ধৃতরাষ্ট্র-পুত্রাদির জন্ম
ভগবান্ ব্যাসদেব বর দিয়াছিলেন যে গান্ধারীর গর্ভে একশত পুত্র জন্মগ্রহণ করিবে। যথাকালে ধৃতরাষ্ট্র হইতে গান্ধারী গর্ভবতী হইলেন, কিন্তু দুই বৎসরেও তাঁহার সন্তান ভূমিষ্ট হইল না। এদিকে কুস্তীর গর্ভে যুধিষ্ঠির জন্মগ্রহণ করিয়াছেন শুনিয়া গান্ধারী অধীরা ও ঈর্ষান্বিতা হইলেন এবং ধৃতরাষ্ট্রের অজ্ঞাতসারে নিজের গর্ভপাত করিলেন। তাহাতে লৌহের ন্যায় কঠিন এক মাংসপিণ্ড জন্মিল। ব্যাসদেবের আদেশে গান্ধারী শীতল জলে সেই মাংসপিণ্ড ডিজাইয়া রাখিলেন। তাহা হইতে অঙ্গুষ্ঠপর্ব্ব পরিমিত একশত একটি ভ্রূণ পৃথক হইল। সেই ভ্রূণগুলিকে পৃথক পৃথক ঘৃত পূর্ণ কলসে রক্ষা করা হইল। ক্রমে তাহা হইতে একশত পুত্র এবং একটি কন্যা জন্মগ্রহণ করে।
দুর্যোধন যেদিন জন্মগ্রহণ করেন, সেই একই দিনে কুস্তীর গর্ভে ভীমও জন্মগ্রহণ করেন। দুর্য্যোধন জন্মমাত্রই গর্দভের ন্যায় কর্কশ কণ্ঠে চিৎকর করিয়া উঠিলেন। তখন গর্দভ, শৃগাল, শকুন, বায়স (কাক) প্রভৃতি অমঙ্গলসূচক জন্তুগণ ভয়ানকভবে চিৎকার করিতে লাগিল। তাহা শুনিয়া মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র ভীত হইয়া বিজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ, ভীষ্ম, বিদূর সকলকে আহ্বান করিয়া পরামর্শ করিলেন। তাঁহারা সকলেই বলিলেন আপনার পুত্র হইতে নিশ্চয়ই কুরুকুল ধ্বংস হইবে। অতএব ইহাকে পরিত্যাগ করাই মঙ্গলজনক।
ত্যজৈনমেকং শান্তিঞ্চেৎ কুলস্যেচ্ছসি ভারত।
একেনৈব কুরু ক্ষেমং কুলস্য জগতস্তথা।।
ত্যজেদেকং কুলস্যার্থে গ্রামস্যার্থে কুলং ত্যজেৎ।
গ্রামং জনপদস্যার্থে আত্মার্থে পৃথিবীং ত্যজেৎ।।
-আদিপর্ব্ব, ১০৯/৩৬-৩৭
-মহারাজ, আপনি যদি বংশের কল্যাণ কামনা করেন, তাহা হইলে এই একটি পুত্রকে পরিত্যাগ করুন। এই এক কার্য্যের দ্বারাই আপনার বংশের ও জগতের উভয়েই মঙ্গল হইবে। কারণ কুলরক্ষার জন্য বংশের একজনকে ত্যাগ করা উচিত; গ্রামরক্ষার জন্য একটি বংশকে (পরিবারকে) ত্যাগ করা সঙ্গত। আর দেশরক্ষার জন্য একটি গ্রামকে ত্যাগ করা শ্রেয় এবং আত্মরক্ষার জন্য পৃথিবীই পরিত্যাগ করা উচিত।
তাঁহারা এইরূপ সদুপদেশ প্রদান করিলেও রাজা ধৃতরাষ্ট্র পুত্রস্নেহবশতঃ তাহা পালন করিলেন না। দুর্য্যোধনের জন্মের একমাসের মধ্যেই ধৃতরাষ্ট্রের অপর উনশত (৯৯ জন) পুত্র এবং দুঃশলা নামে একটি কন্যা জন্মগ্রহণ করে। ইহা ছাড়া এক বৈশ্যা দাসীর গর্ভে যুযুৎসু নামে ধৃতরাষ্ট্রের আরও একটি পুত্রের জন্ম হয়।
ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ সকলেই মহাবীর, অতিরথ, শস্ত্র ও শাস্ত্রনিপুণ হইয়াছিলেন। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র যথাকালে পুত্রগণের বিবাহ দিলেন এবং একমাত্র কন্যা দুঃশলাকে সিন্ধুদেশাধিপতি জয়দ্রথকে সম্প্রদান করিলেন।