শুকদেবের উত্তর দান এবং ভগবানের বিরাট রূপ বর্ণনা
শুকদেব বললেন–মানুষের পক্ষে যাঁদের শ্রবণ এবং কীর্তনাদি করা উচিত, তাদের মধ্যে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ তার সম্পর্কে তুমি জানতে চেয়েছ। এ অতি উত্তম প্রশ্ন। কারণ এর দ্বারা লোকের কল্যাণ হবে, হে মহারাজ যারা আত্মতত্ত্ব অর্থাৎ নিজের স্বরূপ জানে না এবং স্ত্রী পুত্রাদিতে অনুরক্ত গৃহমোদী হয়, তাদের মঙ্গলের জন্য হাজার হাজার শুনবার মতো বিষয় আছে। তাদের রাত কাটে স্ত্রী সম্ভোগে, দিন কাটে অর্থ উপার্জনে এবং কুটুম্বের ভরণ পোষণে, নিজের সৈন্যের মতো দেহ স্ত্রী পুত্ৰাদি চিরস্থায়ী হয়
জেনেও তাতে আসক্ত থাকে তারা। তারা অবশম্ভাবী মৃত্যুকে অবলোকন করে না। হে পরীক্ষিত, সেজন্য পথে সকলের আত্মা ঈশ্বর এবং হরিকে সর্বদা শ্রবণ কীর্তণ স্মরণ করা উচিত। আত্মজ্ঞান, অষ্টাঙ্গ যোগ, নিজ বর্ণ ও আশুবিহিত ধর্মের অনুষ্ঠানের দ্বারাই মনুষ্য জন্মের লাভের ফল পাওয়া যায়। মরণ সময়ে নারায়ণের শরণ হল শ্রেষ্ঠ ফল।
এই ভাগবত পুরাণ সকল বেদের সমকক্ষ। দ্বাপরের শেষ ভাগে পিতা বেদব্যাসের কাছে আমি তা অধ্যয়ন করেছি, হে রাজর্ষি, আমি নির্গুণ ব্রহ্মে পরিণিষ্ঠিত লীলা মৃতে আকৃষ্ঠ হয়ে ভাগবত প্রয়াণ অধ্যয়ন করি। তুমি পুরুষোত্তম বিষ্ণুর কৃপা লাভ করেছ। আমি তোমাকে ভাগবত পুরাণ বলব।
মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে মানুষ ভয় শূন্য হয়ে অনাসক্তির পুর শাস্ত্রের দ্বারা নিজের দেহ এবং দেহ সম্বন্ধীয় আশা ছিন্ন করবে। ধীর ব্রহ্মচর্যাদির দ্বারা সংযত পুরুষ গৃহ থেকে বহির্গত হবে। পবিত্র নির্জন স্থানে যথাবিধি কুশ ও মৃগচর্ম অর্থাৎ বস্ত্রা নির্মিত আসনে উপবিষ্ট হবে। অ-কার, উ-কার, এবং ম-কার, এই তিনটি অক্ষরে কথিত ব্রহ্মত্তর মন্ত্র মনে মনে অভ্যাস করবে। একে প্রণবমন্ত্র বলে। প্রণবমন্ত্র জপ করতে করতে প্রাণায়মের দ্বারা জিত শ্বাস হয়ে মনকে স্থির করবে। বুদ্ধিরূপ সারথির সাহায্যে মনের দ্বারা রূপাদি বিষয় থেকে চোখ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণকে সংযত করবে। কর্মের দ্বারা বিক্ষিপ্ত মনকে নিশ্চয়ান্মিক বুদ্ধির দ্বারা পরম মঙ্গলের কারণে ভগবানের রূপ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে ভগবানের চরণাদি এক-একটি অঙ্গের ধ্যান করবে। মনকে বিষয় চিন্তা থেকে মুক্ত করবে। আত্মাকে সমাধিস্থ করবে। মন স্থির হলে আর কিছু চিন্তা থাকবে না। ধীরযোগী রজঃ এবং তম গুণের দ্বারা শান্ত এবং বিমূঢ় মনকে সংযত করবে।
রাজা বললেন–হে ব্রাহ্মণ, কী প্রকারে ধারণা করতে হয় এবং যাতে ধারণা করা সম্ভব তা আমাদের বুঝিয়ে বলুন।
শুকদেব বললেন–স্বস্তিকা দেব আসন এবং প্রাণায়ামের দ্বারা নিঃশ্বাস জয় করবে। আসক্তি রহিত এবং জিতেন্দ্রিয় হবে। ভগবান হরি স্কুল রূপে বুদ্ধির দ্বারা মনকে যুক্ত করবে। ভগবানের এই অতীত, ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান কার্য মাত্র বিশ্ব প্রকাশ পাচ্ছে। সপ্ত আরোহণ যুক্ত ব্রহ্মাণ্ডে জীবের অন্তর্যামী যে ভগবান রয়েছেন তিনি ধারণার বিষয়। এই বিরাট পুরুষের পাদের অধোভাগ রসাতল। মহাতল এই সৃষ্টি কর্তার পদের গুমখাদেশ এবং তলাতল তার দুটি জঙ্ঘা।
বিশ্বমূর্তি ভগবানের জ্ঞান দুটি শীতল এবং বিতাল ও অতল তার রূদ্বয়। পৃথিবী তার জঙ্ঘা বা কটিদেশ, নাভি আকাশ, তাঁর বক্ষস্থল জ্যোতিসমূহ, মর্ত্যলোক গ্রীবা, জনলোক তার বদন। তপলোকে আদিপুরুষ, হিরণ্যগর্ভে ললাট এবং সত্যলোক সহস্র শীর্ষা সেই ভগবানের মস্তক।
ইন্দ্রাদি দেবগণ তার বাহু, দশদিক তাঁর বাহু, দশদিক তাঁর কর্ণর, শব্দ তার চক্ষুর ইন্দ্রিয়, রাত্রি এবং দিন তার নেত্রলোম সত্যলোক অর্থাৎ ব্রহ্মপদ তার ভ্রুকুটি, জল দেবতা করুণ এই আদিপুরুষের তালু এবং রস তার জিহ্বা। বেদসমূহ তার ব্রহ্মরন্ধ্র, যম শ্রেষ্ঠ দন্ত, পুত্রাদির স্নেহলেশ তার দন্ত পংক্তি। জনগণের উন্মাদকারী মায়া তার হাসি, অপার সংসার তার কটাক্ষপাদ। লজ্জা, তার উৰ্দ্ধত্তষ্ঠ লোভ তার অধোরষ্ঠ ধর্ম তাঁর স্নেহ এবং অধর্মের পথ তার পৃষ্ঠ দেশ। প্রজাপতি তার লিঙ্গ বরুণ তার দুটি অন্তকোষ, সমুদ্র তার উদার এবং পর্বত সমূহ তার অস্থিপুঞ্জ।
নেনুপেন্দ্র, নদী তার নাড়ি, ব্রহ্ম তার লোম, অসীম শক্তিশালী বায়ু তার নিশ্বাস, কাল তার গতি এবং সংসার প্রবাহ তার ক্রীড়া। হে কুরশ্রেষ্ঠ অধিপতি মেঘগুলি ঈশ্বরের কেশরাশি, সন্ধ্যা সে ধূমাপুরুষে বদ্ধ, প্রকৃতি তার হৃদয় এবং চন্দ্র তার বিকারের আশ্রয়ভূত মন। মহৎ তত্ত্ব সেই সর্বাত্মার বিজ্ঞান শক্তি ক্ষুদ্র তাঁর অহংকাল। অশ্ব, অশ্বতর উষ্ট্র, এবং হাতী, তাঁর নখ। মৃগ এবং পশুগণ তার কটি দেশ।
মানুষ তার আশ্রয়স্থল, মন তার বুদ্ধি, পক্ষীগণ তাঁর শিল্পনৈপুণ্য, গন্ধর্ব বিদ্যাধর চারণ এবং অঙ্গরা তার স্বর ও স্মৃতি, অসুরসৈন্য তার বল। ব্রাহ্মণ, তাঁর মুখ ক্ষত্রিয় তাঁর বাহু বৈশ্য তার উরু, শুদ্র তার চরণ তিনি বিভিন্ন নামধারী বসু এবং রুদ্র প্রভৃতি দেবগণে পরিবৃত। যজ্ঞ তার কাজ। হে মহারাজ ঈশ্বর শরীরের এই অবয়ব সংস্থানের কথা আমি তোমাকে বললাম। যোগীগণ তার নাম গান করে থাকে। জীব যেমন স্বপ্নে ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনেক দেহকে প্রত্যক্ষ করে, তেমনই সকলের অন্তরাত্মা ঈশ্বর একাকী অনুভব করে থাকেন। ঈশ্বর ভিন্ন অন্যত্র মন আসক্ত হলে নিজের অধঃপতন হবে।