বিভিন্ন কামনা পূর্তির জন্য নানা দেবতার উপাসনা বর্ণন
শ্ৰী শুকদেব বললেন–হে মহারাজ, তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলে যে, বিবেকী মানুষদের করণীয় কী? তার উত্তর দেওয়া দিচ্ছি গো। যিনি ব্রহ্মতেজ কামনা করেন, যিনি দেহের প্রচারক ব্রহ্মার উপাসনা করবেন। ইন্দ্রিয়ের শক্তি কামনাকারী ইন্দ্রের এবং পুত্রকামনাকারী প্রজাপতি দক্ষাদির উপাসনা করবেন। যিনি শরীরের সৌন্দর্য কামনা করবেন যিনি দেবী দুর্গার উপাসনা করবেন। তেজস্বী হবার কামনা থাকলে অগ্নির উপাসনা করতে হবে। ধনর্ষি হলে অষ্টবসুদের প্রার্থনা করতে হবে এবং প্রভুত্ব কামনায় রুদ্রদের উপাসনা করতে হবে। ভষ্য ও ভোজ্য কামনায় অদিতিকে, স্বর্গ কামনায় আদিত্যদের, রাজ্য কামনায় বিশ্বদেবগণের এবং প্রজাদের মঙ্গল কামনায় জনস্বার্থ গণের অর্চনা করবেন। যিনি আরোগ্য কামনা করেন, তাকে অশ্বিনীকুমার-দ্বয়ের পূজা করতে হবে। পুষ্টিকাম ব্যক্তি ইলা, এবং পৃথিবী দেবীকে ও প্রতিষ্ঠাকামী ব্যক্তি লোকমাতা স্বর্গ ও পৃথিবীর ভজনা করবেন। সৌন্দর্যের প্রার্থী হলে গান্ধবদের পূজা করতে হবে। যজ্ঞপতি বিষ্ণু যশের কামনা পূরণ করেন। বরুণ অর্থের কামনা পূরণ করেন। বিদ্যার কামনা হলে শিবকে তুষ্টি করতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর সুখের কামনায় ভগবতী দেবীর উপাসনা করা উচিত। ধর্মর্ষিরা বিষ্ণুর, পুত্রকামী পিতৃ-পুরুষদের, রক্ষকামনায় যজ্ঞ এবং বলোভের কামনা থাকলে মরুগণের উপাসনা করা উচিত। রাজ্য কামীরা মনুকে প্রার্থনা করবেন, শত্রুবধ ‘কামনায় রাক্ষসদের, বিষয় কামনায় চন্দ্রের এবং বৈরাগ্য কামনায় ভগবানের উপাসনা করবেন।
মহারাজ, যিনি উদার বুদ্ধি এবং ভগবানের একান্ত ভক্ত, তার কামনা থাকুক অথবা না থাকুক তিনি একাগ্রচিত্তে নারায়ণের ধ্যান করবেন। তিনি যে দেবতারই উপাসনা করুন না, যদি ভগবানের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি জন্মায়, তবে তা হবে পরম পুরুষার্থ লাভ। হরিকথা শুনলে ভগবত তত্ত্বের জ্ঞান হয়। মন প্রসন্ন হয়। হরি কথা শুনলে বিষয়ে বৈরাগ্য জন্মায়। এই বৈরাগ্য মোক্ষলাভের নিশ্চিত পথ। তারপর ভগবানের প্রতি গভীর ভক্তি শ্রদ্ধার উদ্রেক হয়।
শৌণক বললেন, মহারাজ পরীক্ষিত একথা শুনে ব্যাসপুত্র শুকদেবকে আর কী জিজ্ঞাসা করে ছিলেন। আমরা হরিকথা শুনতে ইচ্ছুক। ভাগবতগণের সভাতে যে কথাই হোক, তার ফল হরি কথাই হবে। পাণ্ডুবংশধর ভগবত ভক্তরাজা পরীক্ষিত ছোটো বেলায় খেলার সময় কৃষ্ণবিষয়ক খেলা খেলতেন। ভগবান ব্যাস দেবপুত্র শুকদেবও বাসুদেব পরায়ণ, তাদের মিলনে শ্রী কৃষ্ণের গুণ কীর্তনই হবে। ভগবত কথায় যে সময় অতিবাহিত হয় তাই সার্থক। প্রতিদিন সূর্যোদয় এবং অস্ত, গমনের দ্বারা জীবের আয়ুরথ হরণ করে। বৃক্ষগুলি কি জীবিত থাকে না? কর্মকারের অগ্নি বায়ু সঞ্চারের যন্ত্র কি নিশ্বাস প্রশ্বাসের কাজ করে না? গ্রাম্য পশু কুকুর বিড়াল তাহার ও স্ত্রীর সঙ্গ করে না? এই কাজগুলি করলে জীবন সার্থক হয় না।
শ্রী কৃষ্ণ নাম যার কর্ণ কুহরে প্রবেশ করেনি, কুকুর, বিষ্ঠাভোজী –শুকর কন্টক ভোজী উট এবং ভারবাহী গর্দভের মতো। যে কান ভগবানের কথা শ্রবণ করে না, সে দুটি গর্ত মাত্র। হে সূত, যে জিভ ভগবানের নাম উচ্চারণ করেনা, তা ভেকের তুল্য, যে মাতা মুকুন্দের চরণ কমলে প্রণাম করে না, তা উষ্ণীষ ও মুকুটে শোভিত হলেও কেবল ভারমাত্র। যে দুটি হাত হরির পূজা করেনা, তা উজ্জল সূবর্ণ কঙ্কনে ভূষিত হলেও মৃত ব্যক্তির হাতের মতো। মানুষের দুটি চোখ যদি বিষ্ণুর মূর্তি দর্শন না করে তাহলে তা ময়ূর পুচ্ছের চোখের মতো। যে দুটি পা শ্রীহরির পূণ্য ক্ষেত্রে গমন করেনা, তা গাছের গুঁড়ির মতো ব্যর্থ।
যে মরণশীল মানুষ ভক্তের চরণধূলি কখনও নিজ অঙ্গে ধারণ করে না, সে বেঁচে থাকলেও শবতুল্য, অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির মতো। যে হৃদয় পাষাণের মতো কঠিন, হরিনাম শ্রবণ কীর্তনেও সে হৃদয়ে বিকার হয় না। যদি বিকার হয়, তাহলে নয়নে অশ্রু এবং গায়ে শিহরণ দেখা দেবে। হে প্রিয়, তুমি আমাদের অনুকূল মনোরম কথা বলেই এখন বলল, আত্মবিদ্যা বিশারদ ব্যাস নন্দন কী বলেছিলেন।