কুরুবংশের বিবরণ

কুরুবংশের বিবরণ

মহারাজ জনমেজয়ের প্রার্থনায় মহামুনি বৈশম্পায়ন কুরুবংশের বিবরণ আদি হইতে এইরূপ বলিলেন প্রাচীন ভারতবর্ষে দুইটি বিখ্যাত রাজবংশ রাজত্ব করিয়া গিয়াছেন। একটি সূর্য্যবংশ, অপরটি চন্দ্রবংশ। রামায়ণে সূর্য্যবংশের এবং মহাভারতে চন্দ্রবংশের কাহিনী বর্ণিত হইয়াছে।

পিতামহ ব্রহ্মার পুত্র প্রজাপতি দক্ষ, তাঁহার পঞ্চাশটি কন্যার মধ্যে সর্ব্বজ্যেষ্ঠা অদিতির পুত্র বিবস্বান্ বা সূর্য্য। সূর্য্যের পুত্র মনু, তৎপুত্র ইক্ষাকু হইতে সূর্য্যবংশীয় রাজগণের উৎপত্তি।

অন্যদিকে মনুর কন্যা ইলা, চন্দ্রপুত্র বুধের সহিত তাহার বিবাহ হয়। বুধ ও ইলার পুত্র পুরূরবা, তৎপুত্র আয়ু, আয়ুর পুত্র নহুষ, নহুষের পুত্র যযাতি। যযাতির দুই ভার্য্যা দৈত্যগুরু শুক্রচার্য্যের কন্যা দেবযানী এবং দৈত্যরাজ বৃষপর্ব্বার কন্যা শর্মিষ্ঠা। দেবযানীর গর্ভে যদু ও তুর্ব্বসু নামে দুইটি পুত্র এবং শর্মিষ্ঠার গর্ভে দ্রুত্যু, অনু ও পুরু নামে তিনটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে। জ্যেষ্ঠপুত্র যদু হতে যদুবংশ এবং কনিষ্ঠপুত্র পুরু হইতে পুরুবংশ বিস্তৃত হইয়াছে। যদুবংশে ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম প্রভৃতি জন্মগ্রহণ করেন।

পুরুবংশে দুষ্মন্ত নামে এক পরাক্রান্ত রাজা জন্মগ্রহণ করেন। দুষ্মন্ত-শকুন্তলার পুত্রই সম্রাট ভরত, যাঁহার নামানুসারে এই দেশের নাম ভারতবর্ষ হইয়াছে। রাজচক্রবর্তী ভরতের বংশে পরে হস্তী নামে এক রাজা হন, তিনিই হস্তিনাপুর নির্মাণপূর্ব্বক তথায় রাজধানী স্থাপন করেন। সেই প্রাচীন হস্তিনাপুরের নাম বর্তমান দিল্লী। রাজা হস্তীর তিন পুরুষ পরে রাজা হন সম্বরণ। তিনি সূর্য্যকন্যা তপতীকে বিবাহ করেন। সম্বরণের পুত্র মহারাজ কুরু। তাঁহার তপস্যার স্থানই পুণ্যভূমি ধৰ্ম্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্র।

মহারাজ কুরুর অধস্তন সপ্তম পুরুষের নাম প্রতীপ। তাঁহার পুত্র শান্তনু। শান্তনু-গঙ্গার পুত্র মহামতি ভীষ্ম এবং শান্তনু-সত্যবতীর পুত্র চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য্য। বিচিত্রবীর্য্যের দুই পুত্র-ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু। ধৃতরাষ্ট্রের দুর্য্যোধনাদি শতপুত্র এবং পাণ্ডুর পঞ্চ পুত্র- যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব। অর্জুন-সুভদ্রার পুত্র অভিমন্যু, অভিমন্যুর পুত্র ধার্মিক রাজা পরীক্ষিৎ এবং পরীক্ষিতের পুত্র আপনি মহারাজ জনমেজয়।

চন্দ্রপুত্র বুধ হইতে বংশের উৎপত্তি বলিয়া ইহার নাম চন্দ্রবংশ। মহারাজ পুরুর নামে পুরুবংশ, রাজচক্রবর্তী ভরতের নামে ভারতবংশ, তথা সম্রাট কুরুর নামে এই বংশকে কুরুবংশ বলা হইয়া তাকে। কুরুবংশীর সকলেই কৌরব, কিন্তু সাধারণতঃ ধৃতরাষ্ট্রের শতপুত্র দুর্য্যোধনাদিকে কৌরব এবং পাণ্ডুর পঞ্চপুত্রকে পাণ্ডব বলা হয়। দ্রৌপদীর গর্ভে যুধিষ্ঠিরের পুত্র প্রতিবিন্ধ্য, ভীমের পুত্র সুতসোম, অর্জুনের পুত্র শ্রুতকীর্তি, নকুলের পুত্র শতানীক এবং সহদেবের পুত্র শ্রুতকৰ্ম্মা মোট পাঁচটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে।

শ্রীমদ্ভাগবতের পঞ্চম স্কন্ধে বর্ণিত হইয়াছে পিতামহ ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ভুব মনু, মনুর পুত্র প্রিয়ব্রত, প্রিয়ব্রতের পুত্র অগ্নীঘ্র, তৎপুত্র অজনাভ; অজনাভের পুত্র ঋষভ এবং ঋষভের পুত্র পরম ভাগবত মহাত্মা ভরত। এই মহারাজ ভরতের নামানুসারে এই দেশের নাম হইয়াছ ভারতবর্ষ। পরবর্তীকালে এই বংশেই দুষ্মন্ত ও তৎপুত্র ভরত জন্মগ্রহণ করেন।

মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বিরচিত মহাভারত
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post