পরীক্ষিতের জন্মোৎসব
শৌণক বললেন– হে সূত, অশ্বত্থামা কর্তৃক নিক্ষিপ্ত ব্রহ্মসেনা নামক অস্ত্রে উত্তরার গর্ভ পীড়িত হয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণ আবার তাঁকে পঞ্জীপূত করলেন। ভাগবত শ্রবণে শ্রদ্ধারূপ যার মহতী বৃদ্ধি এবং মহান ধৈর্যশীল সেই পরীক্ষিতের জন্ম, কর্ম এবং নিধন কীভাবে হয়েছিল, আমি এখন তা শুনতে ইচ্ছা করি। যদি তা বলার যোগ্য বলে মনে করো, আমাদের কাছে তা বিরত করো।
সূত বললেন– সংসাদিত বস্তু থেকে নিস্পৃহ হয়ে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির পিতার মতো প্রজাদের পালন করতে থাকলেন। সুস্পষ্ট যজ্ঞসমূহ থেকে অর্জিত স্বর্গলোকে মহিষী ভ্রাতৃগণ জম্বুদ্বীপে আধিপত্য স্বর্গ পর্যন্ত বিস্তৃত ফনা যুধিষ্ঠিরকে আনন্দ দিতে পেরেছে। ক্ষুধিত ব্যক্তির খাদ্যবস্তু ছাড়া অন্য কিছুতে যেমন প্রীতি হয় না। কৃষ্ণনিষ্ঠ যুধিষ্ঠির কৃষ্ণভক্তি ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে সুখলাভ করে নি।
হে ভৃগুনন্দন, মাতা উত্তরার গর্ভস্থ এবং ব্রাহ্মস্ত্রের তেজে বাহ্যমান পরীক্ষিত তখন সেই পুরুষকে দেখেছিলেন। সে পুরুষের মাথায় উজ্জ্বল সুবর্ণের কিরীট, মনোহর রূপ তার শ্যাম বর্ণ সম্পন্ন, বিদ্যুতের মতো বস্ত্র পরিহিত এবং তিনি নির্মল ও নির্বিকার। তার সুন্দর দীর্ঘ চারটি বাহু, তপ্ত কাঞ্চনের মতো উজ্জ্বল দুটি কুণ্ডল, চক্ষুদুটি রক্ত বর্ণের এবং হাতে গদা ছিল। তিনি উল্কার মতো গদা ঘোরাতে ঘোরাতে চারিদিকে ভ্রমণ করছিলেন। সূর্য যেমন নীহারকে বিনাশ করে, তেমনই তিনি নিজের গদার দ্বারা অস্ত্রের তেজ নিবারণ করে ছিলেন। পরীক্ষিত নিকট অবস্থিত, সেই পুরুষকে দেখে ভাবলেন, ইনি কে? এরূপ বিচার করেছিলেন মানুষের যুক্তি তর্ক বিচারের অতীত ধর্মের পালক সর্বময় সর্বেশ্বর্যময় পাপাদি অর্থাৎ সকল দুঃখের প্রশমনকারী হরি সেই অস্ত্র বিনাশ করেন। দশমহলের গর্ভস্থ শিশুর সামনে সেখানে অন্তর্হিত হয়ে যান।
দ্বিতীয় পাণ্ডবের মতো পাণ্ডুর বংশের পরীক্ষিতের জন্ম হল। সন্তুষ্ট চিত্ত মহারাজ যুধিষ্ঠির সৌম্য, ধৌম্য, কৃপাচার্য প্রভৃতি ব্রাহ্মণ গণের দ্বারা শ্রোতৃবাচন পূর্বক পৌত্রের জাত কর্ম করালেন। দানযজ্ঞ কালে রাজা যুধিষ্ঠির পৌত্র জন্মের জন্য ব্রাহ্মণদের সুবর্ণ গাভী, ভূমি, গ্রহ, অশ্ব, হস্তি এবং মিষ্টান্ন দান করলেন; তারপর পরিতুষ্ট ব্রাহ্মণ গণ মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে বললেন– হে কুরু বংশের শ্রেষ্ঠ নৃপতি, কুরু বংশীয় এই সূর্যবংশে দুর্বার দৈবকর্তৃক বিনাশ উপস্থিত হলে তোমাদের অনুগ্রহের নিমিত্ত বিষ্ণু একে দিয়েছেন। হে মহা ভগবান, এজন্য এই বালক বিষ্ণুরাত অর্থাৎ কর্তৃক নামে খ্যাত হবে। বংশ গুণে কথাভাগবতেও শ্রেষ্ঠ হবে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই।
যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেনহে ব্রাহ্মণগণ যশ এবং কীর্তির দ্বারা এ বংশের মহাত্মা পূণ্য যশস্বী, রাজর্ষিদের অনুবর্তন করতে হবে।
ব্রাহ্মণগণ বললেন– হে যুধিষ্টির এ বিষয়ে তুমি বিন্দুমাত্র সংশয় প্রকাশ করো না। এ বালক মনুপুত্র ইক্ষাকুর মতো প্রজা রক্ষক হবে। দশরথ পুত্র রামচন্দ্রের মতো ব্রাহ্মণদের হিতৈষী এবং সত্য প্রতিজ্ঞা হবেন। কুশিনর দেশের রাজা শিবির মতো দাতা এবং শরণাগত পালক হবে। দুষ্মন্তের পুত্র রাজা ভরতের মতো জ্ঞাতিগণ এবং যাজ্ঞিক ব্রাহ্মণদের মধ্যে যশ বিস্তার করবে। ধনুর্ধারী বীরদের অগ্রণী এ বালক পাই এবং কার্তবীর্য অর্জুনের মতো হবে। সে হবে সমুদ্রের মতো গম্ভীর ও অগ্নির মতো দুর্ধর্ষ। ধরিত্রীর মতো ক্ষমাশীল, মাতা-পিতার মতো সহিষ্ণু, হিমালয়ের মতো সতত সিংহের বিক্রান্ত, সমদর্শিতায় পিতামহ ব্রহ্মার সমান হবে সে। প্রসন্নতায় শিবের সাথে তার তুলনা করা হবে। শ্রীপতি বিষ্ণুর মতো সে হবে সকল প্রাণীর আশ্রয়। এই বালকের মধ্যে সমস্ত সদগুণ কৃষ্ণের মতো মহিমান্বিত হবে। উদারতায় সে হবে রন্তিদেবের তুল্য। হবে যযাতির মতো ধার্মিক। ধৈর্যে মহারাজ বলির সমান। এবং প্রহ্লাদের মতো শ্রীকৃষ্ণের মতিযুক্ত। এই বালক বহু অশ্বমেধ যজ্ঞ করবে। বৃদ্ধাদের নিরন্তর সেবা করবে। অনেক রাজর্ষির পিতা হবে। হবে সে উৎপাদগামীদের শাসক। পৃথিবীর ধর্মরক্ষার জন্য কলিকে নিগৃহীত করবে। মুনি বালক শৃঙ্গী তাকে নিধনের জন্য তক্ষক সৰ্পকে প্রেরণ করবে। সব আসক্তি পরিত্যাগ করে সে শ্রী হরির চরণ কমল আশ্রয় করবে। হে মহারাজ, ব্যাসপুত্র শুকদেবের কাছে সে। আত্মজ্ঞান লাভ করবে। পরীক্ষিত পার্থিব দেহ গঙ্গা তীরে পরিত্যাগ করে শ্রীহরির চরণে আশ্রয় নেবে।
এই কথা বলে ব্রাহ্মণেরা যুধিষ্ঠিরের কাছ থেকে সন্মানিত হয়ে নিজ নিজ গৃহে গমন করলেন।
পরবর্তীকালে এই বালক পরীক্ষিত নামে খ্যাত হয়ে ছিলেন। জন্মগ্রহণের পর গর্ভে দৃষ্ট পুরুষকে ধারণ করে জনগণের মধ্যে পরীক্ষা করতেন। যুধিষ্ঠির প্রভৃতির দ্বারা লালিত হয়ে রাজপুত্র শুক্লপক্ষের চন্দ্রের মতো বৃদ্ধি পেতে থাকলেন। বাল্যকালেই তিনি ধর্মাত্মা কৃষ্ণভক্ত সকল প্রাণীর প্রতি প্রীতিযুক্ত হয়েছিলেন।
জ্ঞাতি দ্রোহ জনিত অধর্ম থেকে মুক্তি পাবার জন্যে রাজা যুধিষ্ঠির অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে বাসনা করলেন। তিনি প্রজাদের কাছ থেকে কর এবং দণ্ড ছাড়া অন্য কোন অর্থ গ্রহণ করতেন না। রাজকোষে প্রচুর অর্থ না থাকায় চিন্তান্বিত হলেন। তার অভিপ্রায় জেনে কৃষ্ণপ্রাণিত ভাইরা উত্তর দিকে মরু ও রজ্যের যজ্ঞে পড়ে থাকা সুবর্ণ পাত্রাদি অপহরণ করলেন। যুধিষ্ঠির তিনটি অশ্বমেধ যজ্ঞের দ্বারা যজ্ঞেশ্বর হরির অর্চনা করলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের আহ্বান পেয়ে হস্তিনাপুরে এলেন, কয়েকমাস সেখানে থাকলেন। দ্রৌপদী এবং বন্ধুজনের সাথে রাজা যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে অর্জুনের সঙ্গে যদুগণের দ্বারা পরিবৃত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকায় গেলেন।