রাজা পরীক্ষিতের মৃত্যু
রাজা জনমেজয়ের মন্ত্রীরা এই ইতিহাস বলিলেন অভিমন্যু-উত্তরার পুত্র মহারাজ পরীক্ষিত কৃপাচার্য্যের শিষ্য ও ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণের একান্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি পরম ধার্ম্মিক ও মহাবীর ছিলেন। ষাট বৎসর বয়স পর্যন্ত ধর্মানুসারে রাজত্ব করিবার পর দুরদৃষ্টক্রমে তাঁহার প্রাণনাশ হয়। একদা মহারাজ পরীক্ষিত মৃয়গা করিতে গিয়া একটি মৃগকে বাণবিদ্ধ করিয়া তাহার অনুসরণ করেন এবং অত্যন্ত পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত হইয়া অরণ্য মধ্যে এক মুনিকে দেখিতে পাইলেন। তাঁহাকে মৃগের কথা জিজ্ঞাসা করিলে মুনি কোনরূপ উত্তর দিলেন না; কারণ তিনি তখন মৌনব্রতধারী ও ধ্যানস্থ ছিলেন। মহারাজ তাহা বুঝিতে না পারিয়া ক্রুদ্ধ হইয়া একটি মৃত সর্প ধনুর অগ্রভাগ দ্বারা উঠাইয়া মুনির স্কন্ধে আরোপ করিয়া দিয়া রাজধানীতে প্রস্থান করিলেন। কিন্তু মুনি তাহাতেও কিছু বলিলেন না, ক্রোধও প্রকাশ করিলেন না। সেই মুনির নাম ছিল - শমীক মুনি।
শমীক মুনির শৃঙ্গী নামে একটি পুত্র ছিল। সহপাঠীদের নিকট পিতার অপমানবার্তা শুনিয়া তিনি ক্রুদ্ধ হইয়া অভিশাপ দিলেন আমার নিরপরাধ পিতাকে যে দুরাত্মা অপমান করিয়াছে অদ্য হইতে সপ্ত রাত্রির মধ্যে মহাবিষধর তক্ষক নাগের দংশনে তাহার মৃত্যু হইবে। মুনিবর শমীক এই ভয়ঙ্কর অভিশাপ শুনিয়া মৌন ভঙ্গ করিয়া পুত্রকে বলিলেন -বৎস, আমরা মহারাজ পরীক্ষিতের রাজ্যে বাস করি। তিনি ধর্মাত্মা ও আমাদের রক্ষক; তাঁহার কোন অনিষ্ট আমি ইচ্ছা করি না। তিনি ক্ষুধার্ত ও পরিশ্রান্ত হইয়া আমাদের আশ্রমে আসিয়াছিলেন এবং আমার মৌনব্রতের কথা তিনি কিছু জানিতেন না। কাজেই তোমার অভিশাপ প্রত্যাহার কর। কিন্তু ক্রুদ্ধ শৃঙ্গী তাহাতে স্বীকৃত হইলেন না।
তখন মুনিশ্রেষ্ঠ শমীক গৌরমুখ নামে তাঁহার এক শিষ্যকে মহারাজ পরীক্ষিতের নিকট প্রেরণ করিয়া রাজাকে অভিশাপের বিষয় অবগত করাইলেন এবং তাঁহাকে আত্মরক্ষায় সচেষ্ট হইতে বলিলেন।
এদিকে ধর্মাত্মা মহারাজ পরীক্ষিত নিরপরাধ মহাত্মা মুনিকে সাময়িক ক্রোধবশে অপমান করিয়া আসিয়া নিজেই অনুতাপানলে দগ্ধ হইতেছিলেন। তারপর গৌরমুখের নিকট অভিশাপ বার্তা শুনিয়া তাঁহার পরিতাপের আর পরিসীমা রহিল না। তিনি বিনাপরাধে সেই মুনিবরের উপর তদ্রূপ অবমাননা করিয়াছেন বলিয়া যেরূপ শোকার্ত্ত হইলেন, নিজের মৃত্যুবার্তা শ্রবণেও সেরূপ দুঃখিত হইলেন না। মনে মনে চিন্তা করিলেন আমার উপযুক্ত শাস্তিই হইয়াছে।
তারপর মহারাজ পরীক্ষিত দুঃখিতচিত্তে মন্ত্রীদের সহিত পরামর্শ করিয়া একটিমাত্র স্তম্ভের উপর সুরক্ষিত প্রাসাদ নির্মাণ করাইয়া তাহার উপর অবস্থান করিতে লাগিলেন এবং বিষচিকিৎসক ও মন্ত্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণগণকে প্রাসাদে রক্ষায় নিযুক্ত করিলেন। মুনি-ঋষি-ব্রাহ্মণ ভিন্ন তাঁহার সহিত অন্য সকলের দেখা-সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ হইল।
সপ্তম দিনে কাশ্যপ নামে এক বিষবিদ্যা-বিশারদ ব্রাহ্মণ রাজার নিকট গমন করিতেছিলেন। তখন বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশধারী তক্ষক তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন আপনি কোথায় যাইতেছেন? কাশ্যপ বলিলেন আজ তক্ষক নাগ মহারাজ পরীক্ষিতকে দংশন করিবে। আমি গুরুকৃপায় সেই বিষ নষ্ট করিয়া রাজাকে সদ্য নিরাময় করিব।
তখন তক্ষক কাশ্যপের শক্তি পরীক্ষার জন্য এক বটবৃক্ষকে দংশন করিল। তৎক্ষণাৎ সেই বিশাল বটবৃক্ষ ভস্মীভূত হইয়া গেল। ব্রাহ্মণ কাশ্যপ মন্ত্রবলে ভস্মরাশি হইতে বটবৃক্ষকে পুনর্জীবিত করিলেন। তাহা দেখিয়া বিস্মিত তক্ষক কাশ্যপকে বলিলেন তপোধন, ব্রহ্মশাপে মহারাজের আয়ুক্ষঃয় হইয়া গিয়াছে। আপনি তাঁহার নিকট যত ধন প্রত্যাশা করেন, আমি তদপেক্ষা অধিক ধন আপনাকে দিতেছি। আপনি প্রত্যাগমন করুন। তখন কাশ্যপ ধ্যান দ্বারা জানিলেন যে-সত্যই রাজার আয়ু শেষ হইয়াছে। তিনি তক্ষকের নিকট অভীষ্ট ধন লইয়া প্রস্থান করিলেন। তৎপরে তক্ষকের উপদেশে কয়েকজন নাগ তপস্বীর বেশে ফল-ফুল-জল লইয়া মহারাজ পরীক্ষিতের নিকট গিয়া তাঁহাকে উপহার দিল। দুৰ্দ্দৈববশতঃ মহারাজ তন্মধ্যে একটি ফল ভক্ষণ করিতে উদ্যত হইলেন। সেই ফলের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র কৃষ্ণনয়ন তাম্রবর্ণ কীট দেখিয়া মহারাজ মন্ত্রীদের বলিলেন সূর্য্যদেব অস্তাচলে গমন করিতেছেন, আমার আর কোন ভয় বা দুঃখ নাই। ব্রাহ্মণের বাক্য সফল হউক, আমারও প্রায়শ্চিত্ত হউক, এই কীট তক্ষক হইয়া আমাকে দংশন করুক। এই কথা বলিয়া তিনি স্ত্রীয় কণ্ঠদেশে সেই কীট ধারণ করিলেন। তখনই সেই কীটরূপী তক্ষক নিজ মূর্তি ধারণ করিয়া রাজার কণ্ঠদেশ বেষ্টনপূর্ব্বক ভীষণ গর্জন করিতে করিতে তাঁহাকে দংশন করিল। মহারাজ প্রাণশূন্য হইয়া পড়িয়া গেলেন। মহারাজ পরীক্ষিতের মৃত্যুর পর রাজপুরোহিত ও মন্ত্রিগণ তাঁহার পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করিয়া শিশুপুত্র জনমেজয়কে রাজা করিলেন। শৈশব অবস্থায় থাকায় রাজা জনমেজয় পিতার মৃত্যুর কারণ কিছু জানিতেন না। পরে যথাকালে কাশীরাজ সুবর্ণবর্মার কন্যা বপুষ্টমার সহিত রাজা জনমেজয়ের বিবাহ হয়। মন্ত্রীদের নিকট পিতার মৃত্যুর এইরূপ কাহিনী শ্রবণ করিয়া তক্ষকের উপর প্রতিশোধ লইবার জন্য তিনি দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ হন এবং পুরোহিতদের সহিত পরামর্শ করিয়া সর্পযজ্ঞের আয়োজন করেন। শ্রীমদ্ভাগবতে কথিত আছে (প্রথম স্কন্ধের ১৮শ ও ১৯শ অধ্যায়ে)- মহর্ষি শমীককে অবমাননা করিয়া মহারাজ পরীক্ষিত নিজেই অনুতাপানলে দগ্ধ হইতেছিলেন। সেই সময় ব্রহ্মশাপ অবগত হইয়া তিনি নির্ব্বেদ (বৈরাগ্য) প্রাপ্ত হন এবং শিশুপুত্র জনমেজয়কে রাজসিংহাসনে বসাইয়া হরিদ্বারে গমন করেন। সেখানে পবিত্র গঙ্গাতীরে প্রায়োপবেশনে উপবিষ্ট হইয়া তিনি ব্যাসনন্দন ব্রহ্মর্ষি শুকদেবের নিকট সপ্তাহকালব্যাপী পরম পবিত্র ভাগবত-কথা শ্রবণ করেন। তখন সেখানে অনেকানেক দেবর্ষি, মহর্ষি ও মুনিগণ উপস্থিত ছিলেন।
মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বিরচিত মহাভারত