প্রথম স্কন্দ - সপ্তদশ অধ্যায়

পরীক্ষিত এবং ধর্মের সংলাপ ও পরীক্ষিতের কলিনিগ্রহ

সূত বললেন–রাজা পরীক্ষিত সরস্বতীর তীরে একটি শূদ্রকে দেখতে পেলেন। ওই শূদ্র গোমিথুনকে প্রহার করতে লাগল। মৃণালের মতো শুভ্রবর্ণ বৃষটি শূদ্ৰতাড়িত হয়ে কাঁপতে থাকল। শূদ্রের পদাহত বৎসহীন অবদন, কৃশ, তৃণ ভক্ষণে ইচ্ছুক একটি গাভীকে দেখা গেল। রাজা রথে আরোহণ করলেন। মেঘের মতো গম্ভীর স্বরে স্বর্ণখচিত বেশধারী কলিকে জিজ্ঞাসা করলেন –আমার পালিত এই দেশে বলবান দুর্বলদের আঘাত কেন করছ? নটের মতো রাজবেশ পরিধান করেছ? অথচ কর্মে শূদ্রের মতো, তুমি কে? তুমি বধের যোগ্য। মৃণালের মতো শুভ্র বর্ম তিনটি চরণে হীন হয়ে এক চরণে বিচরণ করছ।

কুরুরাজদের বাহুদণ্ডে সুরক্ষিত এই ভূতল তোমার অশ্রুব্যতীত অন্য কোনো প্রাণীর চোখ থেকে জল পড়েনি। হে, বৃষ, তুমি এখানে শোক করো না, এই শুভ্র থেকে তোমার ভয় দুর করো। হে মা, আমি জীবিত থাকতে তোমার মঙ্গল হবে। হে সাধ্বী, যার রাজ্যে দুবৃত্তের ভয়ে প্রজারা ভীত হয়, সেই প্রমত্ত রাজার কীর্তি, আয়ু, সৌভাগ্য এবং পরলোক সব নষ্ট হয়ে যায়। আর্তদের আর্তি হরণ করা রাজার শ্রেষ্ঠ ধর্ম। অতএব এই দুবৃত্তকে আমি বধ করব। হে বৃষ, তোমার তিনটি পা কে ছেদন করেছে? হে বৃষ। নিরপরাধী, তোমার মঙ্গল হোক। পাণ্ডবদের কীর্তি বিনাশ হোক, কে তোমার অঙ্গ ছেদন করেছে তা নিঃসঙ্কোচে আমাকে বলো। নিরাপরাধকে যে দুঃখ দেয় তাকে আমি হত্যা করবই। অসাধুদের দমন করলে সাধুদের মঙ্গল হয়।

ধর্ম বললেন–পাণ্ডববংশোদ্ভূত তোমাদের এই আর্তদের অভয়প্ৰদবাক্য যুক্তি যাদের গুণসমুহে আকৃষ্ট হয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দৈত্যাদিকর্ম স্বীকার করেছিলেন। হে পুরুষ শ্রেষ্ঠ, যে পুরুষ থেকে প্রাণীদের দেহ উৎপন্ন হয় সে পুরুষকে আমরা জানি না। বিকল্প অর্থাৎ ভেদকে যারা আচ্ছাদন করেন, যোগীগণ বলেন, আত্মাই আমার সুখ এবং দুঃখের কারণ। আধার দৈবজ্ঞ গণ্য বলে থাকেন, গ্রহাদিগমই সুখ দুঃখের কারণ বলে থাকেন। যারা ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করেন, তাঁরা বলে থাকেন বাক্য ও মনের অতীত পরমেশ্বর থেকেই সুখ দুঃখের সৃষ্টি হয়ে থাকে। হে রাজর্ষি এর মধ্যে যেটা তোমার গ্রহণযোগ্য, তা তুমি বিচার করে নাও।

সম্রাট পরীক্ষিত মোহশুন্য হয়ে সমাহিত চিত্তে ধর্মকে বললেন– হে ধর্মজ্ঞ, তুমি ধর্মের কথাই বলেছ। কৃষ্ণরূপধারী তুমিই হলে সাক্ষাৎ ধর্ম। পাপী জনগণের জন্য নরকের স্থান নির্ধারিত হয়েছে। সূচকের অর্থাৎ না জেনে নির্ণয় করলেও সেই গতি হয়। তুমি যে পাপীর নাম করছ না, তার কারণ হল পাপ করলে যে নরক গতি হয়, পাপীর নাম উল্লেখধারীরও সেই পাপ হয়। ভগবানের মায়ার গতি প্রাণীদের বাক্য এবং মনের অগোচর এটা সুনিশ্চিত। সত্যযুগে ধর্মের চারটি চরণ ছিল– তপস্যা, পবিত্রতা, দয়া, এবং সত্য। তার মধ্যে অধর্মের অংশ গর্ব বিষয়ের প্রতি আসক্তি এবং মদ্য পানাদির জন্য মত্ততার দ্বারা ধর্মের তিনটি অংশ নষ্ট হয়ে গেছে, হে ধর্ম, এখন সত্যরূপ অংশটুকু আছে। তা তুমি নিজের দ্বারা রক্ষা করতে পারবে। মিথ্যার দ্বারা বর্ধিত এই অধর্মরুপ কলি তাকেও গ্রহণ করতে চাইছে। ইনি হলেন পৃথিবী। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং গুরুভার নষ্ট করেছেন। একদা তিনি নিজের চরণের স্পর্শে সবদিক দিয়ে পৃথিবীর মঙ্গল করেছিলেন। সাধ্বী এই অধর্মরূপ কলি তাকেও গ্রহণ করতে চাইছে।

ইনি হলেন পৃথিবী। সাধ্বী এই পৃথিবী কৃষ্ণ কর্তৃক পরিত্যক্তা। তিনি চোখের জল ফেলে শোক প্রকাশ করছেন। তিনি ভাবছেন, ভক্তিবিহীন রাজবেশধারী শূদ্ররা তাকে ভোগ করবে। ধর্ম এবং পৃথিবীকে সান্ত্বনা দিয়ে মহারথী পরীক্ষিত খড়গ গ্রহণ করলেন। কলি রাজচিহ্ন পরিত্যাগ করলেন। ভয়ে কাতর হয়ে মহারাজ পরীক্ষিতের চরণমূলে পতিত হলেন। কীর্তিমান দীনবৎসল বীর পরীক্ষিত শরণাগত কলিকে বধ করলেন না। তিনি হাসতে হাসতে বললেন– অর্জুনের যশরথনে ব্যগ্র আমাদের কাছে তুমি কৃতাঞ্জলি হয়েছ। তোমার কোনো ভয় নেই। কিন্তু আমার রাজ্যে তুমি থাকতে পারবে না।

কারণ তুমি অধর্মের বন্ধু। তুমি রাজার দেহে বর্তমান থাকলেও তোমার সাথে সাথে অধর্ম আসবে। আসবে লোভ, মিথ্যা, চুরি, দৌজন্য, স্বধর্মত্যাগ, অলক্ষ্মী, কপটতা, কলহ, এবং অহঙ্কার অর্থাৎ হে অধর্মের বন্ধু কলি ব্রহ্মবর্তে তুমি থাকতে পারবে না। কারণ এদেশে যজ্ঞের কাজে দক্ষ ব্রাহ্মণরা যজ্ঞের দ্বারা যজ্ঞশ্বর হরির বন্দনা করে থাকেন।

সূত বললেন– পরীক্ষিত এই আদেশ করে বললেন, হে সার্বভৌম, আপনার আদেশে আমি যেখানেই বাস করি সেখানেই ধনুর্বাণধারী আপনাকে আমি দেখতে পাব। কারণ আপনি সমস্ত পৃথিবীর সম্রাট। হে ধার্মিক শ্রেষ্ঠ, আপনি সেই স্থান নির্দিষ্ট করে দিন, আপনার আদেশ আমি পালন করতে পারব।

সূত বললেন– কলি এই ধরনের প্রার্থনা করলেন। মহারাজ পরীক্ষিত তাকে এই স্থান গুলি নির্দেশ করলেন–জুয়া খেলা, মদ্যপান, পরস্ত্রীর সখা এবং প্রাণী হিংসা। যে কাজে মিথ্যা, মত্ততা, সঙ্গ এবং শঠতা/ক্রুরতা এই বারো ধরনের অধর্ম থাকে। কলি আবার প্রার্থনা করলে, পরীক্ষিত স্বর্ণ রৌপ্যাদি তার বাসস্থান রূপে দিলেন। তার সাথে দিলেন মিথ্যা, মদ, কাম, রাজঃ, গুণব্যত হিংসা এবং শত্রুতা। অধর্মহেতু কলি পরীক্ষিতের আদেশে তার প্রদত্ত এই পাঁচটি স্থানে বাস করতে লাগলেন।

বৃষ রূপ ধর্মের তপস্যা, পবিত্রতা এবং দয়া, এই তিনটি ভগ্নপাদকে মহারাজ সংযুক্তা করালেন। পৃথিবীকে সান্ত্বনা দিলেন। এখন পরীক্ষিত রাজা উপযুক্ত আসনে আরোহণ করে প্রজাপালন করছেন।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post