অষ্ট বসু-গঙ্গা: দেবব্রত ভীষ্ম

অষ্ট বসু-গঙ্গা: দেবব্রত ভীষ্ম

একদা বসু নামক দেবগণ মহর্ষি বশিষ্ঠকে অবজ্ঞা করায় তিনি তাঁহাদের অভিশাপ দিলেন তোমরা মনুষ্যযোনি প্রাপ্ত হও। তখন বসুগণ গঙ্গাদেবীকে তাঁহাদের মাতা হইবার জন্য প্রার্থনা করেন। গঙ্গাদেবী সম্মতা হইয়া মহারাজ শান্তনুকে বিবাহ করেন এবং এইরূপ শর্ত আরোপ করেন যে তিনি প্রিয় বা অপ্রিয় কার্য্য যাহা কিছুই করুন না কেন, মহারাজ তাঁহাকে কোনরূপ বাধা দিতে পারিবেন না। যদি বাধা দেন তাহা হইলে তিনি তৎক্ষণাৎ মহারাজকে পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবেন। ক্রমান্বয়ে গঙ্গাগর্ভে মহারাজের সাতটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে এবং মাতা গঙ্গা সঙ্গে সঙ্গে তাহাদিগকে গঙ্গাজলে নিক্ষেপ করেন। অষ্টম পুত্র জন্মগ্রহণের পর তাহাকেও যখন গঙ্গাজলে নিক্ষেপের জন্য লইয়া যাইতেছিলেন, তখন মহারাজ তাঁহাকে বাধা দেন। মাতা গঙ্গা বলিলেন- মহারাজ, তোমার ইচ্ছায় এই পুত্রকে বিসর্জন দিব না; তবে আমিও আর এখানে অবস্থান করিব না। এই কথা বলিয়া গঙ্গা নিজের পরিচয় দিয়া বলিলেন-

একদা অষ্ট বসু নামে দেবগণ স্বীয় স্বীয় পত্নীসহ সুমেরু পর্ব্বতের পার্শ্ববর্তী মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে বিহার করিতে গিয়াছিলেন। মহর্ষি তখন আশ্রমে ছিলেন না। মহর্ষির সুন্দর কামধেনু নন্দিনীকে দেখিয়া দ্যু-নামক বসু পত্নীর অনুরোধে কামধেনুকে অপহরণ করেন। মহর্ষি আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করিয়া ধ্যানযোগে সমস্ত অবগত হইয়া অভিশাপ দেন- উহারা মনুষ্য হইয়া জন্মগ্রহণ করুক। শেষে বসুগণের ক্ষমাপ্রার্থনায় সন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন-তোমরা সকলে এক এক বৎসর পরে শাপমুক্ত হইবে। কিন্তু দ্যু-বসু নিজে দুষ্কর্মের ফলে দীর্ঘকাল মনুষ্যলোকে বাস করিবেন। তবে তিনি ধার্মিক, মহাবীর ও সর্ব্বশাস্ত্র-বিশারদ হইবেন। এই পুত্রই সেই বসু; ইহার নাম হইবে দেবব্রত। ইহাকে আমি উত্তমরূপে শিক্ষা দীক্ষা দিয়া আপনাকে প্রত্যর্পণ করিব। এই বলিয়া নবজাত পুত্রকে লইয়া মাতা গঙ্গা অন্তর্হিতা হইলেন।

ছত্রিশ বৎসর পরে একদিন মহারাজ শান্তনু মৃগয়া করিতে গঙ্গাতীরে গিয়া দেখিলেন-দেবকুমারতুল্য চারুদর্শন দীর্ঘকায় এক যুবক শরবর্ষণপূর্ব্বক গঙ্গানদী অবরুদ্ধ করিয়াছে। তখন শুভ্রবসনা সালংকারা মাতা গঙ্গাদেবী সেখানে আবির্ভূতা হইয়া বলিলেন মহারাজ, আমার অষ্টম গর্ভজাত এই আপনার পুত্র দেবব্রত। সে মহর্ষি বশিষ্ঠের নিকট সমগ্র বেদ অধ্যয়ন করিয়াছে, দেবগুরু বৃহস্পতি ও শুক্রাচার্য্যের নিকট সমস্ত শাস্ত্রাধ্যায়ন করিয়াছে এবং ভগবান্ পরশুরামের নিকট অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা করিয়াছে। মহাধনুর্ধর রাজধৰ্ম্মজ্ঞ এই পুত্রকে আপনি গ্রহণ করুন। মহারাজ দেবব্রতকে লইয়া রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং তাহাকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন।

মহারাজ শান্তনুর মনে একটি দুঃখ ছিল-যে দেবব্রত তাঁহার একমাত্র পুত্র। যদি কোন কারণে তাহার মৃত্যু হয়, তাহা হইলে তাঁহার বংশ লোপ পাইবে। একদিন চিন্তান্বিত মহারাজ যমুনা তীরবর্তী বনে পরিভ্রমণ করিতেছেন, এমন সময়ে এক অপূর্ব্ব সুগন্ধের আঘ্রাণ পাইলেন। সেই সুগন্ধের অনুসরণে গিয়া তিনি দেবকন্যা সুদৃশী এক অসামান্য রূপবতী কন্যার দর্শন পাইলেন, পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে কন্যা বলিল-আমি দাসরাজকন্যা সত্যবতী। মহারাজ শান্তনু দাসরাজের নিকট গিয়া কন্যার পাণিপ্রার্থী হইলে দাসরাজ তাঁহার নিকট প্রতিশ্রুতি চাহিলেন যে তাঁহার কন্যার গর্ভজাত পুত্রই সিংহাসনের অধিকারী হইবে। কিন্তু দেবব্রত বিদ্যমানে সেরূপ প্রতিশ্রুতি দান করা সম্ভব নহে বলিয়া মহারাজ বিষণ্ণ মনে প্রত্যাবর্তন করেন।

পিতৃভক্ত দেবব্রত বৃদ্ধ অমাত্যগণের নিকট হইতে পিতার বিমর্ষতার কারণ অবগত হইয়া নিজেই দাসরাজের নিকট গমন করিয়া প্রতিশ্রুতি দিলেন যে তাঁহার কন্যার গর্ভজাত সন্তানই রাজসিংহাসনে অধিকারী হইবে। আমি সিংহাসনের দাবী পরিত্যাগ করিলাম। সংশয়ী দাসরাজ বলিলেন আপনার বাক্যে আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। কিন্তু আপনার পুত্র হইতে ভয় হয়। তখন দেবব্রত ভীষণ প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিলেন- আমি পূর্ব্বেই সিংহাসনের অধিকার ত্যাগ করিয়াই পুনরায় প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিতেছি- আমি জীবনে কখনও বিবাহ করিব না, চিরকৌমার্য্য ব্রত পালন করিব। তাঁহার এই দুইটি ভীষণ প্রতিজ্ঞার জন্য স্বর্গ হইতে দেবগণ পুষ্পবৃষ্টি করিয়া বলিলেন- আজ হইতে ইহার নাম হইবে ভীষ্ম। ভীষ্ম সত্যবতীর সহিত পিতার বিবাহ দিলেন। তাঁহার অতুলনীয় পিতৃভক্তিতে সন্তুষ্ট হইয়া মহারাজ শান্তনু তাঁহাকে ইচ্ছামৃত্যুর বরদান করিলেন।

মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বিরচিত মহাভারত
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post