প্রথম স্কন্দ - ষোড়শ অধ্যায়

পরীক্ষিতের রাজ্যলাভ, দিগ্বিজয় এবং ধর্ম ও ধরার সংবাদ শ্রবণ

সূত আরও বললেন–হে ব্রাহ্মণ, মহাভাগবত পরীক্ষিত শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের শিক্ষায় পৃথিবী পালন করতে থাকলেন। তাঁর জন্মের সময় জাতককে শাস্ত্রবিদ পণ্ডিতেরা যেসব ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন একে একে তা সবই ফলতে লাগল। তিনি উত্তরের কন্যা ইরাবতাঁকে বিয়ে করলেন। জন্মেজয় প্রভৃতি চারটি পুত্রের জন্ম হল। কৃপাচার্যকে গুরুপদে বরণ করলেন। গঙ্গাতীরে তিনটি অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন করলেন। যজ্ঞে ব্রাহ্মণদের অনেক দক্ষিণা দিলেন। এবার বীর রাজা পরীক্ষিত দিগ্বিজয়ে বের হলেন। কোনো একটি জায়গাতে গোমিথুনকে পায়ের দ্বারা আঘাত করতে রাজচিহ্ন ধারী শুভ্রকে দেখলেন। শুভ্ররূপী কলিকে প্রতাপের দ্বারা নিগৃহীত করেছিলেন।

শৌণক জানতে চাইলেন–হে সুত, রাজা পরীক্ষিত রাজ চিহ্নধারী শুভ্রকে কেবল নিগ্রহ করলেন, কিন্তু বধ করলেন না কেন? সেই কালিন গৃহ যদি বিষ্ণু কথাপ্রিয় হয়, তাহলে বিষ্ণুর চরণ কমলের মধু পানকারী সাধুদের কথাকে আশ্রয় করে থাকলে তবে তা ব্যাখ্যা করুন। অন্য অসৎ কথার আর কী প্রয়োজন?

সুত বললেন– কুরুজঙ্গলে বাস করার সময় যুদ্ধিনিপুণ দেশে কলি প্রবেশ করছে, এই অপ্রিয় কথা শুনতে পেলেন। তিনি ধনুর্বাণ গ্রহণ করলেন। নীলবর্ণ চারটি অশ্বযুক্ত এবং বিজয় সিংহ চিহ্নিত রথে উঠে বসলেন। রথ, অশ্ব, হস্তী এবং পদাতিক, এই চতুরঙ্গ সেনা পরিবৃত হয়ে দিগ্বিজয়ের জন্য নির্গত হলেন।

তিনি পূর্ব, পশ্চিমে, দক্ষিণ এবং উত্তর দিকের বিভিন্ন দেশ জয় করলেন। জয় করলেন ভদ্রাশ্ব, কেতুমাল, ভারত, উত্তর কুড়ুল এবং দক্ষিণ কুড়ুল। মহাত্মা পরীক্ষিত জনপদের জনগণ শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য সূচক নিজ পূর্বপুরুষদের যশগান করছে তা শুনতে পেলেন। অশ্বত্থামার অস্ত্রের থেকে নিজ রক্ষার কথা যাদব ও পাণ্ডবদের পরস্পর বন্ধুত্বের কথা শুনলেন। তিনি পরম সন্তুষ্ট হয়ে তাদের ধন, বস্ত্র এবং আহার দান করলেন। প্রত্যহ তিনি পূর্বপুরুষদের কাজের অনুসরণ করে চলতেন। শীঘ্রই তাঁর জীবনে একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল।

এই সময় বিশ্বরূপধারী ধর্ম নিঃস্ব, বৎসহীনা জলধির মতো রোদনরতা গাভীকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন –হে ভদ্রে, তোমার দেহের মঙ্গল তো? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, মনের পীড়ায় তুমি কষ্ট পাচ্ছো, তুমি নিস্তেজ, তোমার মুখে গ্লানিমা এসেছে। হে বৎস, তুমি কি দুরোচিত কোনো বস্তুর জন্য শোক করছ? এর পর শুদ্ধ উপায়ে রাজারা তোমাকে পালন করবে দেখে শোক করছ কি? অসুরগণ কর্তৃর্ক যজ্ঞীয় ভাগ অপহৃত করার জন্য দেবতাদের জন্য শোক করছ। ইন্দ্র বর্ষণ না করায় প্রজাদের কষ্ট হচ্ছে ভেবে শোক প্রকাশ করছ।

হে পৃথিবী, অতীতের দ্বারা অরক্ষমান স্ত্রীদের জন্য শোক করছ? রাক্ষসকুল পিতৃগণ কর্তৃক অরক্ষিত বালকদের জন্য শোক প্রকাশ করছ?

হে বসুন্ধরা যে জন্য তুমি কৃশ হয়েছ, সেই মানসিক দুঃখের কারণ বলো, পৃথিবী বললেন– ধর্ম, আমাকে যা জিজ্ঞাসা করছ, তা তুমি নিজেই জানো। যে কারণে লোকের শোকাবহ চারটি পাদের দ্বারা তুমি অবস্থান করছিলে, এখন তা আছে কি? শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক পরিত্যাক্ত জনগণের জন্য আমি শোক প্রকাশ করছি। সত্য, শৌচ, দয়া, ক্ষমা, ত্যাগ, সন্তোষ, সরলতা, মনের ধৈৰ্য্য, বহিরিন্দ্রের চিরতা, তপস্যা, সাম্য, পরের অপরাধ সহ্য করা, প্রাপ্তিতে উদাসীন্য, শাস্ত্র বিচার, জ্ঞান, বিরক্ত, ঐশ্বর্য, শৌর্য, তেজ, বল, স্মৃতি, স্বাতন্ত্র, কৌশল, সৌন্দর্য, ধৈর্য, সফলতা, প্রতিভার আতিশয্য, বিনয়, সৎ স্বভাব, মনের শক্তি, জ্ঞানেন্দ্রিয়ের শক্তি, কর্মের শক্তি। ভোগের আম্পাদন-এর স্থৈর্য। শাস্ত্রের বিশ্বাস, যশ, সন্মান এবং গর্বেপর অভাব– এই একচল্লিশটি এবং মহত্ত্বের ইচ্ছাকারী জনগণের প্রার্থনীয় অন্যান্য গুণগুলি শ্রীকৃষ্ণের মহাপ্রলয়েও নষ্ট হয় না। সকল গুণের আধার এবং লক্ষ্মীর বাসস্থান সেই শ্রীকৃষ্ণ এই লোক পরিত্যাগ করেছেন। পাপ কলি পৃথিবীর ওপর দৃষ্টিপাত করছে। তাই আমি শোক প্রকাশ করছি।

— হে দেবশ্রেষ্ঠ নিজের জন্য, আপনার জন্য, দেবতা, ঋষি, পিতৃগণ, সাধু সমস্ত বর্ণ এবং আশ্রমের জন্য আমি শোক প্রকাশ করছি।

–যে স্বতন্ত্র যে হরি অসুর বংশের শত শত অক্ষয়িণী সৈন্য বিনাশ করেছেন, তিনটি চরণে হীন দুঃস্থ করিয়ে যদুদের রমণীয় মূর্তি ধারণ করেছেন, প্রেম পূর্বক অবলোকন, মধুর হাসি, এবং সুমিষ্ট বাক্যের দ্বারা সত্যভামা প্রমুখ মহিষীদের গর্বের সাথে পুরুষোত্তমের বিরহ সহ্য করে? পৃথিবী এবং ধর্ম যখন এই ধরনের কথা বলছিলেন, তখন রাজর্ষি পরীক্ষিত সরস্বতীর কাছে তাঁদের সামনে এসে উপস্থিত হলেন।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post