বিরাট পুরুষের বিভূতির বর্ণনা
সেই বিরাটরূপী ভগবানের মুখ থেকে তাঁর অধিষ্ঠাত্রী দেবতা অগ্নির উৎপত্তি হল। তার ত্বক সাত ধাতু ও সাত ছন্দের সৃষ্টি করেছে। তার জিহ্বা থেকে তিন প্রকারের অন্ন, এবং তার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা বরুণের উৎপত্তিস্থল। তার নাসিকাদ্বয় বায়ুর পরম আশ্রয়, যা সকল প্রাণীর প্রাণ। তার শরীর সমস্ত বস্তুর সারাংশ ও সৌভাগ্যের উৎপত্তি স্থান।
বিরাট পুরুষের রোমরাজি উদ্ভিদ জাতির আশ্রয়স্থল। তার চরণ শরণ ও সকল বরের আশ্রয় জল, শত্রু, বিশ্ব সৃষ্টি মেঘ ও প্রজাপতির উৎপত্তিস্থল লিঙ্গ। তার পৃষ্ঠদেশ পাপ ও অবিদ্যার জন্মস্থান।
তার হৃদয় সমস্ত প্রাণীর লিঙ্গদেহের আস্পদ।
বিরাট পুরুষের মন সকলের মনের জন্মদাতা। সেই পরম পুরুষ তার দেহ এবং ব্রহ্মাণ্ডের ভেতর ও বাইরে সমস্ত বস্তুকে প্রকাশ করেছেন। তিনি অমৃত ও অভয়ের অধিশ্বর। তিনি নিজানন্দ অনুভব করে থাকেন, তাই তার মাহাত্ম অনুধাবন করা অত্যন্ত দুষ্কর। তিনি মহলোকের উপরিতল তিনলোকের মস্তক স্থানীয় জনলোকে অমৃত, তপোলোকে অভয় সুখ নিহিত রেখেছেন। প্রপঞ্চের বাইরে ভগবনের তিনটি পাদ অংশে নৈষ্ঠিক, ব্রহ্মচারী বাণপ্রস্থ ও সন্ন্যাসীদের বাসস্থান। আর ত্রিলোকের মধ্যে গৃহস্থদের বাস। কর্মের পথ দক্ষিণ এবং মোক্ষের পথ উত্তর– এই উভয় পথেই এই সর্বব্যাপী ক্ষেত্রজ্ঞ পুরুষ। বিচরণ করেন।
ভূত, ইন্দ্রিয় ও গুণাত্মক বিরাট দেহ থেকেই ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি, পরমেশ্বর নিজ ধামে থেকে জগতের ওপরে প্রভাব বিস্তার করেন।
ব্রহ্মা বললেন–শ্রীহরির নাভি কমল থেকে আমার উৎপত্তি। পরমেশ্বরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছাড়া যজ্ঞের কোনো উপকরণ দেখতে পাইনি। তার দেহ থেকে যজ্ঞের উপকরণগুলি সংগ্রহ করে তাই দিয়েই ঐ যজ্ঞ পুরুষের উপাসনা করেছিলাম। তার দ্বারা নিযুক্ত হয়ে আমি সৃষ্টি করি। তার বশীভূত হয়ে রুদ্র সংহার করেন এবং সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়–এই তিনটির শক্তি যুক্ত পরমেশ্বরের বিষ্ণুরূপে পালন করেন।
কার্য ও কারণাত্মক যা কিছু সৃষ্টি করার আছে, তা ভগবান নারায়ণ থেকে পৃথক নয়।
আমি বেদময়, তপোময়, প্রজাপতিগণের অভিনন্দিত ও সমাহিত চিত্তে নিপুণ যোগের অনুষ্ঠান করেও আমার সৃষ্টি কর্তা ভগবান সেই পরম পুরুষকে জানতে পারিনি। আমি সৃষ্টি কর্তা, ব্রহ্মা রুদ্র যাঁর পারমার্থিক স্বরূপ জানতে পারিনি। অপর দেবতারা তা কী করে জানবে? আমরা সেই ভগবানের লীলাকীর্তন করি মাত্র। সেই ভগবানের চরণে প্রণাম নিবেদন করি।
তিনি বিশুদ্ধ, সত্য ও জ্ঞান স্বরূপ। তিনি সকলের অন্তর্যামী, সমস্ত সন্দেহের অতীত, তিনি নিগুর্ণ, তিনি জন্ম-মরণ রহিত। আমি ব্রহ্মা শিব, যজ্ঞ, বিষ্ণু এগুলি তার গুণাবতার। প্রজাপতিগণ, ঋষিগণ, দেবগণ, নৃপতিগণ, গন্ধর্ব, বিদ্যাধর, যক্ষ, ব্রহ্ম, পিতৃ শ্রেষ্ঠ, ঋষিশ্রেষ্ঠ, সিদ্ধে, দানবেন্দ্র, প্রেত পিশাচ, ভূত, জলচর প্রাণী, পশুপাখি সম্পত্তি, বীর্য বল তেজ ক্ষমা শোভা –সবই পরতত্ত্ব অর্থাৎ সেই ভগবানের বিভূতি বা অবতার।