গরুড়-গজকচ্ছপ-অমৃতহরণ
মহর্ষি শৌনক বলিলেন- বৎস সৌতি, তোমার কথা অতি মধুর, আমরা তোমার নিকট আরও কাহিনী শুনিতে ইচ্ছা করি। সৌতি বলিতে লাগিলেন-
পুরকালে সত্যযুগে প্রজাপতি দক্ষের কদ্র ও বিনতা নামে দুই সুলক্ষণা রূপবতী কন্যা ছিলেন। তাঁহারা উভয়েই মহর্ষি কশ্যপের ধর্মপত্নী। মহর্ষি তাঁহাদের বর দিতে ইচ্ছা কলিলেন। কদ্র বলিলেন তুল্যবলশালী সহস্র নাগ আমার পুত্র হউক, আর বিনতা বলিলেন আমার দুইটি পুত্র হউক, যাহারা কদ্রুর পুত্রগণ অপেক্ষাও অধিকতর বলবান্ ও তেজস্বী হয়। মহর্ষি দুই পত্নীকেই অভীষ্ট বরদান করিলেন।
যথাকালে কদ্রর এক সহস্র নাগপুত্র এবং বিনতার অরুণ ও গরুড় নামে দুইটি অমিত বলশালী পক্ষীপুত্র জন্মগ্রহণ করিল। একদিন সমুদ্র-মন্থনে উত্থিত উচ্চৈঃশ্রবা অশ্বকে দূর হইতে দেখিয়া কদ্র ও বিনতা পরস্পর তর্ক করিলেন-এই অশ্বের গায়ের বর্ণ কি? বিনতা বলিলেন-শ্বেতবর্ণ, কদ্র বলিলেন-উহার পুচ্ছকেশ কৃষ্ণবর্ণ। অবশেষে এই পণ স্থির হইল যে আগামীকাল তাঁহারা অশ্বটিকে উত্তমরূপে দর্শন করিবেন এবং যাঁহারা বাক্য মিথ্যা হইবে তিনি সপত্নীর দাসী হইবেন।
এদিকে কদ্র গৃহে আসিয়া স্বীয় সর্পপুত্রদের বলিলেন তোমরা শীঘ্র গিয়া অশ্বের পুচ্ছদেশে লগ্ন হও, যাহাতে তাহার পুচ্ছদেশ কৃষ্ণবর্ণ দেখায়। কিছু সর্প মাতার আদেশে তাহাই করিল। যাহারা মাতার অন্যায় আদেশে সম্মত ছিল না, কদ্র তাহাদের অভিশাপ দিলেন তোমরা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞে দগ্ধ হইবে। পরদিন প্রভাতে কদ্র ও বিনতা সমুদ্রপারে গমন করিয়া দেখিলেন কদ্রর দাসীত্বে নিযুক্ত হইলেন।
কদ্র ও তৎপুত্র সর্পগণ সর্ব্বদা বিনতা ও গরুড়কে নানা দাস্যকর্মে নিযুক্ত করিত। একদিন গরুড় মাতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন-উহাদের আজ্ঞানুসারে আমাদের চলিতে হইবে কেন? বিনতা তখন সমস্ত ঘটনা বিবৃত করিয়া বলিলেন কিভাবে কদ্রু কপট উপায়ে তাঁহাকে পণে পরাজিত করিয়া দাসীত্বে নিযুক্ত করিয়াছেন। তখন গরুড় সর্পগণকে জিজ্ঞাসা করিবেন কিভাবে আমরা দাসত্ব হইতে মুক্ত হইতে পারিব? সর্পগণ বলিল-যদি স্বীয় বীর্য্যবলে স্বর্গ হইতে আমাদেরকে অমৃত আনয়ন করিয়া দিতে পার তাহা হইলে দাসত্ব হইতে মুক্তি পাইবে।
এইকথা শুনিয়া মহাবীর গরুড় অমৃত আনয়ন করিবার জন্য প্রস্তুত হইলেন। তিনি পিতা মহর্ষি কশ্যপের নিকট গিয়া তাঁহারআশীর্বাদ প্রার্থনা করিয়া বলিলেন-আমি ক্ষুৎপিপাসায় কাতর, উপযুক্ত খাদ্য পাই না। আপনি আমার ক্ষুধানিবৃত্তির উপায় বলুন। মহর্ষি কশ্যপ বলিলেন পূর্ব্বে বিভাবসু নামে এক কোমলস্বভাব ব্রাহ্মণ ছিলেন, তাঁহার কনিষ্ঠভ্রাতা সুপ্রতীক পৈতৃক ধন-সম্পত্তি বিভাগের জন্য তাঁহাকে পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করিলে তিনি অভিশাপ দিলেন তুমি হস্তী হও। সুপ্রতীকও ক্রুদ্ধ হইয়া জ্যৈষ্ঠভ্রাতাকে বলিলেন তাহা হইলে তুমিও কচ্ছপ হও। বৎস গরুড়, অনতিদূরে যে বিশাল সরোবর দেখিতেছ, সেখানে সেই দুই ভ্রাতা গজ -কচ্ছপরূপে পরস্পর যুদ্ধ করিতেছে। তুমি ঐ মহাগিরিতুল্য গজ-কচ্ছপকে ভোজন কর।
পিতার আদেশে মহাবলবান গরুড় তাঁহার দুই নখে মহাকায় গজ ও কচ্ছপকে তুলিয়া নিয়া অলম্ব তীর্থে গমন করিলেন। সেখানে শতযোজন বিস্তৃত একটি বিশাল বটবৃক্ষ দেখিয়া তাহার শাখায় বসিবামাত্র সেই মহাশাখা ভগ্ন হইল। বালাখিল্য মুনিগণ সেই শাখায় ছিলেন। তাহা দেখিয়া গরুড় চক্ষুদ্বারা শাখাটি ধরিয়া বহুদেশ ভ্রমণ করিয়া অবশেষে গন্ধমাদন পর্ব্বতে পিতার নিকট গেলেন। মহর্ষি কশ্যপ পুত্রের বিপদ বুঝিয়া তাহার অনিষ্ট নিবারণের জন্য বালাখিল্য মুনিগণকে বলিলেন তপোধনগণ, গরুড় জগতের কল্যাণের জন্য অমৃত আনয়ন করিতে যাইতেছে। আপনারা বৃক্ষশাখা হইত কৃপাপূর্ব্বক অবতরণ করুন। মুনিগণ শাখা পরিত্যাগ করিয়া হিমালয়ে তপস্যা করিতে গেলেন। তখন গরুড় এক জনশূন্য পর্ব্বতে সেই শাখা পরিত্যাগ করিয়া গজ-কচ্ছপকে ভক্ষণ করিলেন।
তৎপরে মহাবীর গরুড় অমৃত আনয়নের জন্য বায়ুবেগে স্বর্গাভিমুখে উড়িয়া চলিলেন। দেবগণ গরুড়কে আসিতে দেখিয়া অস্ত্রশস্ত্র লইয়া যুদ্ধ করিলেন। ইন্দ্রাদি দেবগণের সহিত তুমুল যুদ্ধে জয়ী হইয়া গরুড় অমৃত-রক্ষাগারে প্রবেশ করিলেন। সেখানে অমৃতের চতুদ্দিকে প্রচণ্ড অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত রহিয়াছে এবং একটি ক্ষুরধার লৌহচক্র নিরন্তর ঘূর্ণিত হইতেছে। গরুড় নিজদেহ সঙ্কুচিত করিয়া ভিতরে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন দুইটি ভয়ঙ্কর সর্প সেখানে অমৃত রক্ষা করিতেছে। গরুড় তাহাদিগকে বধ করিয়া অমৃত লইয়া আকাশে উঠিলেন এবং সেখানে ভগবান্ বিষ্ণুর দর্শন পাইলেন। গরুড় অমৃতপানের লোভ সংবরণ করিয়াছেন দেখিয়া ভগবান্ বিষ্ণু সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে বর দিতে চাহিলেন। গরুড় বলিলেন আমি তোমার উপরে থাকিতে এবং অমৃত পান না করিয়াই অজর-অমর হইতে ইচ্ছা করি। ভগবান্ 'তথাস্তু" বলিয়া তাহাকে আশীর্ব্বাদ করিলেন। তখন গরুড় বলিলেন তুমিও আমার নিকট বর গ্রহণ কর। ভগবান্ বিষ্ণু বলিলেন তুমি আমার বাহন হও, তবুও আমার রথধ্বজের উপরে থাকিবে। গরুড় তাহাই হইবে বলিয়া মহাবেগে প্রস্থান করিলেন।
দেবরাজ ইন্দ্র গরুড়ের উপর বজ্রাঘাত করিলেন। গরুড় সহাস্যে বলিলেন- মহামুনি দধীচি ও তোমার সম্মান রক্ষার জন্য আমার একটি পালক ফেলিয়া দিলাম, নইলে তোমার বজ্রাঘাতে আমার কোন বেদনাই হয় নাই। গরুড়ের শক্তি দেখিয়া ইন্দ্র তাহার সহিত সখ্যতা স্থাপন করিয়া বলিলেন তোমার যদি অমৃতের প্রয়োজন না হয়, তাহা হইলে আমাকে উহা প্রত্যর্পণ কর। কারণ তুমি যাহাদেরকে উহা প্রদান করিবে, তাহারাই আমার উপর অত্যাচার করিবে। গরুড় বলিলেন-কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে আমি অমৃত লইয়া যাইতেছি। আমার উদ্দেশ্যে সিদ্ধ হইলে যেখানে আমি উহা রক্ষা করিব সেখান হইতেই তুমি উহা অপহরণ করিও। দেবরাজ সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে বরদান করিতে চাইলে গরুড় বলিলেন-সমস্ত সর্পগণ আমার ভক্ষ্য হউক। ইন্দ্র তথাস্তু বলিলেন।
অনন্তর গরুড় অমৃত লইয়া মাতা বিনতার নিকট গমন করিলেন এবং সর্পভ্রাতাদের বলিলেন-আমি অমৃত আনিয়া এই কুশের উপর রাখিতেছি। তোমরা স্নানান্তে পবিত্র হইয়া উহা গ্রহণ করিও। এক্ষণে আমার মাতাকে দাসীত্ব হইতে মুক্তি দান কর। সর্পগণ তাহাই হউক বলিয়া স্নান করিতে গেল। ইত্যবসরে দেবরাজ ইন্দ্র অমৃত হরণ করিলেন। সর্পগণ স্নানান্তে অমৃত পান করিতে আসিল এবং তাহা না পাইয়া কুশ লেহন করিতে লাগিল। সেজন্য তাহাদের জিহ্বা দ্বিধাবিভক্ত হইল। অমৃতস্পর্শে কুশও পবিত্র হইল।
মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বিরচিত মহাভারত