গঙ্গাতীরে মহারাজ পরীক্ষিতের প্রয়োবেশন, ঋষি গণের সমাগম
সুত বললেন– মহারাজ পরীক্ষিত নিন্দিত কর্মের কথা চিন্তা করতে থাকলেন। তিনি ভাবলেন, গুপ্ত তেজ সম্পন্ন নিরাপরাধ ব্রাহ্মণের প্রতি তার আচরণ মুখের মতো হয়েছে। ব্রাহ্মণকে অবমাননার দ্বারা তিনি ভগবানকে অবজ্ঞা করেছেন। শীঘ্রই তার বিপদ আসবে। সেটা পাপ গণের প্রতি তাঁর পাপীয়সী বুদ্ধি না হয়।
যখন রাজা পরীক্ষিত এই কথা চিন্তা করছিলেন, তখন তক্ষকের কাছ থেকে নিজের মৃত্যুর কথা শুনলেন। তক্ষকের বিষনলকে উত্তম মনে করলেন, বিষয়াসক্ত তাঁর পক্ষে বৈরাগ্যের কারণ হবে। ইহলোক এবং পরলোক যে হেয়, তা তিনি স্থির করলেন। এখন উভয়কেই পরিত্যাগ করবেন। তিনি গঙ্গা তীরে আমরণ অনশনব্রত গ্রহণ করলেন। মুনিদের মতো প্রশান্ত এবং আসক্তি শূন্য হয়ে একান্ত মনে শ্রীকৃষ্ণের চরণ কমল ধ্যান করতে থাকলেন।
মুনিরা সশিষ্যে সেখানে আসতে থাকলেন। সাধুরা তীর্থ যাত্রার ছলে মলিন তীর্থ গুলিকে নিজেরাই পবিত্র করে থাকেন। এলেন অত্রি, বশিষ্ঠ, চ্যবন, শারদ্বান, অরিষ্ট, নেমি, ভৃগু, অঙ্গীরা পরাশর, বিশ্বামিত্র, পরশুরাম, উতথ্য, ইন্দ্ৰপ্ৰমদ, সুবাহ, মেধা, তিথি, দেবল, অষ্টিষেণ, ভরদ্বাজ, গৌতম, মৈত্রেয় প্রমুখ। মহারাজ পরীক্ষিত তাঁদের পুজো করলেন। তারা সকলে সুখে উপবেশন করলেন। মহারাজ আবার তাদের প্রণাম করলেন।
তার এই কাজ শাস্ত্র সম্মত কিনা তা জিজ্ঞাসা করলেন, সন্ন্যাসীবৃন্দ তার কাজ অনুমোদন করলেন। রাজা বললেন, আমি রাজদের মধ্যে অতি ধন্য, যেহেতু আমার কাজ মহাপুরুষদের অনুমোদন যোগ্য হয়েছে। আপনারা মহত্তম, তাই আমাকে অনুগ্রহ করেছেন। আমি পাপ করেছি। ব্রাহ্মণগণ, আপনারা আমাকে শরণাগত বলে জানবেন। দেবতারূপ গঙ্গাদেবী আমাকে তার শরণাগত বলে জানুক। আমি ভগবান শ্রীকৃষ্ণে আমার চিত্ত স্থাপন করলাম। ব্রাহ্মণদের প্রেরিত কুহক বা তক্ষক আমাকে দংশন করুক। আপনারা বিষ্ণুর কথা কীর্তন করুন। আমি যে জন্মই লাভ করি, সে জন্মই যেন ভগবান হরিতে আমার মতি অক্ষুণ্ণ থাকে। আমি ব্রাহ্মণদের প্রণাম করছি।
রাজা পরীক্ষিত সপুত্র জন্মেজয়ের ওপর রাজ্যের ভার অর্পণ করলেন। গঙ্গার দক্ষিণ তীরে উত্তর মুখ হয়ে কুশাসনে উপবেশন করলেন।
মহারাজ পরীক্ষিত এই ধরনের অনশন করলে স্বর্গের দেবতারা প্রশংসা করতে থাকলেন। পৃথিবীতে পুষ্পবৃষ্টি হতে থাকল। দুন্দুভি গুলি বারবার বাজতে লাগল। লোকের অনুগ্রহ করা যাদের স্বভাব সেই জাতীয় শক্তিশালী সমাগত মহর্ষিরা রাজাকে সাধুবাদ দিলেন, শ্রীকৃষ্ণের গুমের কথা বলতে লাগলেন। তারা বললেন– হে রাজ্যশ্রী শ্রেষ্ঠ, কৃষ্ণের অনুগত আপনার পথে এই প্রায়োবেশন আশ্চর্যের বিষয় নয়। কারণ যুধিষ্ঠির রাজ মুকুট যুক্ত গৌরবান্বিত সিংহাসন পরিত্যাগ করেছিলেন। আমরা গঙ্গাতীরে অপেক্ষা করব। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার দেহ লীন না হবে। ততক্ষণ আমরা এখানে থাকব। এখানে রজঃগুণ নেই এবং কোনো শোক নেই।
মহারাজ পরীক্ষিত বললেন– সত্যলোকে মূর্তিধারী দেবগণের মতো আপনারা নানা স্থান থেকে এখানে এসেছেন। পরের প্রতি অনুগ্রহ করাই আপনাদের স্বভাব। এছাড়া লোকে বা পরলোকে, আপনাদের কোনো প্রয়োজন নেই। হে ব্রাহ্মণগণ, আমি আমার দ্রষ্টব্য বিষয় জিজ্ঞাসা করছি– মরণোন্মুখ ব্যক্তির কী বিশুদ্ধ কর্তব্য কর্ম করণীয় আপনারা তা বিচার করে বলুন।
ব্যাসপুত্র শুকদেব পৃথিবী পর্যটন করতে সেখানে এলেন। কোনো আশ্রমের চিহ্ন সেখানে দেখা যায়নি। তিনি আত্মস্বরূপের উপলব্ধিতে সন্তুষ্ট ছিলেন। বালকরা চারদিক থেকে তাকে অবজ্ঞা সূচক বাক্য বলছিল। তার বেশ ছিল অবধূতের মতো। বয়স ষোলো বছর। হাত, পা উরু, বাহু, স্কন্ধ, কপোল এবং গাত্র মনোরম। চোখ দুটি সুন্দর এবং বিস্তৃত। নাসিকা, গুচ্ছ এবং কর্ণদ্বয় সমান। মুখমণ্ডল সুন্দর কণ্ঠে শঙ্খের মতো তিনটি রেখা, স্কন্ধলগ্ন অস্থিস্থল বিস্তীর্ণ ও উন্নতি নাভি। জলের ঘূর্ণির মতো গভীর তিনটি রেখার দ্বারা মনোরম উদর। তাঁর দিগম্বর কুণ্ঠিত কেশগুলি মাথায় বিক্ষিপ্ত, অজানুলম্বিত বাহু। শ্যাম বর্ণ তার দেহখানি। নবযৌবনবশত দেহের শোভা ঠিকরে চিত্ত আকর্ষণ করছে। তার তেজ গুপ্ত কিন্তু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মুনিরা তাকে অভ্যর্থনা জানালেন।
মহারাজ পরীক্ষিত শুকদেবকে পূজা করলেন। যে সমস্ত স্ত্রী এবং অবোধ বালকরা তাঁকে ঘিরে এসেছিল, তারা নিবৃত্ত হয়ে চলে গেল। শুকদেব মহাসনে উপবেশন করলেন। শুকদেব সেই সভায় ব্রহ্মর্ষি এবং দেবর্ষিদের দ্বারা পরিবৃত হয়েছিলেন। মহারাজ পরীক্ষিত শান্ত চিত্ত এবং সর্বজ্ঞ মুনি শুকদেবের কাছে এলেন। পরীক্ষিত জিজ্ঞাসা করলেন –হে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়ধর্ম আমি আজ মহর্ষি হবার অধিকারী হলাম, আমার কী সৌভাগ্য আপনি কৃপা করে অতিথি হিসেবে আমাকে পবিত্র করলেন।