কচ-দেবযানী-যযাতি

কচ-দেবযানী-যযাতি

জগতে দুই প্রকৃতির মানব দেখা যায় দৈবী প্রকৃতির ও আসুর প্রকৃতির- "দ্বৌ ভূতসর্গেী লোকেহস্মিন্ দৈব আসুর এব চ"-গীতা, ১৬/৬
এই দুই শ্রেণীর মধ্যে চিরকাল দ্বন্দু চলিয়া আসিতেছে। প্রাচীনকালে ত্রিলোকের ঐশ্বর্য্য অধিকারের জন্য দেবাসুরের বিরোধ হয়। তখন দেবতারা বৃহস্পতিকে এবং অসুরেরা শুক্রাচার্য্যকে পুরোহিতরূপে বরণ করেন। দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য্য মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা অবগত ছিলেন। সেই বিদ্যাবলে তিনি দেবাসুর যুদ্ধে নিহত অসুরদের পুনর্জীবিত করিতেন। কিন্তু দেবগুরু বৃহস্পতির সেই বিদ্যা জানা ছিল না। সেজন্য দেবগণ পরামর্শ করিয়া বৃহস্পতিপুত্র কচকে সেই বিদ্যালাভের জন্য শুক্রাচার্য্যের নিকট শিষ্যরূপে প্রেরণ করেন। কচ সহস্র বৎসর কঠোর তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্যপালন এবং একনিষ্ঠভাবে গুরুসেবার দ্বারা মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ করেন এবং অন্যান্য দেবতাদের সেই বিদ্যা শিক্ষাদান করেন।
একদিন শুক্রাচার্য্য-কন্যা দেবযানী, দৈত্যরাজকন্যা শর্মিষ্ঠা ও অন্যান্য সমবয়সীদের সহিত এক সরোবরে জলকেলি করিতেছিলেন। সেইসময় বায়ুরূপী ইন্দ্র তাহাদের বস্ত্রগুলি একত্র মিশাইয়া দেন। তাহাতে শর্মিষ্ঠা ভ্রমক্রমে দেবযানীর বস্ত্র পরিধান করিলে উভয়ের মধ্যে বিবাদ হয় এবং শর্মিষ্ঠা কুপিতা হইয়া দেবযানীকে এক জলশূন্য কূপমধ্যে নিক্ষেপ করেন। সেই সময় মহারাজ যযাতি মৃগয়া করিতে করিতে সেখানে উপস্থিত হন এবং দেবযানীকে উদ্ধারপূর্ব্বক স্বীয় রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেন।

এদিকে দাসীর নিকট সংবাদ পাইয়া শুক্রাচার্য্য কন্যা দেবযানীকে সঙ্গে লইয়া আসেন। দেবযানীর নির্ব্বাহাতিশয্যে শুক্রাচার্য্য দৈত্যরাজ বৃষপর্ব্বাকে পরিত্যাগ করিয়া যাইতে চাহিলে তাঁহার সন্তুষ্টির জন্য শর্মিষ্ঠা পিতার আদেশে সহস্র পরিচারিকাসহ দেবযানীর দাসীত্ব স্বীকার করিতে বাধ্য হন। পরে মহারাজ যযাতি দেবযানী ও শর্মিষ্ঠাকে বিবাহ করেন। কালক্রমে মহারাজের ঔরসে দেবযানীর দুইটি পুত্র এবং শর্মিষ্ঠার তিনটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে।

অনন্তর শুক্রাচার্য্যের অভিশাপে মহারাজ যযাতি অকালে জরাগ্রস্ত হইয়া পড়েন। তিনি কনিষ্ঠ পুত্র পুরুকে অনুরোধ করিলে পুরু সহস্র বৎসরের জন্য পিতাকে স্বীয় যৌবন প্রদান করিয়া নিজে জরাগ্রস্ত হন। পুরুর যৌবন লাভ করিয়া মহারাজ যযাতি ধর্মানুসারে অভীষ্ট বিষয়ভোগ, প্রজাপালন ও বহুবিধ ধর্মকর্ম্মের অনুষ্ঠান করেন। সহস্র বৎসর পরে তিনি পুরুকে যৌবন প্রত্যর্পণ করিয়া তাঁহার সেই বিখ্যাত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন-
ন জাতু কামঃ কামানামুপভোগেন শাম্যতি।
হবিষা কৃষ্ণবর্ম্মেব ভূয় এবাভিবর্দ্ধতে।।
যৎ পৃথিব্যাং ব্রীহর্ষবং হিরণ্যং পশবঃ স্ত্রিয়ঃ।
একস্যাপি ন পর্যাপ্তং তস্মাতৃষ্ণাং পরিত্যজেৎ।।
আদি পর্ব্ব, ৭৩/১২-১৩

অর্থাৎ কাম্যবস্তুর উপভোগে কামনার কখনও নিবৃত্তি হয় না। বরং ঘৃতদ্বারা অগ্নি যেরূপ বৃদ্ধি পায়, উপভোগের দ্বারা কামনাও সেইরূপ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। এই পৃথিবীতে যত ধান্য, যব, ধনসম্পদ, পশু ও স্ত্রীলোক আছে, সে সমস্ত একত্রে একজন লোকেরও কামনা-বাসনা পূরণের পক্ষে পর্যাপ্ত নয়। সেজন্য বিষয়তৃষ্ণাকেই পরিত্যাগ করা উচিত।

মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বিরচিত মহাভারত
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post