ভগবান ব্যাসদেব

ভগবান ব্যাসদেব

মহর্ষি শৌনক বলিলেন বৎস সৌতি, তোমার কথা অতি মধুর। এখন জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞে যজ্ঞকার্য্যের অবকাশে ভগবান্ ব্যাসদেবের প্রিয় শিষ্য মহামুনি বৈশম্পায়ন যে মহাভারত পাঠ করিতেন, তাহাই আমরা শুনিতে ইচ্ছা করি।

সৌতি বলিলেন চেদিদেশে উপরিচর বসু নামে পুরুবংশজাত এক ধার্ম্মিক নৃপতি ছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র তাঁহাকে সখারূপে মান্য কয়িা স্ফটিক-নিৰ্ম্মিত আকাশগামী এক দিব্য বিমান এবং অম্লান পঙ্কজের বৈজয়ন্তীমালা প্রদান করেন। মহারাজ ইন্দ্রদত্ত সেই বিমানে আকাশমার্গে বিচরণ করিতেন; সেজন্য তাঁহার নাম হয় উপরিচর।

সেই ধার্মিক প্রবর রাজা উপরিচরের ঔরসে শাপভ্রষ্টা স্বর্গীয় অপ্সরা মৎস্যরূপিণী অদ্রিকার গর্ভে পরমা সুন্দরী কন্যা সত্যবতীর জন্ম হয়। মহারাজ তাহাকে কন্যারূপে পালন করিবার জন্য মৎস্যরাজকে দান করেন। সেখানেই তিনি প্রতিপালিতা হন। এদিকে ভগবান্ ব্রহ্মার মানস পুত্র মহর্ষি বশিষ্ঠ। তাঁহার পুত্র শক্তি। শক্তির পুত্র মহামুনি পরাশরের ঔরসে মাতা সত্যবতীর গর্ভে নারায়ণের অবতাররূপী ভগবান ব্যাসদেবের আবির্ভাব হয়। ব্যাসদেবের পরিচয় দিয়া শাস্ত্রে বলা হইয়াছে

ব্যাসং বশিষ্ঠনপ্তারং শক্তেঃ পৌত্রমকল্মষম্।
পরাশরাত্মজং বন্দে শুকতাতং তপোনিধিম্।।
-গীতা, মঙ্গলাচরণ।

অর্থাৎ ভগবান্ বশিষ্ঠের প্রপৌত্র, মহর্ষি শক্তির পৌত্র, মহামুনি পরাশরের পুত্র এবং ব্রহ্মর্ষি শুকদেবের পিতা তপস্বীশ্রেষ্ঠ নিষ্পাপ ব্যাসদেবকে আমরা বন্দনা করি।

মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বিরচিত মহাভারত

সুতরাং ভগবান্ ব্যাসদেবের পিতৃকুল ও মাতৃকুল- উভয়ই ছিল শ্রীভগবানের আশীর্ব্বাদপুষ্ট অতি মহৎ বংশ। তাঁহার পূর্ণ নাম শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস। কারণ তাঁহার জন্ম হয় এক দ্বীপের মধ্যে এবং শিক্ষার সৌকার্য্য-বিধানার্থে বেদকে তিনি চারি ভাগে বিভক্ত করেন।

ব্যাসদেবই সর্ব্বপ্রথম বিশাল পবিত্র বেদকে সশৃঙ্খলভাবে বিভাগ করিয়া লিখিতরূপে প্রকাশ করেন। তৎপরে সমস্ত উপনিষদের সারসংগ্রহপূর্ব্বক ষড়দর্শনের শ্রেষ্ঠ দর্শন 'ব্রহ্মসূত্র বা বেদান্ত দর্শন' সূত্রাকারে রচনা করেন। পরে আপামর জনসাধারণের জন্য সহজবোধ্য লক্ষ-শ্লোকাত্মক সুবিশাল 'মহাভারত' রচনা করিয়া জগতে অক্ষয় কীর্ত্তি স্থাপন করেন। জগতের যাবতীয় শিক্ষনীয় বিষয় ইহাতে অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে। তৎপরে লোকশিক্ষার্থে অষ্টাদশ মহাপুরাণ ও অষ্টাদশ উপপুরাণ রচনা করেন। এমন কি যে 'শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা' ও 'শ্রীমদ্ভাগত' ভক্তগণের প্রাণস্বরূপ তাহা ভগবান্ ব্যাসদেবেরই অমর লেখনী-প্রসূত। এইভাবে সমগ্র মানবজাতি তথা জীবজগতের কল্যাণের জন্য আজন্ম কঠোর তপস্বী দীর্ঘজীবী এই মহাপুরুষ সমস্ত জীবন ঐকান্তিক নিষ্ঠা সহকারে যে কি কঠোর পরিশ্রম ও তপস্যা করিয়া গিয়াছেন, তাহা কল্পনাও করা যায় না।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post