সমুদ্র-মন্থন

সমুদ্র-মন্থন

মহর্ষি শৌনক জিজ্ঞাসা করিলেন-
কথং তদমৃতং দেবৈর্মথিতং ক চ শংস মে।
যত্র জজ্ঞে মহাবীর্য্যঃ সোহশ্বরাজো মহাদ্যুতিঃ।।
                                                আদিপর্ব্ব, ১৩/৪

-হে সূতপুত্র, পুরাকালে দেবগণ কোন্ কারণে এবং কোন্ স্থানে সমুদ্র-মন্থন করিয়াছিলেন, যাহাতে মহাবলবান ও পরমসুন্দর অশ্বরত্ন উচ্চৈঃশ্রবা জন্মগ্রহণ করিয়াছিল? সৌতি বলিলেন-পুরাকালে দেবগণ সুমেরু পর্ব্বতের শিখরে মিলিত হইয়া অমৃত-প্রাপ্তির নিমিত্ত মন্ত্রণা করিতেছিলেন। ভগবান নারায়ণ দেবতাদের মন্ত্রণার বিষয় অবগত হইয়া পিতামহ ব্রহ্মাকে বলিলেন-দেবগণ ও অসুরগণ একত্র হইয়া সমুদ্রমন্থন করিলে সমুদ্র হইতে অমৃত উত্থিত হইবে। তৎপরে ভগবান্ ব্রহ্মা ও নারায়ণের আদেশে নাগরাজ অনন্ত মন্থনদণ্ডের জন্য মন্দর পর্ব্বত উৎপাটিত করিলেন। দেবগণ সমুদ্রতীরে গিয়া বলিলেন-আমরা অমৃত লাভের জন্য আপনাকে মন্থন করিব। সমুদ্র বলিলেন-আমাকে অনেক মৰ্দ্দন সহ্য করিতে হইবে; কাজেই আমি যেন অমৃতের অংশ পাই।

দেবাসুরের অনুরোধে সাগর-মধ্যস্থ কুৰ্ম্মরাজ মন্দর পর্ব্বতকে পৃষ্ঠে ধারণ করিতে সম্মত হইলেন এবং দেবরাজ ইন্দ্র বজ্র দ্বারা পর্ব্বতের নিম্নদেশ সমতল করিয়া দিলেন। অনন্তর মন্দর পর্ব্বতকে মন্থনদণ্ড এবং নাগরাজ বাসুকিকে রজু করিয়া দেবাসুর মিলিতভাবে সমুদ্র-মন্থন করিতে আরম্ভ করিলেন। অসুরগণ নাগরাজের শীর্ষদেশ এবং দেবগণ তাহার পুচ্ছদেশ ধারণ করিলেন। বাসুকির মুখ হইতে অগ্নিশিখার ন্যায় নিঃশ্বাসবায়ু নির্গত হইতে লাগিল। সমুদ্র হইতে মেঘগর্জনের ন্যায় শব্দ উত্থিত হইল; পর্ব্বতের ঘর্ষণে বহু জলজন্তু নিষ্পিষ্ট হইল, পর্ব্বতের উপরিস্থ বৃক্ষসকল ভগ্ন হইল, বৃক্ষের ঘর্ষণে দাবানল প্রজ্জ্বলিত হইল। নানাপ্রকার বৃক্ষের নির্যাস ও ওষধির রস সমুদ্রজলে পতিত হইল।

তদনন্তর মথ্যমান মহাসাগর হইতে সুশীতল রশ্মিযুক্ত সৌম্যমূর্ত্তি চন্দ্র উত্থিত হইলেন। তৎপরে শ্বেত-পদ্মোপবিষ্টা লক্ষ্মীদেবী এবং উচ্চৈঃশ্রবা নামে শ্বেতবর্ণ মহাবলবান ও সুলক্ষণযুক্ত অশ্বরত্ন উত্থিত হইল। দেবী লক্ষ্মী, সুমনাহর চন্দ্র এবং মনের ন্যায় দ্রুতগমনশীল উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব দেবতারা গ্রহণ করিলেন। পরিশেষে মূর্তিমান ধন্বন্তরি অমৃতপূর্ণ শ্বেতবর্ণ কমণ্ডলু-হস্তে সমুদ্র হইতে আবির্ভূত হইলেন। তাহা দেখিয়া দৈত্যগণ "এই অমৃত আমার, এই অমৃত আমার" বলিয়া ঘোরতর কোলাহল করিতে লাগিল। তৎপরে শ্বেতকায় চতুৰ্দ্দন্ত মহাকায় ঐরাবত হস্তী উত্থিত হইল। দেবরাজ ইন্দ্র তাহাকে অধিকার করিলেন।

সুরাসুর তথাপি সমুদ্র-মন্থন করিতে থাকিলে ভয়ঙ্কর কালকূট বিষ তথা হইতে উত্থিত হইল। স-ধূম অগ্নির ন্যায় সেই ভয়ঙ্কর বিষে জগৎ পরিব্যাপ্ত হইল। তখন পিতামহ ব্রহ্মার অনুরোধে ভগবান্ দেবাদিদেব শঙ্কর সেই বিষম বিষরাশি পান করিয়া কণ্ঠে ধারণপূর্ব্বক ত্রিলোককে রক্ষা করিলেন। তদবধি তিনি নীলকণ্ঠ নামে খ্যাত হইলেন।

দানবগণ লক্ষ্মী ও অমৃতলাভের জন্য দেবতাদের সহিত বিরোধ করিতে লাগিল। তখন ভগবান্ নারায়ণ মোহিনী মায়ায় স্ত্রীরূপ ধারণ করিয়া দানবদের নিকটে উপস্থিত হইলেন। তাহারা তাঁহার সেই অপরূপ রূপলাবণ্য দর্শনে মোহিত হইয়া তাঁহাকেই অমৃত সমর্পণ করিল। তিনি দেবদানব সকলকে শ্রেণীবদ্ধভাবে বসাইয়া কমণ্ডলু হইতে কেবলমাত্র দেবগণকে অমৃত বিতরণ করিলেন। তাহাতে দানবগণ ক্রুদ্ধ হইয়া দেবতাদের প্রতি ধাবিত হইল। তখন ভগবান্ বিষ্ণু অমৃত হরণ করিলেন তৎপরে তিনি স্ত্রীরূপে পরিত্যাগ করিয়া দেবগণের সহিত যোগদানকরতঃ ভীষণ যুদ্ধ করিলেন। দানবগণ পরাজিত হইয়া পলায়ন করিল।

মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বিরচিত মহাভারত
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post