বিদুরের উপদেশ অনুসারে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর বনগমন
সূত বললেন– তীর্থ ভ্রমণে গিয়ে বিদুর ঋষি মৈত্রেয়ের কাছ থেকে নিজের গতি জেনে হস্তিনাপুরে গেলেন। বিদুর মৈত্রেয়মুনির কাছে কতকগুলি প্রশ্ন করেছিলেন। তার কয়েকটি উত্তর শুনেই অন্য প্রশ্ন করা থেকে বিরত হলেন। আত্মীয় বিদুরকে কাছে আসতে দেখে যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্র যুযুৎসু সঞ্জয়, কৃপাচার্য, কুন্তী, গান্ধারী, দ্রৌপদী, সুভদ্রা, উত্তরা, কৃপাচার্যের ভগিণীরা তার কাছে এলেন। মুছাগত ব্যক্তির প্রাণ অবসন্ন হলে ইন্দ্রিয়গুলি নিস্পৃহ হয়ে পড়ে। প্রাণ ফিরে এলে ইন্দ্রিয়গুলি ক্রিয়াশীল হয়। বিদুরের বিরহে আত্মীয়গণ তাকে পেয়ে আনন্দে উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলেন। আত্মীয়রা যথারীতি আলিঙ্গন অভিবাদন প্রভৃতির দ্বারা মিলিত হয়ে আনন্দাশ্রু বিসর্জন করলেন। বিদুর আসনে উপবিষ্ট হলেন। যুধিষ্টির তাকে সম্মানিত করলেন।
যুধিষ্ঠির বললেন– পক্ষীগণ যেমন শাবকদের পক্ষছায়ায় রক্ষা করে তেমনই আপনার পক্ষপাত ছায়া বর্জিত আমাদের কথা কি আপনার মনে পড়ে। আপনার আশীর্বাদে আমরা বিষ, অগ্নি প্রভৃতি বিপদ থেকে রক্ষিত হয়েছি। এই পৃথিবীর তীর্থযাত্রার ভ্রমণ করতে করতে বৃত্তির দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন। মোক্ষ কোন্ তীর্থে পৌঁছে গেছেন। হে বিভু, আপনাদের মতো পরম ভাগবতগণ নিজেরাই তীর্থস্বরূপ শুদ্ধ। কারণ ভগবান আপনাদের হৃদয় থেকে গরল ধারণ করে তীর্থগুলি পবিত্র করে থাকেন। হে তাত, কৃষ্ণ যাদের দেবতা সেই যদুবংশের বন্ধুদের ও সুহৃদদের আপনি কী দেখেছেন? তাঁরা সুখে আছেন তো?
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের প্রশ্ন শুনে বিদুর যদুকুলের বিনাশ ছাড়া আর যা জানতেন সব বললেন। মানুষের দুর্দিন স্বগৃহে উপস্থিত হলে পাণ্ডব দ্বারা দেবতাদের মতো সন্মানিত হয়ে বিদুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দেবার জন্য কিছুকাল সেখানে বাস করলেন। মান্ডব ঋষির অভিশাপে যম একশো বছর যাবৎ শুদ্র হয়েছিলেন। তখন সূর্য যমলোকে পাতকিদের যথাবিধি দণ্ড দিতেন। যুধিষ্ঠির রাজ্যলাভ করে বংশধর পৌত্র পরীক্ষিৎকে দেখে ইন্দ্রাদি লোকপাল তুল্য ভাইদের সাথে পরম আনন্দিত হলেন।
গৃহে আসক্ত এবং গৃহকার্যে প্রমত্ত পাণ্ডবদের আয়ুর কাল অজ্ঞাতসারে আক্রমণ করল। বিদুর তা বুঝতে পেরে ধৃতরাষ্ট্রকে অনতিবিলম্বে বললেন– ভয় অর্থাৎ কালে এসে উপস্থিত হয়েছে। হে প্রভু, এ জগতে কোনো স্থানে কোনো সময়ে যার প্রতিকার নেই, আমাদের সেই অন্তিমকাল উপস্থিত হয়েছে। যে মৃত্যুরূপ কালগ্রস্ত হয়ে মানুষ প্রিয়তম প্রাণ থেকেও বিযুক্ত হয় আর অন্য ধন প্রভৃতির কথা কী বলব? মহারাজ, আপনার পিতা, ভ্রাতা, সুহৃদ এবং পুত্রগণ সকলেই নিহত হয়েছেন। আপনার বয়সও হয়েছে। দেহ জরাগ্রস্ত। আর এখন পরের গৃহে বাস করছেন কেন? আপনি জন্ম থেকে অন্ধ এখন আবার বুধির এবং বুদ্ধিহীন হয়েছেন। আপনার দন্তগুলি শিথিল হয়েছে। অজীর্ণজনিত মন্দাগ্নি আপনাকে আক্রমণ করেছে। এখনও সানুরাগে কেন এখানে বাস করছেন। হায় জীবের জীবিত থাকার আশা কী ফলবতী? যে আশায় আপনি আপনার পুত্রহন্তা ভীমের প্রদত্ত অন্ন গৃহপাশ কুকুরের মত ভোজন করছেন। হে মহারাজ যাদের বিনাশ কামনায় অগ্নি নিক্ষেপ করেছেন, বিষ দিয়েছেন, পত্নীদের অপমানিত করেছেন, যাদের রাজ্য ও সম্পত্তি অপহরণ করেছেন, তাদের প্রদত্ত অন্নাদির দ্বারা প্রাণ ধারণের কী প্রয়োজন? এই রূপ দৈন্য অনুভব করেও জীবিত থাকতে ইচ্ছা করছেন। পুরাতন বস্ত্রের মতো আপনার অনিচ্ছাও এই দেহ জরায় জীর্ণ হয়ে ক্ষয় পাচ্ছে।
যিনি অসমর্থ হয়ে ধন পুত্রাদি এবং দেহাভিমানে পরিত্যাগ করে সকলের অগোচরে গৃহত্যাগ করেন, তিনি বীর বলে কথিত হন। যার দ্বারা যশ বা ধর্ম কোনো স্বার্থপুরণ হবে না, সেই মোহ জরাদি ব্যাকুল এই দেহকে যিনি ত্যাগ করেন, তিনিই বীর। নিজে থেকে অথবা পরের উপদেশে যিনি এ জন্মের নির্বেদ প্রাপ্ত হয়ে মনকে বশীভূত হয়ে শ্রীহরিতে ধারণ করেন, তিনি শ্রেষ্ঠ মানব। আপনি আত্মীয়দের অগোচরে উত্তর দিক অর্থাৎ হিমালয় অভিমুখে চলে যান। এর পরেই গরমকাল এসে উপস্থিত হবে।
অনুজ বিদুর কর্তৃক প্রবোধিত হয়ে জন্মান্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র চিত্তের দৃঢ়তা বশত আত্মীয় স্বজনের স্নেহ পাশ ছিন্ন করে গৃহ থেকে বহির্গত হলেন। সুবলরাজের কন্যা পতিব্রতা সুশীলা গান্ধারী পতির অনুগমন করলেন। হিমালয় দুর্গম হলেও তা তাদের কাছে আনন্দদায়ক হয়েছিল।
অজাতশত্রু মহারাজ যুধিষ্ঠির সন্ধ্যা বন্দনাদি করে ব্রাহ্মণদের তিল, গাভী, ভূমি, অন্ন দান করে গৃহে প্রবেশ করলেন। তিনি বিদুর, ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধরীকে দেখতে পেলেন না। সেখানে উপবিষ্ট সঞ্জয়কে জিজ্ঞাসা করলেন –হে সঞ্জয়, বৃদ্ধ অন্ধ আমাদের পিতা কোথায় গেলেন? পুত্রশোকে কাতর মাতা গান্ধারী এবং আমাদের হিতাকাঙ্খী পিতৃব্য বিদুরই বা কোথায় গেলেন? আমার কোনো পাপ কল্পনা করে দুঃখিত হয়ে ভার্যার সাথে ধৃতরাষ্ট্র গঙ্গায় পতিত হলেন? আমাদের পিতা পাণ্ডুর মৃত্যুর পর ভ্রাতুস্পুত্র আমাদের বিপদ থেকে যারা রক্ষা করেছিলেন সেই দুজন পিতৃব্য বিদুর ও ধৃতরাষ্ট্র এখন কোথায় গেলেন।
সূত বললেন– নিজ গৃহে ধৃতরাষ্ট্রকে না দেখে সূত সঞ্জয় কোনো প্রত্যুত্তর করলেন না। তিনি দুহাত দিয়ে চোখের জল মুছে বুদ্ধির দ্বারা মনকে ঠিক করলেন। তিনি বললেন, হে কুল নন্দন তোমাদের পিতৃব্যদ্বয় এবং গান্ধারি কোনো কথাই জানি না। হে মহাবাহ, সেই মহাত্মাদের দ্বারা আমি বঞ্চিত হয়েছি।
এমন সময় খঞ্জনি হাতে ভগবান নারদ সেখানে নেমে এলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠির অভিবাদন পূর্বক তাকে অর্চনা করলেন। যুধিষ্ঠির জানতে চাইলেন, হে ভগবান, আমি পিতৃব্যদ্বয়ের কোনো সংবাদ জানি না। এখান থেকে তারা কোথায় গেলেন? নিহত পুত্রের শোকে কাতর ও পস্বিনী মতো কোথায় গেলেন? আপনি আমাকে শোক সাগর থেকে উদ্ধার করুন।
মুনিশ্রেষ্ঠ ভগবান নারদ বললেন– হে মহারাজ, কারও জন্য শোক করো না। যেহেতু এ জগত ঈশ্বরের বশীভুত। দিকপাল গণের সাথে সমস্ত লোক তো ঈশ্বরে পূজা উপহার বহন করছে। সেই পরমেশ্বরই কর্মানুসারে প্রাণীদের সংযুক্ত করছেন। আবার তিনি তাদের বিযুক্ত করছেন। যেমন দড়ি দিয়ে নাসিকায় বদ্ধ পাখিরা দীর্ঘ রঞ্জু দিয়ে বন্ধ থাকে তেমনই বেদরূপ দড়িতে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় প্রভৃতি নামরূপ রঞ্জুতে বদ্ধ জীব সকল শাসন পালন করছে। ক্রীড়াকারীর ইচ্ছায় কাষ্ঠময় পশুপক্ষীর একত্র মিলন ও বিচ্ছেদ হয়। ঈশ্বরের ইচ্ছায় জীবগণের সংযোগ ও বিয়োগ হয়ে থাকে।
সন্ত্রস্ত ব্যক্তি যেমন পরকে রক্ষা করতে পারে না, কাম গুণের অধীনে পাঞ্চ ভৌতিক দেহ অন্যকে রক্ষা করবে কী করে? হে মহারাজ, এ জগৎ ভগবানই, তিনি এক সৎপ্রকাশক জীবগণের অন্তর্যামী আত্মা। যিনি ভোক্তা রূপে দেহের অন্তরে এবং ভোগ্য রূপে বাইরে অবস্থান করেন। এটি মায়ার খেলা।
ধৃতরাষ্ট্র, ভ্রাতা বিদুর ও ভার্য্যা গান্ধারীর সাথে হিমালয়ের দক্ষিণ দিকে ঋষিদের আশ্রমে গিয়েছেন।
সেখানে স্বধুনী গঙ্গার সাতজন ঋষির প্রতিনিমিত্ত পৃথক পৃথক সাতটি স্রোতে নিজেকে বিভক্ত করেছেন, তাই সেই তীর্থকে সপ্তস্রোত বলা হয়। সেই তীর্থে ত্রিকাল স্নান করে যথা বিধি অগ্নির হোম করে তিনি অবস্থান করছেন। এখন তার মনে কোনো বিষয় বাসনা নেই। তিনি আসন এবং শ্বাস জয় করে ছয়টি ইন্দ্রিয় প্রত্যাহার করেছেন, হরির ভাবনার দ্বারা স্বত্ত্ব রজঃ ও তমোগুণের মালিন্য দূর করেছেন। অহংকারে অস্পদ মনকে বিজ্ঞানাত্মা সংঘবদ্ধ বুদ্ধিতে সংযুক্ত করেছেন। বুদ্ধি অঙ্ক থেকে বিচ্ছেদ করে এক্ষেত্র পাঁচকে এক করেছেন। ঘর ভেঙে গেলে তার উপস্থিত আকাশ যে মন মহাকাশে পরিণত হয়, তেমনই তিনি আত্মাকে পরমাত্মাকে এক করে দিয়েছেন।
হে মহারাজ, যিনি অখিল কর্মসন্ন্যাস করে কৃত্য হয়েছেন, সে ধৃতরাষ্ট্র শ্রেয় প্রতিবন্ধক বিঘ্ন তুমি করো না। আজ থেকে পরবর্তী পঞ্চম দিনে তিনি দেহ ত্যাগ করবেন। সেই দেহ আপনা থেকেই ভস্মীভূত হবে। পর্ণশালার সাথে পতির দেহ দগ্ধ হতে থাকলে পতিব্রতা গান্ধারী পতির উদ্দেশ্যে অগ্নিতে প্রবেশ করবেন। হে করুণানন্দন, বিদুর সেই আশ্চর্য ঘটনা দেখে একাধারে আনন্দিত এবং শোক সঞ্চাত হয়ে তীর্থসেবার জন্য সেখান থেকে চলে যাবেন।
এই কথা বলে নারদ স্বর্গে চলে গেলেন। যুধিষ্ঠির তাঁর কথা শুনে শোক ত্যাগ করলেন।