অর্জুনের মুখে যদুকুল সংহার শ্রবণ এবং শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান বার্তা শুনে পাণ্ডবদের হিমালয়ের দিকে মহাপ্রয়াণ
সূত বললেন– মহারাজ যুধিষ্ঠির নানা আশংকা করে অর্জুনের বিষয়ে কল্পনা করছিলেন। অর্জুন কৃষ্ণবিরহে তখন কাতর হয়ে ওঠেন। শোকে তার বাক রুদ্ধ হয়েছে। তিনি নিষ্প্রভ হয়ে ভগবানের চিন্তা করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে শোক সংবরণ করলেন। চোখের জল মুছে ফেললেন। কৃষ্ণের অদর্শনজনিত বিরহে কাতর হয়ে পড়লেন। বারবার কৃষ্ণের কথা অর্জুন বললেন– হে মহারাজ, বন্ধুরূপী হরির সঙ্গ দ্বারা আমি বঞ্চিত হয়েছি। দেবগণেরও আশ্চর্যকর আমার তেজ তিনি অপহরণ করেছেন। দেহ প্রাণহীন হলে তাকে মৃত বলা হয়। যার ক্ষণকাল বিয়োগে এই জগৎ অপ্রিয়দর্শন হয়, অর্থাৎ দেখতে আর ভালো লাগে না, যাঁর সম্যক আশ্রয়ে দ্রুপদ গিয়ে স্বয়ম্বর সভায় সমাগত কামোন্মত্ত নৃপতিদের প্রভাব অপহরণ করেছিলাম, এবং ধনুর দ্বারা মৎস্যকে নিপাতিত করে দ্রৌপদীকে লাভ করেছিলাম, যার সন্নিধানে দেবগণের সাথে দেবরাজ ইন্দ্রকে জয় করে খাণ্ডব বন অগ্নিকে দিয়েছিলাম, সেই খাণ্ডবদাহে ময়দানবকে রক্ষা করার অদ্ভুত শিল্পকলা মণ্ডিত সভা লাভ করেছিলাম, যাঁর কৃপায় আমরা পৃথিবীর রাজাদের পরাজিত করেছি, যাঁর তেজে অজাত অস্থিতুল্য বলবীর্য সম্পন্ন তোমার অনুজ ভীমসেন জরাসন্ধকে বধ করেছিলেন, দুঃশাসন প্রভৃতি দুর্বত্ত গণ রাজসভায় আপনার পত্নীর খোঁপা খুলে কেশ আকর্ষণ করেছিল, যে খোঁপা রাজসূয় যজ্ঞে মহাভিষেক করায় প্রশংসনীয় ও রম্য ছিল,সেই ঘটনা স্মরণ করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সভায় এসে উপস্থিত হন। তাঁর চরণে প্রণাম করার সময় দ্রৌপদী নয়না কৃষ্ণের চরণে পড়েছিল। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভীমের দ্বারা দুঃশাসন প্রভৃতির পত্নীদের বৈধব্য ঘটিয়েছেন, আমাদের বনবাসের সময় শত্রু দুর্যোধনের কৌশলে দশ হাজার শিষ্যের সাথে মুনি দুর্বাসা এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। আমাদের পাক পাত্রে তখন অন্ন ছিল না। অভুক্ত ব্রাহ্মণদের অভিশাপের ভয়ে আমরা বিপন্ন হয়েছিলাম। এই সময় কৃষ্ণ এসে দ্রৌপদীর পাকপাত্র থেকে শাকান্ন ভক্ষণ করে আমাদের রক্ষা করেছিলেন। আহারের আগে স্নান করার সময় জলমগ্ন ঋষিরা পরিতৃপ্ত মনে করে বৃথা আহারের ব্যবস্থা করানো হল, ভেবে ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
যাঁর তেজে দেবীর সাথে শূলপানি শিব যুদ্ধে বিস্মিত হয়ে আমাকে নিজের পাশুপৎ অস্ত্র দিয়েছিলেন। এই দেহেই স্বর্গলোকে দেবরাজ ইন্দ্রের সাথে অর্ধাসন আমি লাভ করেছিলাম। সে স্বর্গে আমি যখন ক্রীড়া করছিলাম, ইন্দ্রের সাথে দেবগণ নিবাগ কবচ নামক অসুরদের বধের জন্য আমার গাণ্ডবী চিহ্নিত বাহু দণ্ড আশ্রয় করেছিলেন, কৃষ্ণের প্রভাবে তা অত্যন্ত শক্তিশালি হয়েছিল।
শ্রেষ্ঠ ভক্তগণ মোক্ষের নিমিত্ত যাঁর চরণ কমল ভজন করেন মন্দমতি সেই ঈশ্বরকে আমি আমার সারথি হিসেবে লাভ করেছিলাম। হে নরদেব, কৃষ্ণের গম্ভীর মৃদু-মন্দ হাসির সাথে মনোজ্ঞ পরিহাস বাক্যগুলি এখনও আমার মনে পড়ছে। তিনি আমাকে পার্থ, অর্জুন, সখে, কুরুনন্দন ইত্যাদি হৃদয়গ্রাহী সম্বোধনের দ্বারা সম্বোধিত করতেন। শয্যা, উপবেশন, ভ্রমণ, প্রশংসা এবং ভোজনাদি কর্মে একত্রে অবস্থান করেছি। এর ব্যতিক্রম হলে হে বয়স্যা তিনি অত্যন্ত সত্যবাদী, এরুপ বক্তব্য তিনি করতেন। পিতা যেমন পুত্রের অপরাধ ক্ষমা করে তেমনই কুমতি আমাদের সকল অপরাধ তিনি সহ্য করেছেন। হে মহারাজ, সেই কৃষ্ণের বিরহে এখন আমি শূন্য গৃহে অবস্থান করছি। শ্রীকৃষ্ণের ষোলো হাজার মহিষী রক্ষার ভার নিয়ে আমি দুর্বত্ত বহুগমের দ্বারা পরাজিত হয়েছি। আমার সেই গান্ডীব ধনুর শর, অশ্বরথ রক্ষার ভার নিয়ে আমি দুবৃত্ত বহুগমের দ্বারা পরাজিত হয়েছি।
আমার সেই গান্ডীব ধনু, শর, অশ্বরথি সবকিছু আজ শক্তিহীন।
মহারাজ, যাদের মঙ্গল চিন্তা করেছেন, তারা বিপ্রসাথে বিমূঢ় হয়ে অন্নময়ী মদিরা পান করে উন্মত্ত চিত্তে একে অন্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে চার পাঁচজন মাত্র অবশিষ্ট রয়েছে। প্রাণীগণ যে পরস্পর পরস্পরকে হত্যা করে বা পালন করে এটি ভগবান পরমেশ্বরের কাজ। জলচর মৎস্যাদির মধ্যে যারা বড়ো মাছ, তারা ছোটো মাছদের খেয়ে ফেলে। বলবান দুর্বলদের এবং বলশালী ব্যক্তি পরস্পর বলশালীদের বিনাশ করে থাকে। বলিষ্ঠ যদু এবং মহৎ পাণ্ডবদের দ্বারা দুর্বলদের বিনাশ করিয়ে ভগবান যদুদের দ্বারা পরস্পরকে হত্যা করিয়ে পৃথিবীর ভার হরণ করলেন।
সূত বললেন– শ্রীকৃষ্ণের চরণ কমল গভীর প্রেমে ধ্যান করতে করতে অর্জুনের চিত্ত বিযুক্ত হয়েছিল। বাসুদেবের চরণ কমলে চিন্তা করে সঞ্জাত ভক্তির দ্বারা বিষয় বাসনা নষ্ট হয়েছিল। যুদ্ধের আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যে উপদেশ দিয়েছিলেন, অর্জুন তা ভুলে গিয়েছিলেন। এখন আবার সেই জ্ঞান তিনি লাভ করলেন, ব্রহ্মজ্ঞানের দ্বারা প্রকৃতির লয় হল। তিনি গুণাতীত হলেন, নাশ হল লিঙ্গ দেব। এবং সূক্ষ্ম দেহের অর্জুন সম্পূর্ণ শোক মুক্ত হলেন।
মহারাজ যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের গতি এবং যদুকুলের নাশ চিন্তা করে স্বর্গপথে যাওয়ার কথা ভাবলেন। কুন্তীদেবীও অর্জুনের কথায় জীবনমুক্তা হলেন। লোকে যেমন পায়ে কাঁটা ফুটলে অপর কাঁটা দিয়ে তা তুলে উভয় কাঁটাকে পরিত্যাগ করে, ঠিক সেই ভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যে দেহে পৃথিবীর ভার হরণ করলেন সেই দেহ পরিত্যাগ করলেন।
ঈশ্বরের কাছে অবতার তনু ও ভূতার মুক্তি উভয়ই সমান। অভিনেতা যেমন নিজ রূপে থেকে নানারূপ ধারণ করে, এবং শেষ পর্যন্ত অন্তর্ধান করে, ভগবান নিজের স্বরূপে থেকে নানারূপ ধারণ করেন এবং ত্যাগ করেন।
যাঁর পবিত্র কথা সকলের শ্রবণ করা উচিত, সেই ভগবান মুকুন্দ নিজের দেহের সাথে পৃথিবী ত্যাগ করলেন। অজ্ঞান লোকের অমঙ্গলের জন্য কলি প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করল। যুধিষ্ঠির সর্বত্র লোভ মিথ্যা হিংসা ছলনা ইত্যাদির প্রভাব দেখতে পেলেন। তিনি তাঁর সুসংযত পৌত্র পরীক্ষিতকে সসগরা ধরিত্রী অর্পিত করলেন। স্বরাজ্য হস্তিনাপুরে তাকে অভিষিক্ত করা হল। রাজা যুধিষ্ঠির অনিরুদ্ধের পুত্র বজ্রকে মুথরার সুরসেন বংশের অধিপতি করলেন। নিজে প্রজাপতি দেবতার যজ্ঞ করলেন। তিনটি অগ্নিতে আত্মাকে সমর্পণ করলেন। রাজোচিত বস্ত্র, অলঙ্কার সবকিছু ত্যাগ করলেন, ক্ষমতা শূন্য এবং অহঙ্কার শূন্য হয়ে বন্ধন ছিন্ন করলেন। এবার বাক্যকে মনে, মনকে প্রাণে, প্রাণকে আপনার কার্য উৎসর্গের সাথে আপনাকে মৃত্যুতে এবং মৃত্যুকে পঞ্চভূতের সমষ্টি দেহে লয় করলেন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি দেহকে স্বত্ত্ব, রজঃ এবং তম, এই গুণত্রয়ে লয় করেন এবং গুণত্রয়তে প্রভৃতিতে লয় করেন। এই সমস্ত কারণে প্রকৃতিতে জীবাত্মাতাতে এবং জীবাত্মাকে অব্যয় ব্রহ্মে লয় করেন। মলিন বসন পরিধান করলেন। নিরাহার ও মৌন হলেন। আলুয়ায়িত কেশে জড় উন্মত্ত পিচের মতো কারও অপেক্ষা না করে বধিরের মতো গৃহ থেকে বহির্গত হলেন। পরব্রহ্মকে ধ্যান করতে করতে উত্তর দিকে গমন করলেন। এই দিকে আগে যারা গেছেন, এবং সেখান থেকে আর কেউ ফিরে আসেন নি।
ভীম প্রভৃতি ভাইয়েরা অগ্রজের মতো গৃহ থেকে বহির্গত হলেন। যুধিষ্ঠির ধর্মাদি বারোটি পুরুষার্থক সম্যক রূপে নির্বাহ করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, শ্রী কৃষ্ণের পাদ পদ্মেই তাঁর আশ্রয়। সকল ভাই ভগবানের ধ্যানচ্যুত ভক্তিতে পবিত্র বুদ্ধি লাভ করলেন।
বিদুরও কৃষ্ণের প্রতি মন অভিনিবিষ্ট করলেন। প্রভাত সূর্যে দেহত্যাগ করলেন। পিতৃগণের সাথে স্বস্থানে গমন করলেন। তখন দ্রৌপদীও ভগবান বাসুদেবের একান্ত মতি হয়ে তাঁকে লাভ করলেন।