প্রথম স্কন্দ - চতুর্দশ অধ্যায়

অর্জুনের মুখ থেকে যুধিষ্ঠিরের শ্রীকৃষ্ণের তিরোধান বাক্যশ্রবণ

সূত বললেন– অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের আচরণ এবং অভিপ্রায় জানার জন্য দ্বারকাতে গেলেন। ইতিমধ্যে সাত মাস কেটে গেল অর্জুন দ্বারকা থেকে ফিরে এলেন না। যুধিষ্ঠির ভয়ানক দুর্লক্ষণ দেখতে পেলেন। কালের ভয়াবহ গতি এবং ঋতু ধর্মের বিপর্যয় ঘটে গেল। মানুষেরা ক্রোধ, লোভ এবং মিথ্যাযুক্ত হল, পাপ পথে তারাই জীবিকা নির্বাহ করতে থাকল। পিতা মাতা বন্ধু ভাই পতি এবং পত্নীর মধ্যে নিরন্তর কলহ দেখা দিল। রাজা যুধিষ্ঠির ভীমকে বললেন– বন্ধুদের দেখার জন্য এবং পুণ্যশ্লোক শ্রীকৃষ্ণের মনের বাসনা জানার জন্য অর্জুন দ্বারকাতে গিয়েছে। ভীম, সাত মাস বলে গেল। এখনও পর্যন্ত কেন অর্জুন ফিরে এল না, আমি তা বুঝতে পারছি না। দেবর্ষি নারদ যা বলেছিলেন, সেই সময় কি এখন উপস্থিত হল? ভগবান তাঁর লীলাসাধন করে দেহ পরিত্যাগ করার ইচ্ছা করবেন। তাঁর আনুকূল্যে আম্মদ আমাদের সম্পদ রাজ্য, পত্নী, প্রাণপজ এবং বংশ রক্ষা সম্ভব হয়েছে। হে ভীম, এই দৈহিক দৈবী এবং পার্থিব বিপর্যয় গুলি দেখো। আমার বাম উরু, চোখ এবং বাহু বারবার স্পন্দিত হচ্ছে। হৃদয় কম্পিত হচ্ছে, শৃগাল অগ্নি উদগীরণ করতে করতে সূর্যের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করছে। কুকুর আমাকে লক্ষ্য করে নির্ভয়ে উচ্চস্বরে চিৎকার করে যাচ্ছে। শুভ পশু গাভী আমাকে বামদিকে রেখে চলেছে। অশুভ গদর্ভ আমার ডানদিকে প্রদক্ষিণ করছে। অশ্বগুলিকে ক্রন্দন করতে দেখছি। কপোত মৃত্যুদূতের মতো আমার মনকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। পেঁচা আর কাকের কুৎসিত শব্দ বিশ্বকে শূন্য করতে চাইছে।

হে ভীম, সুর্যের চারিদিকের বেষ্টন ধূম্রবর্ণ হয়েছে। পর্বতের সাথে সাথে পৃথিবীতে কম্পন দেখা দিয়েছে, বিনা মেঘে বজ্রপাতের শব্দ তুমি শুনতে পাচ্ছ না? সূর্য নিস্তেজ হচ্ছে, গ্রহগণের মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেছে। প্রাণী আর ভূতের দ্বারা আকাশ ও পৃথিবী যেন বলছে। মানুষের মনও আলোড়িত৷ এগুলি কী মঙ্গল বিধান করবে, এটা আমরা জানি না। বৎসগণ স্তন পান করছে না। গাভীগণ দুগ্ধ দিচ্ছে না, গোষ্ঠে গাভীগণ অশ্রুমুখে কান্না করছে। বৃষরা আনন্দিত হচ্ছে না। দেবপ্রতিমাগুলিও ক্রন্দন করছে। জনপদ গ্রাম নগর উদ্যান আকর এবং আশ্রমগুলি হতশ্রী হয়ে পড়েছে। তারা কী দুঃখ বহন করছে। আমি জানি না। আমার মনে হচ্ছে, শ্রী কৃষ্ণের ধ্বজ অঙ্কুশ বজ্ৰাদি চিহ্ন বিশিষ্ট বরণের সম্পর্কহীন হয়ে পৃথিবী আজ সৌভাগ্যহীনা হয়েছে।

অমঙ্গল চিহ্ন দেখে যুধিষ্ঠির অনিষ্ট চিন্তা করছিলেন। এমন সময় দ্বারকা থেকে অর্জুন এসে উপস্থিত হলেন। অর্জুন যুধিষ্ঠিরের চরণে প্রণাম করে মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তাঁর দুটি চোখ থেকে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ল। তাকে মলিন দেখে নারদের কথা মনে করে যুধিষ্ঠির সুহৃদদের মধ্যে বলতে শুরু করলেন।

তিনি বললেন– দ্বারকায় আমাদের আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধব সবাই সুখে আছে তো? মাননীয় মাতামহ কুশলে আছেন তো? ভাইয়ের সাথে মাতুল বসুদেবের খবর কী? পরস্পর ভগিনী এবং আমাদের মাতুলানী দেবকী প্রভৃতি বসুদেবের পত্নীগণ পুত্রবধূদের সাথে সুখে আছেন তো? সুষেণ, চারুদেষ্ণ এবং জাম্ববতী নন্দন শাম্ব কুশলে আছেন তো? অপর কৃষ্ণ পুত্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ঋষভ প্রভৃতিদের পুত্রদের সাথে কুশলে আছেন তো? শ্রীকৃষ্ণের অনুচরগণ শ্রুতদেব, উদ্ধব প্রভৃতি অন্যান্য শ্রেষ্ঠ পুরুষগণ সুখে আছেন তো?

ব্রাহ্মণদের হিতকারী এবং ভক্তবৎসল গোবিন্দ দ্বারকায় সুধর্ম সভায় সুখে আছেন তো? বলরামের সাথে সনাতন পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ জনগণের মঙ্গলরক্ষা এবং সৃষ্টির জন্য বিরাজমান তো? সত্যভামা প্রভৃতি ষোলো হাজার মহিষীগণ যাঁর চরণকমল শুশ্রূষায় মোক্ষ ও কর্মবলে মনে করতেন, তিনি কেমন আছেন? যদুবংশের বীরগণ যার বাহুবলে অকুতোভয়ে হয়ে বলপূর্বক স্বর্গ থেকে আনীত দেবতাদের ব্যাবহারযোগ্য সুধর্মা সভাতে বারবার পায়ের দ্বারা স্পর্শ করেছেন, সেই গোবিন্দ কুশলে আছেন তো?

অর্জুন তোমার কোনো পীড়া হয়নি? তোমার শরীরের সেই তেজ কোথায় গেল? তুমি দীর্ঘকাল সেখানে ছিলে। কোনো কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা কি পূর্ণ করতে পারোনি? অন্তরঙ্গ বন্ধু শ্রীকৃষ্ণের বিরহে নিজেকে শূন্য বলে মনে করছ কি? এছাড়া তোমার এমন অবস্থা হতে পারে না।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post