জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ ও আস্তীকের বিবরণ

জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ ও আস্তীকের বিবরণ

মহর্ষি শৌনক বলিলেন- মাতা কদ্রর অভিশাপ শ্রবণ করিয়া সর্পগণ কি করিল? সৌতি বলিলেন- কদ্রুর জ্যেষ্ঠপুত্র শেষনাগ বা বাসুকি। তিনি খুবই ধাৰ্ম্মিক ও তপস্বী ছিলেন। পাতালবাসী নাগগণ তাঁহাকে নাগরাজপদে অভিষিক্ত করেন। মাতৃপ্রদত্ত অভিশাপ খণ্ডনের জন্য তাঁহারা যখন পরামর্শ করিতেছিলেন, তখন এলাপত্র নামে এক সর্প বলিল-আমি পূর্ব্বে শুনিয়াছি যে-তপস্বী পরিব্রাজক জরৎকারুর মুনির ঔরসে বাসুকি-ভগ্নী জরৎকারুর গর্ভে আস্তীক নামে এক তেজস্বী ব্রাহ্মণ জন্মগ্রহণ করিবেন। তিনিই ধার্মিক সর্পগণকে রক্ষা করিবেন।

তৎপরে নাগরাজ বাসুকি অনেক অনুসন্ধানের পর জরৎকারু মুনির সহিত স্বীয় ভগিনীর বিবাহ দিলেন। তাঁহার এইরূপ সর্ভ ছিল যে তাঁহার স্ত্রী কদাচ কোন অপ্রিয় আচরণ করিলে তিনি তৎক্ষণাৎ তাহাকে পরিত্যাগ করিবেন। এইভাবে কিছুকাল পরে তিনি গর্ভবর্তী হইলেন। একদা মুনিবর স্ত্রীর ক্রোড়ে মস্তক রাখিয়া নিদ্রা যাইতেছিলেন এমন সময় সন্ধ্যা হইয়া আসিল। স্বামীর সন্ধ্যাকৃত্যের সময় উত্তীর্ণ হইয়া যায় দেখিয়া তিনি স্বামীর নিদ্রাভঙ্গ রকরিলেন। মুনিবর ক্রোধান্বিত হইয়া বলিলেন তুমি আমার অবমাননা করিয়াছ। আমি এখনই তোমাকে পরিত্যাগ করিয়া চলিলাম। গমনের পূর্ব্বে তিনি পত্নীকে বলিলেন-

অস্তায়ং সুভগে গর্ভস্তব বৈশ্বানরোপমঃ।
ঋষিঃ পরমধর্মাত্মা-বেদ বেদাঙ্গপারগঃ।।
                                            -আদিপর্ব্ব, ৪২/৪২

-হে ভাগ্যবতি, তোমার গর্ভে অগ্নিতুল্য তেজস্বী, পরম ধার্মিক এক বেদ-বেদাঙ্গ- পারঙ্গম ঋষি জন্মগ্রহণ করিবেন। এইকথা বলিয়া মহর্ষি জরৎকারু পুনরায় তপস্যার জন্য চলিয়া গেলেন।

যথাকালে বাসুকি-ভগিনীর দেবকুমারতুল্য এক পুত্র জন্মগ্রহণ করিল। তাঁহার নাম হইল-আস্তীক। তিনি ঋষি চ্যবনের পুত্র প্রমতির নিকট বেদাধ্যয়ন করেন।

এদিকে মহারাজ জনমেজয় পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য শ্রুতশ্রবা ঋষির পুত্র মহাতপস্বী সোমশ্রবাকে পুরোহিতরূপে বরণ করিয়া এক বিরাট সর্পযজ্ঞ আরম্ভ করিলেন। নানাজাতীয় অসংখ্য বিষধর সর্প সেই যজ্ঞাগ্নিতে পতিত হইয়া ভষ্মীভূত হইতে লগিল। দেবরাজ ইন্দ্র তক্ষক নাগের সখা ছিলেন। যেজন্য তক্ষক প্রাণভয়ে ইন্দ্রের শরণাগত হইলে দেবরাজ তাহাকে আশ্রয় দান করিলেন। স্বজনগণের মৃত্যুতে কাতর হইয়া সর্পরাজ বাসুকি তাঁহর ভগিনীকে বলিলেন-তোমার পুত্রকে আদেশ কর, যাহাতে আমাদের সকলকে এই বিপদ হইতে রক্ষা করে। তখন মাতা জরৎকারু পুত্র আস্তীককে পূর্ব্ব ইতিহাস বর্ণনা করিয়া বলিলেন-হে অমরতুল্য তেজস্বী পুত্র, তুমি আমার ভ্রাতা ও আত্মীয়-স্বজনকে এই দুরন্ত যজ্ঞাগ্নি হইতে রক্ষা কর।

তখন আস্তীক সম্মত হইয়া যজ্ঞস্থানে 'গমন করিলেন। কিন্তু দ্বারপাল প্রথমে তাঁহাকে সেখানে প্রবেশ করিতে নিষেধ করিল। আস্তীক তখন মহারাজ জনমেজয়ের বহু স্তুতি করিতে লাগিলেন। তাহা শ্রবণ করিয়া মহারাজ সন্তুষ্ট হইয়া ব্রাহ্মহ্মণকে বর দিতে চাহিলেন। তাহাতে রাজ-অমাত্যগণ ও হোতা ব্রাহ্মহ্মণ অসন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন-
মহারাজ, এই যজ্ঞে এখনও তক্ষক নাগ আসে নাই। সে ভয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। আপনি এখনই ব্রাহ্মণকে বরদান করিবেন না।

তখন মহারাজের আদেশে হোতৃগণ ইন্দ্রসহ তক্ষককে মন্ত্রবলে আহ্বান করিলেন। ইন্দ্র বিমানে চড়িয়া যজ্ঞস্থানে আগমন করিলেন। তক্ষক তাঁহার উত্তরীয়ের মধ্যে লুক্কায়িত রহিল। যজ্ঞস্থানের নিকটে আসিয়া প্রজ্জ্বলিত ভয়ঙ্কর যজ্ঞাগ্নি দর্শনে ভীত হইয়া দেবরাজ ইন্দ্র তক্ষককে পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করিলেন। তক্ষক মন্ত্রপ্রভাবে মোহগ্রস্ত হইয়া আকাশপথে যজ্ঞাগ্নির দিকে অগ্রসর হইল। তক্ষককে আসিতে দেখিয়া ঋত্বিকগণ বলিলেন-মহারাজ আপনার কার্য্যসিদ্ধ হইয়াছে। এখন ব্রাহ্মণকে বরদান করিতে পারেন। মহারাজ আস্তীককে বলিলেন-ব্রাহ্মণ, তুমি বয়সে বালক হইলেও সুপণ্ডিত। এইবার অভীষ্ট বর প্রার্থনা কর।

আস্তীক তক্ষকের উদ্দেশ্যে বলিলেন-তিষ্ঠ, তিষ্ঠ, তিষ্ঠ। তক্ষক আকাশে স্থির হইয়া রহিল। তৎপরে আস্তীক রাজাকে বলিলেন-মহারাজ, এই যজ্ঞ এখনই নিবৃত্ত হউক, আর যেন সর্পগণ অগ্নিতে দগ্ধ না হয়। মহারাজ বলিলেন এই বর ভিন্ন তুমি ধনরত্ন প্রভৃতি অন্য যাহা কিছু প্রার্থনা কর। কিন্তু আস্তীক অন্য কিছুতেই সম্মত হইলেন না। বলিলেন- আমি আর কিছুই প্রার্থনা করি না; শুধু আপনার এই যজ্ঞ অবিলম্বে নিবৃত্ত হউক, আমার মাতৃকুলের মঙ্গল হউক। অবশেষে সকলের অনুরোধে মহারাজ
তাঁহাকে অভীষ্ট বরদান করিলেন। সর্পযজ্ঞ সমাপ্ত হইল। মহারাজও প্রীতিলাভ করিয়া ব্রাহ্মণগণকে বহু ধন দান করিলেন। আস্তীক মাতুলালয়ে প্রত্যাবর্তন করিলেন। সর্পগণ আনন্দিত হইয়া আস্তীককে বরদান করিতে চাহিলে আস্তীক বলিলেন-যদি কেহ দিবসে বা রাত্রিতে আমাদের এই পবিত্র আখ্যান পাঠ করে অথবা নিম্নোক্ত মন্ত্রপাঠ করে, তাহা হইলে তোমাদের নিকট হইতে তাহাদের যেন কোনপ্রকার বিপদ না হয় আমাকে এই বর দান কর। সর্পগণও তাহাকে আশ্বাস দিয়া বলিল-তাহাই হইবে।
সেই সর্পনিবারণ মন্ত্রটি এইরূপ-
যো জরৎকারুমা জাতো জরৎকারৌ মহাযশ্যঃ।
আস্তীকঃ সর্পসত্রে বঃ পন্নগান্ যোহভ্যরক্ষত।।
তং স্মরন্তং মহাভাগাঃ ন মাং হিতসিতুমহথ।।
সর্পাপসর্প ভদ্রং তে গচ্ছ সর্প মহাবিষ।
জনমেজয়স্য যজ্ঞান্তে আস্তীকবচনং স্মর।।
আস্তীকস্য বচঃ শ্রুত্বা যঃ সর্পো ন নিবর্ততে।
শতধা ভিদ্যতে মূর্ছা শিংশবৃক্ষফলং যথা।।
-আদি পর্ব্ব, ৫৩/২৪-২৬
আস্তীকস্য মুনের্মাতা ভগিনী বাসুকেস্তথা।
জরৎকারোঃ মুনেপত্নী মনসাদেবি নমোহস্তুতে।।

-মহাযশস্বী যে আস্তীক জরৎকারু মুনির ঔরসে মনসাদেবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং ভয়ঙ্কর সর্পযজ্ঞে যিনি সর্পগণকে রক্ষা করিয়াছেন, সেই আস্তীককে আমি স্মরণ করিতেছি। অতএব হে সর্পগণ, তোমরা আমায় হিংসা করিও না।
হে মহাবিষ সর্প, তোমরা সরিয়া যাও, তোমাদের মঙ্গল হউক। জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞের পর আস্তীকের বাক্য স্মরণ কর। আস্তীকের কথায় যে সর্প নিবৃত্ত না হয়, তাহার মস্তক শিমুল ফলের ন্যায় শতধা বিদীর্ণ হয়।
আস্তীক মুনির মাতা, নাগরাজ বাসুকির ভগিনী এবং জরৎকারু মুনির পত্নী মনসাদেবীকে আমি পুনঃ পুনঃ প্রণাম করি।
ইহাই সর্পভয়-নিবারক মন্ত্র। এই মন্ত্র পাঠ করিলে তাহার আর সর্পভয় থাকে না।

মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বিরচিত মহাভারত
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post