার প্রদান করল। বালকেরা যেমন গৃহস্থ পিতার কছে আবদার করে বসে তেমনই গন্ধ এবং রক্ষক শ্রীকৃষ্ণকে তারা গদগদ বাক্যে বলতে লাগল- হে নাথ, এ জগতের মঙ্গলকামী জনগণের একমাত্র আশ্রয় হলে তুমি। ব্রহ্মা, সনকাদি ঋষি এবং দেবতাদের দ্বারা তুমি পূজিত। তোমার চরণ কমলে আমরা প্রণত হই। ব্রহ্মাদির ওপর প্রভুত্ব কারী কালও তোমার চরণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তুমি আমাদের মঙ্গলের জন্য বিশ্বপালক হও, তুমি আমাদের মাতা, পিতা, সুহৃদ এবং পতি অর্থাৎ রক্ষক। তোমার অনুগমনের দ্বারা আমরা কৃতার্থ হয়েছি। তুমি আমাদের পরম দেবতা তোমার দ্বারা আমরা উপযুক্ত রক্ষকযুক্ত হয়েছি। তুমি স্নিগ্ধ দৃষ্টিপূর্ণ বদন কমলে বিরাজমান। হে পদ্মপলাশ লোচন, আমাদের ছেড়ে তুমি যখন হস্তিনাপুর অথবা মথুরা মণ্ডলে যাও, যখন সূর্য ব্যতীত চক্ষুর মতো চারপাশে অন্ধকার নেমে আসে, তোমার বিরহে হে অচ্যুত, ক্ষণকালকেও কোটি বছর বলে মনে হয়। হে নাথ, তুমি দীর্ঘকাল প্রবাসে থাকলে আমরা কী করে জীবিত থাকব।

ভক্তবৎসল বাসুদেব প্রজাদের উচ্চারিত এইসকল শব্দ শ্রবণ করতে করতে দ্বারকাপুরে প্রবেশ করলেন। নাগরা যেভাবে ভোগবতী পরীকে রক্ষা করে, যেভাবে নিজের মতো বলশালী মধুপ বোঝ দশাট, কুকুর, অন্ধক, এবং বৃক্ষরা সে নগরী রক্ষা করত। সেই নগরীতে সমস্ত ঋতুর ফল এবং পুষ্পদি শোভা বিদ্যমানই, যেখানে পদ্ম উৎপাদনে সরোবর শোভা আছে। নগরীর প্রধান দ্বার, গৃহদ্বার এবং পথে পথে উৎসব জনিত তোড়ন নির্মাণ করা হয়েছে। বিভিন্ন বর্ণের ধবজা উড়ছে। নগরীর প্রধান পথ, ছোট পথ, হাটবাজার পরিষ্কার করা হয়েছে। সুগন্ধ জলের দ্বারা নগরীকে সিক্ত করা হয়েছে। ফল, পুষ্প এবং যবের অঙ্কুর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটি গৃহদ্বার দধি, আতপ চাল, ফল, ইক্ষুদণ্ড পূর্ণ কুম্ভ এবং পূজার উপকরণ রাখা হয়েছে।

এই সুশোভিত নগরীতে প্রিয়তম শ্রীকৃষ্ণ এসেছেন, শুনে উদারচিত্ত বসুদেব অত্রুর, উগ্রসেন, অদ্ভুত বিক্রম, বলরাম, প্রদ্যুম্ন, চারুদেষ্ণ এবং জাম্ববতী পুত্র শাম্ব হস্তীকে সামনে রেখে কাছে চলে এলেন। তারা মঙ্গলজয় পুষ্পহস্ত ব্রাহ্মণদের সাথে শঙ্খ, তুর্য এবং বেদধ্বনির দ্বারা উৎসাহিত হয়ে ভগবানের কাছে গেলেন। শত শত শ্রেষ্ঠ বারঙ্গণারা কৃষ্ণদর্শনের লালসায়? মানে আরোহণপূর্বক তার কাছে গেলেন। নট, নর্তক, গায়ক, সুত, মগধ এবং বন্দীনিরা ভগবানের কার্যসকল গান করতে থাকল, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিকটে এসে পৌঁছলেন। তিনি সেখানে পৌঁছে কাউকে হস্তধারণ দ্বারা সম্মানিত করলেন। আচন্ডাল সকলকে অভয় এবং অভিলষিত বস্তু দিয়ে বন্দিত করলেন। পিতা মহাদি গুরুবর্গ এবং সপত্নীক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণদের আশীর্বাদ গ্রহণ করলেন। অন্যান্য বন্দিদের সন্মান লাভ করে নগরে প্রবেশ করলেন।

কৃষ্ণ রাজপথে এলে দ্বাররক্ষক কুলরমণীরা তার দর্শনে আহ্লাদিত হলেন। দ্বারকাবাসীরা নিত্য ভগবানকে দেখলেন, তাদের নয়নের তৃপ্তি সাধন হয়নি। কারণ শ্রী বিগ্রহ সকল শোভার আশ্রয় ছিল। যাঁর বক্ষস্থল মহালক্ষ্মীর নিবাসস্থল, সৌন্দর্য এবং অমৃত পূর্ণ মুখমণ্ডল সমস্ত প্রাণীর নয়নের পানপাত্র, যাঁর বাহু লোকপালদের আশ্রয়স্থল, যার চরণকমল ভক্তগণের বাসস্থান, তিনি হলেন কৃষ্ণ। সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, ইন্দ্রধনু এবং বিদ্যুতের দ্বারা মেঘ যেমন শোভা পায়, শ্বেতবর্ণ ছত্র এবং চামরের দ্বারা মুণ্ডিত, চারদিকে থেকে পুষ্প বর্ষণে অভিবর্ষিত শ্রীকৃষ্ণ পীতবসন এবং বনমালার দ্বারা পথে পথে শোভিত হয়ে ছিলেন। তিনি মাতা পিতার গৃহে প্রবেশ করলেন। মাতৃগণের দ্বারা আলিঙ্গিত হলেন। দেবকী প্রমুখ ষাটজন মাতাকে মস্তকের দ্বারা প্রণাম করলেন। তারা পুত্রকে কোলে করে আনন্দে বিহ্বল হয়ে চোখের জল বিসর্জন করলেন। পুত্র স্নেহে তাদের স্তন থেকে দুগ্ধ ক্ষরিত হচ্ছিল।

তারপর সমস্ত কাম্য দ্রব্যে পরিপূর্ণ উত্তম নিজ ভবনে প্রবেশ করলেন। ষোলো হাজার পত্নী ও অট্টালিকা সেখানে ছিল। প্রিয়াগত পতিকে দূর থেকে দেখে পত্নীদের মনে মহান আনন্দ উপস্থিত হল। তারা লজ্জায় অবনতমুখী হয়ে আসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। গম্ভীর অভিপ্রায় যুক্ত রমণীদের প্রথমে মনে মনে, তারপর দৃষ্টির দ্বারা, পরবর্তীকালে পুত্রের দ্বারা এবং পরিশেষে নিজেরা পতিকে আলিঙ্গন করলেন। লজ্জাশীলা সেই রমণীদের নেত্র থেকে নিরুদ্ধ হলেও কিছু অশ্রু বহির্গত হতে থাকল।

বাতাস যেমন বৃক্ষের সংঘর্ষের দ্বারা অগ্নি উৎপাদন করে যাদের ভস্ম করে দেয়, কৃষ্ণ সেইভাবে উদ্ধত প্রভাবশালী নৃপতিদের মধ্যে পরস্পর কলহ বাঁধিয়ে যুদ্ধ সংঘর্ষ করলেন। নিজে যোগমায়ার দ্বারা নরলোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্ত্রী রত্ন সমুহে অবস্থিত থেকে প্রাকৃত জনের মতো বিহার করতেন। যাদের উদ্দাম ভাব, নির্মলহাসি এবং লজ্জাযুক্ত চাউনির দ্বারা বিস্ময়ে বশীভূত প্রাকৃত মদন চাপ নিক্ষেপ করত, মোট সর্বোত্তম প্রমদাগণ কপট বিলাশের ভান করেও শ্রীকৃষ্ণের চিত্তে চাঞ্চল্য ঘটাতে পারেনি।

ভগবান প্রাকৃত গুণে অনাসক্ত থেকে নাশ কার্যে ব্যাপৃত থাকতেন। তত্ত্বজ্ঞ প্রকৃত সাধারণ লোক তাকেই নিজেদের মতো কামাসক্ত লোক বলে মনে করত। এটাই ঈশ্বরের ঈশ্বরত্ব। তিনি প্রকৃতিতে থেকেও তার গুণের দ্বারা লিপ্ত হন না, বুদ্ধি যেভাবে আত্মাকে আশ্রয় করে থাকলে ও আত্মার আনন্দ প্রভৃতি গুণের দ্বারাও যুক্ত হয় না, সেইভাবে ভগবান আচরণ করে থাকতেন।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post