ব্রহ্মার সৃষ্টাদি বর্ণন ও হরিলীলা কীর্তন
ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের কাহিনি শুনতে চাইলে পদ্মযোনি ব্রহ্মা দেবর্ষি নারদকে বললেন–হে নারদ, যিনি সকলের স্রষ্টা, ঈশ্বর, নির্বিকার এবং অন্তর্যামী, যাঁর প্রকাশে চন্দ্র, সূর্য, অগ্নি, নক্ষত্র, গ্রহাদি জগৎ আলোকিত করে, সেই ভগবান নারায়ণ থেকে আমার সৃষ্টি। সেই পরমেশ্বরের কথাতেই প্রেরিত হয়ে তারই সৃষ্ট জগতের সৃষ্টি করে থাকি। সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই গুণ তিনটির দ্বারা যার গতি নিরূপণ করা যায় না, সেই ভগবান হরি আমাদের সকলের প্রভু। মায়ার অধীশ্বর ভগবান মায়ার দ্বারা ইচ্ছা করে নিজেতে সূক্ষ্মভাবে অবস্থিত কালকে এবং জীবাত্মাতে সূক্ষ্মভাবে অবস্থিত অদৃষ্ট ও স্বভাবকে স্বেচ্ছায় সৃষ্টির জন্য অঙ্গীকার করেছিলেন। সেই ভগবান কালে অধিষ্ঠিত হলেন কাল থেকে গুণ ক্ষোভ হয়। গুণের সাম্যভাব পরিত্যক্ত হলে সৃষ্টির জন্য উন্মুখতা জন্মায়। স্বভাবে অধিষ্ঠান করলে রূপান্তর এবং জীবের অদৃষ্টে অধিষ্ঠিত হলে মহতত্ত্বের উৎপত্তি হয়।
কাল ও স্বভাব দ্বারা বিকার প্রাপ্ত হয়ে রজোগুণ ও সত্ত্বগুণে বর্ধিত হলে তা থেকে তমোগুণ লাভ হয়। তাকে বলে অহংকার তত্ত্ব, যা ভূত ইন্দ্রিয় ও দেবতা নামে চিহ্নিত। এই তত্ত্ব আবার রূপান্তরিত হয়ে বৈকারিক, তেজস ও তামসে পরিণত হয়েছে। পঞ্চভূতের তামস অহংকার বিকার প্রাপ্ত হয়ে আকাশের উৎপত্তি হয়েছে এবং এর ফলে সৃষ্টিকারী শব্দ আকাশের সূক্ষরূপ গুণ; আকাশ থেকে বায়ু, বায়ু থেকে প্রাণ, ওজঃ সহ এবং জল সৃষ্টি হয়েছে।
স্পর্শ ও শব্দ যুক্ত হয়ে উৎপন্ন হয়েছে অগ্নি। অগ্নি থেকে জলের সৃষ্টি এবং তা থেকে পৃথিবীর জন্ম।
সাত্ত্বিক অহংকার বিকার প্রাপ্ত হলে তা থেকে মন এবং বৈকারিক সাত্ত্বিক দশ ইন্দ্রিয়ের দশ অধিষ্ঠাত্রী দেবতা উৎপন্ন হয়েছে। ভগবানের শক্তি দ্বারা পঞ্চ মহাভূত ইন্দ্রিয় সকল মন ও গুণগুলি একত্রিত মিলিত হয়ে সমষ্টি ও ব্যষ্টি স্বরূপ এই জগৎ সৃষ্টি হয়। বহু সহস্র বছর পরে কাল কর্ম ও স্বভাবে অধিষ্ঠিত হয়ে পরমেশ্বর অচেতন ব্রহ্মাণ্ডে চেতনা দান করেন।
সেই পরমেশ্বর অণ্ড থেকে বেরিয়ে হাজার মস্তক, হাজার বদন, হাজার চোখ, হাজার বাহু, হাজার উরু ও চরণ বিশিষ্ট হয়ে এই অণ্ড পৃথক করার অভিলাষ করেন। মনীষীগণ ধারণা করে থাকেন, তাঁর জঙঘা থেকে ঊধ্বাঙ্গ পর্যন্ত সাতটি উধ্বলোক এবং জঙঘা থেকে নিম্নাঙ্গ সাতটি অধোলোকের সৃষ্টি করেছে। পরমেশ্বরের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য এবং চরণ থেকে শূদ্রের জন্ম।
পরমেশ্বরের চরণ থেকে কটি পর্যন্ত অবয়বে পাতাল থেকে ভূর্লোক পর্যন্ত সপ্তলোক নাভিতে ভুবর্লোক, হৃদয়ে স্বর্গলোক, ব্রহ্মঃস্থলে মহলোক, গ্রীবাতে জনলোক, স্তনদ্বয়ে তোলোক, এবং মস্তক সকলে সত্যলোক –এইভাবে ত্রিলোকের কল্পনা করা হয়েছে।