দ্বিতীয় স্কন্দ - চতুর্থ অধ্যায়

 রাজার সৃষ্টি বিষয়ক প্রশ্নও শুকদেবের মঙ্গলাচরণ পূর্বক শ্রীমদ ভাগবত কথা শুরু করলেন। সূত বললেন– পরীক্ষিত, শুকদেবের আত্মতত্ত্ব নিয়ামক বাক্য শ্রবণ করলেন। তিনি শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা অর্পণ করলেন। তিনি স্ত্রী-পুত্র গৃহ, গৃহ হস্তি, অশ্ব, ধন রত্ন বন্ধুবর্গ এবং রাজ্যের আসক্তি ত্যাগ করেছিলেন। হে মহাত্মাগণ, আপনারা আমাকে যা জিজ্ঞাসা করছেন, মহাত্মা পরীক্ষিতও সেই প্রশ্ন করেছিলেন। নিজের আসন্ন মৃত্যু জেনেও তিনি ভগবান বাসুদেবের প্রতি আসক্তি যুক্ত হয়েছিলেন।

পরীক্ষিত বললেন–হে নিষ্পাপ ব্ৰহ্মণ! অদ্ভুতকর্মা ভগবান হরির কাজ পণ্ডিতদেরও দুজ্ঞেয় বলে মনে হয়। এক ভগবান পুরুষ রূপে থেকেই একসঙ্গে ব্রহ্মাদি দেবতাদের জন্মগ্রহণ পূর্বক বহুকর্ম করেছেন। ভগবানের সৃষ্টি লীলা সবিস্তারে বর্ণনা করে আমার সন্দেহ দূর করুন। আমি জানি, আপনি যেমন বেদাদি শাস্ত্রে কুশল তেমন ভাবেই পরব্রহ্মতত্ত্বে অভিজ্ঞ।

সূত বললেন, মহারাজ পরীক্ষিত বিশেষ ভাবে অনুরোধ করায় শুকদেব ভগবানকে স্মরণ করে বলতে শুরু করলেন,

শ্ৰী শুকদেব বললেন–প্রপঞ্চ জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় রূপ লীলা করার জন্য যিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর মূর্তি ধারণ করে রজঃ স্বত্ব ও তম গুণ সম্পন্ন হন, সেই ভগবানকে প্রণাম করি। তিনি সাধুদের পালক, কুযযাগীদের দুজ্ঞেয় অর্থাৎ তাদের কাছ থেকে দূরে অবস্থান করেন, যিনি অসাম্য এবং নিরতিশয় ঐশ্বর্যের দ্বারা আনন্দময় স্বরূপে বিহার করেন, তাঁকে প্রণাম। যাঁর নাম, রূপ, গুণ এবং লীলাবলীর কীর্তন শ্রবণ স্মরণে সকল জীবের পাপ সমূহ বিনষ্ট হয়, সেই সুমঙ্গল কীর্তি ভগবানকে নমস্কার, বিবেকী জনগণ যার চরণে সেবার দ্বারা ইহলোক ও পরলোকের মনে আসক্তি পরিত্যাগ করে তাকে প্রণাম। তপস্বী, জ্ঞানী, কখী দহনশীল, যশস্বী, মনস্বী যোগী মন্ত্রবিদগণ তাদের নিজ নিজ কর্ম যাকে সম্পূর্ণ না করে কোনো মঙ্গল লাভ করতে পারেন না, সেই সুমঙ্গল কীর্তির ভগবানকে নমস্কার।

কিরাত, হূণ, অন্ধ্র, পুলিন্দ, পুকস, আভীর, শুভ্র, যবন প্রভৃতি জন্মগত পাপী এবং অপর কর্ম বংশ পাপী যে ভগবানের চরণ আশ্রয় করে শুদ্ধ হয়েছেন, সেই ভগবানকে প্রণাম করছি। তিনি আত্মদর্শী, মহাপুরুষদের আত্মা, যিনি ঈশ্বরেরও ঈশ্বর তিনি বেদজ্ঞ কর্মকাণ্ড স্মৃতি শাস্ত্রজ্ঞ ধর্মকর্ম এবং উপাসনা কাণ্ডের দ্বারা প্রকাশিত হয়ে থাকেন। ব্রহ্মা, শঙ্কর প্রভৃতি দেবতাগণ যাঁর স্বরূপ নিশ্চিতরূপে নিরুপণ করতে পারেন না, সেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রসন্ন হোন। তিনি সর্বসম্পদের অধিষ্ঠাত্রী মহালক্ষ্মী দেবীর পতি। তিনি যোগ্য পতি, অর্থাৎ সমস্ত সাধনের ফলদাতা। তিনি সকল লোকের প্রতি পালক তিনি অন্তর্যামী এবং ত্রিভুবনের পালক। তিনি পৃথিবীর পালক। অন্ধক, বিষ্ণুও সাত্ত্বিকদের পালক ও রক্ষক। ভক্তদের প্রতিপালক তার প্রতি আমার আস্থা অপরিসীম। মহাপুরুষরা যাঁর চরণে ধ্যানরূপ সমাধির দ্বারা পরিশীলিত বুদ্ধিতে আত্মতত্ত্ব দেখে থাকেন, সগুণ নিগুণ প্রকৃতির দ্বারা তাঁকে প্রকাশ করে থাকেন। উনি ভগবান মুকুন্দ অর্থাৎ মুক্তিদাতা। উনি যেন আমার প্রতি প্রসন্ন হন। সৃষ্টির প্রথমে ব্রহ্মার হৃদয়ে উনি সতীর স্মৃতি প্রকাশ করেছিলেন। ঐশ্বর্যপূর্ণা বেদরূপা সরস্বতী ব্রহ্মার বদন থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন তার দ্বারা ব্রহ্মার চতুর্মুখ থেকে বেদবাণী প্রকাশ পেয়েছিল। জ্ঞান প্রদাতা ঋষিদের আচার্য ভগবান আমাদের প্রণাম গ্রহণ করুন।

যে প্রভু আকাশ ইত্যাদি পঞ্চ মহাভূত দ্বারা প্রাণীদের শরীর সৃষ্টি করেন, তার মধ্যে অন্তর্দেহী রূপে বাস করেন, তাকে প্রণাম। এই জন্য তাঁকে পুরুষ বলা হয়। তিনি একাদশ ইন্দ্রিয়, পঞ্চমহাবৃত স্বরূপ ষোড়শ কলার প্রকাশক হয়ে তাদের পালন করেন। সেই ভগবান আমার বাক্যকে অলঙ্কৃত করুন। ভক্তগণ যাঁর মুখপদ্মের জ্ঞানময় মধু পান করেছিলেন, সেই বেদব্যাসকে নমস্কার করছি। হে মহারাজ, দেবর্ষি নারদ, ব্রহ্মার কাছে প্রশ্ন করায়, তিনি এই কথাই নারদকে বলেছিলেন।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post