যোগীদের উক্রমণ প্রকার বর্ণন এবং সদ্য মুক্তি ও অমুক্তি নিরুপণ
শুকদেব বললেন– প্রলয় অবসানে আত্মজ্ঞানী ব্রহ্মা এই ধারণার দ্বারা ভগবান হরিকে তুষ্ট করেছিলেন। তিনি পূর্ব কল্পে সৃষ্টি স্থিতি লাভ করেছিলেন। প্রলয়ের আগে এই জগৎ যেমন ছিল আবার তেমনই সৃষ্টি করলেন। বেদ বিহিত কর্মমার্গ সুখমাত্র প্রদর্শন করিয়ে থাকে মানুষের বুদ্ধি সেই ব্যর্থ শর্তাদি সুখের কামনা করে বাসনার সাথে শয়ন করলে মিথ্যা স্বপ্নমাত্র দৃষ্টি হয়। মায়াময় সৃষ্টি হয় মায়াময় সংসারে পরিক্রমণ করে। সেই লোভ ও সুখ প্রাপ্ত হলেও মানুষ প্রকৃত সুখ না করতে পারে না। শরীর ধারণের জন্য যতটুকু দ্রব্যের প্রয়োজন, বুদ্ধিমান ব্যক্তি দ্রব্যের সেইটুকু অংশই গ্রহণ করেন। এতে যথার্থ সুখ নেই জেনে অনাসক্ত হবার চেষ্টা করবেন।
শরীর ধারণের উপযোগী দ্রব্যসকল বিনা চেষ্টাতেও লাভ করতে পারা যায়, তুমি যে সব জায়গাতে আছো। তাতে সুখে নিদ্রা হলে শয়নের জন্য কোমল শয্যার কী প্রয়োজন? স্বয়ংসিদ্ধ দুটি বাহু থাকতে মস্তক স্থাপনের জন্য বালিশের প্রয়োজন আছে কি? অঞ্জলিতে খাদ্যবস্তু রেখে আহার করতে পারা যায়, তবে বিবিধ অনুপাত্রের প্রয়োজন কী? যদি দিগম্বর হয়ে বা বল্কল পরিধান করে দেহ লজ্জা নিবারণ করা যায়, এর জন্যে পট্ট বস্ত্রের কী প্রয়োজন? পথে পথে কি বস্ত্রখণ্ড পড়ে থাকে না? বৃক্ষগুলি কি ফল আর ছায়া দান করে না? নদীসকল কি শুকিয়ে গেছে? পর্বত গুহাগুলির দুয়ার কি বন্ধ হয়েছে? শ্রীকৃষ্ণ তার শরণাগতকে সদা সর্বদা রক্ষা করেন।
কী জন্য বুদ্ধিমান ব্যক্তি অন্ধ জনগণের সেবা করবে? অতএব চিত্তের স্বত্ত্ব সিদ্ধ আত্মা প্রিয় সত্য ও অনন্ত রূপে যে ভগবান বিরাজমান, তারই সেবা করা কর্তব্য। বৈরাগ্যে নিশ্চল হয়ে পরম নিবৃত্তি লাভ করে ভগবানের ভজনে রত হলে সংসার হেতু অবিদ্যার বিনাশ হয়।
অতি বিরল কেউ কেউ নিজের দেহ মধ্যে হৃদয়ের যে আকাশ রয়েছে সেখানে অবস্থিত পদ্মচক্র শঙ্খ গদাধারী চতুর্ভুজ পুরুষের ধারণা স্মরণ করে থাকেন। ওই পুরুষের বদন প্রসন্ন। তার নয়নপদ্মের মতো সুবিস্তৃত। কটি দেশে কদম্ব পুষ্পের কেশরের মতো পীত বর্ণের বস্ত্রের আচ্ছাদন। তার চারটি বাহু মহারত্ন খচিত স্বর্ণ নির্মিত অলংকারের দ্বারা শোভিত। মস্তকে উজ্জ্বল রত্ন খচিত কিরীট স্থাপিত। দুটি কানে কুন্তল বিরাজিত। মহাযোগী বিকশিত হৃদপদ্ম মধ্যে পাদপল্লব স্থাপিত। বক্ষ স্থলের বাম দিকে লক্ষ্মী রেখা যুক্ত। গলদেশে কৌস্তভ রত্নের হার। কটি দেশে মহামূল্য চন্দ্রহার। তার আঙুলে অঙ্গুরীয়চরণে নূপুর এবং মণিবন্ধে কঙ্কন। তার বদন ঈষৎ কুঞ্চিত, নির্মল নীলবর্ণ কুন্তলের অতিশয় শোভমান। তার মুখে হাসি অতি উত্তম আনন্দ পূর্ণ হাসি যুক্ত দৃষ্টিতে উল্লাসিত ভুরু ভঙ্গিতে ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
শ্রীকৃষ্ণের চরণ কমল থেকে বদন পর্যন্ত এক একটি অঙ্গের ধ্যান মনে মনে করবে। যে সমস্ত অঙ্গের ধ্যান করা সহজে হয়ে যাবে, সেই অঙ্গের ধ্যান পরিত্যাগ করে অন্য অঙ্গের ধ্যান করবে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি যতদিন পর্যন্ত প্রেমভক্তির জন্ম না হবে ততদিন নিত্য নৈমিত্তিক কাজের শেষে যত্ন সহকারে বিরাট পুরুষের ধ্যান করা কর্তব্য। হে মহারাজ, সাধক যখন দেহত্যাগ করতে ইচ্ছে করবেন, তখন দেশ এবং কালের অপেক্ষা করবেন না। তিনি শক্তি প্রভৃতি সুখকর আসনে উপবেশন করবেন। প্রাণায়াম করে ইন্দ্রিয়গুলিকে মনের দ্বারা সংযত করবেন। নির্মল বুদ্ধির দ্বারা মনকে সংযত করবেন। বুদ্ধিকে জীবাত্মাতে সংলগ্ন করবেন। শুদ্ধ জীবাত্মাকে পরমাত্মাতে সংলগ্ন করে পরম শান্তি লাভ করবেন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি যোগের কাছ থেকে নিবৃত্ত হবেন। এই জাতীয় পরমাত্মাতে সমাধিযুক্ত যোগীর প্রতি দেবতাগণের নিয়ামক কালও প্রভুত্ব করতে পারবে না, জগতের ওপর যারা প্রভুত্ব করেন সেই দেবতাদের কথা আর কী বলব?
এই যোগীর ওপর সত্ত্ব, রজ ও তম, গুণ এবং অহংকার, প্রভৃতি প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। কিন্তু আত্মা ভিন্ন সমস্ত বস্তুকে উপেক্ষা করে আমিই ব্রহ্ম, এরূপ ধৃষ্টতা পরিহার করে, পরম পূজ্য শ্রী ভগবানের চরণ কমল আলিঙ্গন করে পরম আনন্দে তিনি মগ্ন থাকেন। দেহ অথবা অন্য কোনো বস্তুর প্রতি তার আসক্তি থাকে না। এটাই ভগবানের শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব আচার্যরা মনে করে থাকেন।
দেহ ত্যাগের প্রকার সম্পর্কে বলা হয়েছে –প্রথমে পাদমূলের দ্বারা মূলাধার নিযুক্ত করতে হবে। অক্লান্তভাবে প্রাণবায়ুকে উৰ্বদিকে নাভি প্রভৃতি ছয়টি স্থানে উত্তোলিত করতে হবে। নাভিতে মণিপুরচক্রে আনীত প্ৰাণবায়ুকে হৃদয়ে অনাহুত চক্রে আনতে হবে। উদানবায়ুর সাহায্যে কণ্ঠদেশের নীচে বিশুদ্ধ চক্রে তাকে নিয়ে যেতে হবে। এবার জিত চিত্ত মুনি বুদ্ধির দ্বারা বিকাশ করে সেই বায়ুকে তালু মূলে অর্থাৎ বিশুদ্ধ চক্রের অগ্রভাগে নিয়ে যাবেন। কান চোখ, নাসিকাদ্বয় এবং মুখ, এই সাতটি প্রাণ বায়ুর পথকে নিমুক্ত করবেন। অর্থাৎ অন্য কোনো লোকে যাবার ইচ্ছে না থাকলে প্রাণ মূল থেকে প্রাণবায়ুকে ক্রুদ্বয়ের মধ্যে আজ্ঞা চক্রে নিয়ে যাবেন। কিছুক্ষণ থেকে অকুণ্ঠ দৃষ্টিতে ব্রহ্মকে লাভ করবেন। ব্রহ্মার ভেদ করে দেহ এবং ইন্দ্রিয় ত্যাগ করবেন।
সদ্য মুক্তির কথা এইভাবে বলা হল। এবার ক্রম মুক্তির কথা এইভাবে বলা হয়েছে। হে রাজন, যদি কোনো যোগী ব্ৰহ্মপদ অথবা অণিমাদি আটটি ঐশ্বর্য যুক্ত সিদ্ধগণের বিহারভূমি কিংবা ব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোথাও যেতে ইচ্ছাপ্রকাশ করেন, তা হলে মন এবং ইন্দ্রিয়গণের সাথেই ভ্রমণ করবেন। বায়ুর মধ্যে সূক্ষ্ম শরীর রেখে মহাযোগীরা ত্রিভুবনের বাইরে এবং ভেতরে ভ্রমণ করতে পারেন। যে সমস্ত যোগীরা উপাসনা, তপস্যা, যোগ এবং জ্ঞান সাধন করে থাকেন তারা এই গতি প্রাপ্ত হন। কর্মের দ্বারা এই গতি হয় না। যোগী ব্রহ্মালোকের পথে জ্যোতির্ময় সুষম্না নাড়ির দ্বারা আকাশ মার্গ দিয়ে অগ্নিলোকে প্রবেশ করবেন। নির্মল দেহ উদ্ধাস্থিত উঠে নারায়ণের অধিষ্ঠিত শিশুমায়ের মতো জ্যোতিষ চক্রে যাবেন, পরবর্তী পর্যায়ে যোগী বিশ্বের নাভিস্বরূপ বিষ্ণুর সম্বন্ধি শিশুমার চক্র নির্মল লিঙ্গ শরীর দ্বারা অতিক্রম করবেন। অন্যের নমস্কৃত এবং ব্রহ্মবিদ ঋষিগণের বাসস্থান মহললোকে গমন করবেন। সেখানে কল্পকালজীবি ভৃগুমহা আনন্দে অবস্থান করছেন। কল্পান্তে যোগী অনন্তদেবের মুখাগ্নিতে সমস্ত জগৎ দগ্ধ হতে দেখবেন। দ্বিপরাধব্যাপী স্থিত, সিদ্ধেশ্বরগণের মত্যলোকে গমন করবেন। যারা ভগবানের ধ্যানরূপ করতে পারেন না। তাঁদের বার বার মনুষ্য জন্মের কষ্ট স্বীকার করতে হয়। তাদের এই দুর্গতি দেখে ব্রহ্মলোক বাসী মহাপুরুষরা তাদের প্রতি শোক প্রকাশ করে থাকেন। এছাড়া সেখানে কোনো কারণেই শোক জরা মৃত্যু দুঃখ বা ভয় নেই।
এবার যোগী সূক্ষ্ম শরীর লাভ করেন। নির্ভয়ে পৃথিবীর জল এবং অগ্নিমূর্তি হয়ে বায়ুমূর্তি হন। তারপর আকাশ মূর্তি হন। ভোগ শেষ হলে পরমাত্মা মূর্তি হন। পরে যোগী ঘ্রাণেন্দ্রিয় অবলম্বন করে। গন্ধ, তন্মাত্র রসনেন্দ্রিয়ের দ্বারা ত্বগিন্দ্রেয়ের রস সৃষ্টির দ্বারা রূপ, ত্বগিন্দ্রেয়ের দ্বার বায়ু শ্রোত্রের দ্বারা শব্দ তন্মাত্র এবং প্রাণকে অবলম্বন করে সমস্ত কর্মকে পেয়ে থাকেন। যোগীর সূক্ষ্ম ভূত এবং ইন্দ্রিয় গণের লয়ের স্থান মনোময় ও দেবময় অহঙ্কারকে পেয়ে থাকেন। তাই তিনি অহংঙ্কারের সাথে মহৎ তত্ত্ব লাভ করেন। এখানে গুণ সকলের হয়। তিনি প্রকৃতি তত্ত্ব প্রাপ্ত হন। প্রকৃতি হয়ে হন আনন্দময়, উপাধি গুলি শেষ হলে নির্বিকার আনন্দরূপ পরমাত্মাকে লাভ করেন। হে মহারাজ, ওই যোগী আর কখনও জগতে ফিরে আসেন না। তিনি ভগবত গতি প্রাপ্ত হন।
হে মহারাজ সৃষ্টির প্রথম ব্রহ্মার আরাধনায় তুষ্ট হয়ে ভগবান নারায়ণ তাকে দুটি পথের কথা বলেছিলেন। এই দুটি পথ অর্থাৎ উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণায়ণের কথা বেদে বলা হয়েছে। তুমি এ দুটি পথের কথা প্রশ্ন করেছিলে, দুটি পথ সনাতন অর্থাৎ নিত্য এ সংসারে ভ্রমণকারী জীবের এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই। যার দ্বারা ভগবান বাসুদেবের প্রতি পরাশক্তি লাভ হয়ে থাকে।
ভগবান ব্রহ্মা একাগ্রে চিত্তে তিনবার বেদ পর্যালোচনা করে ভক্তিযোগের কথা বলেছেন। ভক্তিযোগের দ্বারা হরির প্রতি ভালোবাসা জন্মায়।
যদি বল অনুভূত পদার্থে রতি হয়, তাহলে অ-অনুভূত ভগবানে কী ধরনের আসক্তি জন্মাবে?
এর উত্তরে বলা হয়েছে –ক্ষেত্রজ্ঞ এবং অন্তর্যামী হিসেবে ভগবান হরি সমস্ত প্রাণীতে দৃষ্ট হতে পারেন। ব্রহ্মাদি দর্শন স্রষ্টা ব্যাতিরেকে হতে পারে না। বুদ্ধাদি করণ হেতু কর্তার অধীন। এই অনুপপত্রী এবং অনুমাপক বিবিধ লক্ষণ দ্বারা ঈশ্বর স্বতন্ত্র কর্তা। হে মহারাজ, সমস্ত লোকে সব জায়গায় সব সময় এবং সকল প্রকারে ভগবান হরিকে স্মরণ করা উচিত। হরির কথা শ্রবণ, কীর্তন ও আলোচনা করা উচিত। হে সকল সৌভাগ্যশালী জন সাধুগণের আত্মার মতো প্রিয় ভগবান হরির কথারূপ অমৃতপান করেন, তারা ভগবানের চরণ কমলের কাছে গিয়ে উপনীত হতে পারেন।