দুষ্মন্ত-শকুন্তলা
পুরুবংশে দুষ্মন্ত নামে এক মহাবীর্য্যবান রাজা জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সমগ্র পৃথিবী শাসন করিতেন। একদা তিনি সৈন্যসামন্ত সহ মৃগয়ায় বহির্গত হন এবং পরিশ্রান্ত হইয়া এক রমণীয় বনে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি মালিনী নদী তীরে কণ্ঠ মুনির মনোহর আশ্রম দর্শন করেন। তথায় হিংস্র জন্তুরাও শান্তভাবে বিচরণ করিতেছে। অনুচরদের বাহিরে অপেক্ষা করিতে বলিয়া মহারাজ একাকী পদব্রজে আশ্রমে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন সেখানে ব্রাহ্মণগণ বেদপাঠ ও শাস্ত্রালোচনা করিতেছেন। তিনি মহর্ষি কণ্ঠের কুটিরের নিকট গিয়া তাঁহার দর্শন না পাইয়া উচ্চকণ্ঠে বলিলেন এখানে কে আছেন? রাজার কণ্ঠস্বর শুনিয়া কুটিরাভ্যন্তর হইতে সাক্ষাৎ লক্ষ্মীর ন্যায় পরমা রূপবতী তাপসবেশধারিণী এক কন্যা বাহিরে আসিলেন। তিনি রাজাকে স্বাগত জানাইয়া পাদ্যার্ঘ্য দিয়া সম্বর্দ্ধনা করিলেন। অতঃপর রাজার প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলিলেন যে তিনি মহর্ষি কথের দুহিতা। রাজা বিস্ময় প্রকাশপূর্ব্বক বলিলেন মহর্ষি কণ্ঠ আজন্ম উর্দ্ধরেতা তপস্বী, আপনি তাঁহার কন্যা হইলেন কিরূপে? তখন সেই কন্যা স্বীয় জন্মবৃত্তান্ত এইরূপ বলিলেন-
পূর্ব্বকালে রাজা বিশ্বামিত্র ব্রহ্মত্ব লাভের আশায় কঠোর তপস্যা আরম্ভ করেন। দেবরাজ ইন্দ্র তদ্দর্শনে ভীত হইয়া তাঁহার তপোভঙ্গের জন্য অপ্সরা মেনকাকে প্রেরণ করেন। বিশ্বামিত্র তাঁহার রূপ-লাবণ্যে মোহিত হন। পরিশেষে বিশ্বামিত্রের সহযোগে অপ্সরা মেনকার গর্ভে এক কন্যার জন্ম হয়। মেনকা সেই সদাপ্রসূতা কন্যাকে মালিনী নদীতীরে পরিত্যাগ করিয়া স্বর্গে গমন করেন। কয়েকটি পক্ষী সেই শিশুকন্যাকে রক্ষা করেন। সেই সময় মহর্ষি কণ্ঠ নদীতে স্নান করিতে গিয়া শিশুটিকে দেখিতে পান এবং তাহাকে আশ্রমে আনয়নপূর্ব্বক স্বীয় দুহিতার ন্যায় সযত্নে পালন করেন। শকুন্ত বা পক্ষী কর্তৃক রক্ষিত হওয়ায় তাহার নাম হয় শকুন্তলা। মহারাজ, আমিই সেই শকুন্তলা। শকুন্তলাকে রাজকন্যা জানিয়া মহারাজ দুষ্মন্ত তাঁহাকে গান্ধর্ব্বমতে বিবাহ করেন এবং পরবর্তীকালে তাঁহার পুত্রকে যুবরাজ করিবার প্রতিশ্রুতি দিয়া তিনি রাজধানীতে প্রস্থান করেন। যথাকালে শকুন্তলা একটি সর্ব্বাঙ্গ-সুন্দর মহাবলশালী অগ্নিতুল্য দ্যুতিমান পুত্র প্রসব করেন। সেই পুত্র মহর্ষি কথের আশ্রমে পালিত হইতে থাকে। মাত্র ছয় বৎসর বয়সেই সে সিংহ, ব্যাঘ্র, বরাহ, হস্তী প্রভৃতি ভয়ঙ্কর জন্তুদিগকে দমন করিয়া আশ্রমস্থ বৃক্ষে বন্ধন করিয়া রাখিত। সেজন্য সকলে তাহার নাম রাখেন 'সর্ব্বদমন'।
কিছুকাল পরে মহর্ষি শিষ্যগণের দ্বারা সপুত্র শকুন্তলাকে রাজভবনে প্রেরণ করেন। তথায় প্রথমে মহারাজ দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে প্রত্যাখ্যান করেন। পরে অন্তরীক্ষ হইতে দৈববাণী শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং পুত্রকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করেন। পরে মহারাজ ভরত বহু দেশ জয় করিয়া এবং বহু শত অশ্বমেধ যজ্ঞাদি করিয়া সার্ব্বভৌম রাজচক্রবর্তী হইয়াছিলেন। তাঁহার বংশে এক রাজার নাম হস্তী। তিনি হস্তিনাপুর নগর নির্মাণপূর্ব্বক তথায় রাজধানী স্থাপন করেন। রাজা হস্তীর চারি পুরুষ পরে রাজা হন মহারাজ কুরু। তিনি যেখানে তপস্যা করিয়াছিলেন সেই স্থানই পবিত্র কুরুক্ষেত্র। কুরুর অধস্তন সপ্তম পুরুষের নাম প্রতীপ; তাঁহার পুত্র শান্তনু।
মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বিরচিত মহাভারত