দেবতা গণেশকে স্মরণ
মনে মনে এই বিশাল মহাভারত রচনা করিয়া মহর্ষি ব্যাসদেব চিন্তা করিতেছিলেন কিভাবে এই শাস্ত্র শিষ্যদের অধ্যয়ন করাইবেন। তখন ভগবান্ ব্রহ্মা তাঁহার নিকট আবির্ভূত হইয়া বলিলেন তুমি দেবতা গণেশকে স্মরণ কর, তিনি তোমার এই গ্রন্থের লিপিকার হইবেন। তাঁহার আদেশে ব্যাসদেব গণেশকে স্মরণ করিলে গণপতি তাঁহার সম্মুখে তৎক্ষণাৎ উপস্থিত হইলেন। ব্যাসদেবের অনুরোধে গণেশ লেখক হইতে সম্মত হইলেন বটে, কিন্তু তিনিও শর্ত আরোপ করিলেন যদি লিখিতে আরম্ভ করিলে আমার লেখনী ক্ষণমাত্রও বিশ্রাম না করে, তাহা হইলে আমি লেখক হইতে পারি। তখন ব্যাসদেব বলিলেন তাহাই হইবে, তবে আমি যাহা বলিব, তাহার অর্থবোধ না করিয়া আপনিও লিখিতে পারিবেন না। উভয়ের এই শর্তে মহাভারত লেখা আরম্ভ হইল।
সেজন্য ব্যাসদেব মাঝে মাঝে এমন কিছু দুর্বোধ্য কূট শ্লোক রচনা করেন, যাহার অর্থবোধ করিবার জন্য সর্ব্বজ্ঞ গণেশকেও লেখনী বন্ধ করিয়া কিছুক্ষণ চিন্তা করিতে হইত। সেই অবসরে ব্যাসদেব আরও বহু শ্লোক রচনা করিয়া লইতেন। সমগ্র মহাভারতে এইরূপ আট হাজার আটশত (৮,৮০০) শ্লোক আছে। সেগুলিকে ব্যাসকূট শ্লোক বলা হয়। এইরূপে তিন বৎসরে উপাখ্যান ভাগসহ লক্ষ শ্লোকাত্মক বিশাল মহাভারত রচিত হইল।
মহর্ষি ব্যাসদেব উপাখ্যান ভাগ বাদে চব্বিশ হাজার শ্লোকে প্রথমে মহাভারত রচনা করেন। তদ্ভিন্ন দেড়শত শ্লোকে সমস্ত পর্বের সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্ত অনুক্রমণিকা-অধ্যায়ে দিয়াছেন। মহাত্মা ব্যাসদেব প্রথমে স্বীয় পুত্র শুকদেবকে এই মহাভারত পড়াইয়াছিলেন। তৎপরে অন্যান্য উপযুক্ত শিষ্যদের উহা শিক্ষা দিয়াছেন। মহারাজ জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞের সময় জনমেজয় ও ব্রাহ্মণগণ পুনঃ পুনঃ প্রার্থনা করিলে ভগবান্ ব্যাসদেব স্বীয় শিষ্য মুনিবর বৈশম্পায়নকে মহাভারত পাঠ করিতে আদেশ দিয়াছিলেন।
পুরাকালে দেবগণ একদা সমবেত হইয়া তুলাদণ্ডের একদিকে উপনিষদসহ চারিবেদ, অন্যদিকে এই ভারত-সংহিতা স্থাপন করিয়া ওজন করিয়াছিলেন। কিন্তু মহত্ত্বে ও ভারবত্তায় এই ভারত সংহিতাই অধিক হইল। তদবধি দেবতারা ইহাকে "মহাভারত" বলিয়া নির্দেশ করিলেন।
অনন্তর সৌতি অতি সংক্ষেপে মহাভারতের মূল আখ্যান এবং প্রত্যেক পর্ব্বের বিষয়সমূহ বর্ণনা করিলেন।
মহর্ষি ব্যাসদেব প্রধানতঃ ধর্ম্মের ও ধার্মিকের জয় এবং পাপের ও পাপীর ক্ষয় প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই মহাভারত রচনা করিয়াছেন। সেজন্য তিনি প্রথমেই ধৰ্ম্মবৃক্ষ ও পাপবৃক্ষ নামে দুইটি মহাবৃক্ষের কল্পনা করিয়াছেন-
যুধিষ্ঠিরো ধর্মময়ো মহাদ্রুমঃ
স্কন্ধোহর্জুনো ভীমসেনোহস্য শাখাঃ।
মাদ্রীসুতৌ পুষ্পফলে সমৃদ্ধে।
মূলং কৃষ্ণো ব্রহ্মা চ ব্রাহ্মণাশ্চ।।
-ঐ, ১/৭২
যুধিষ্ঠির একটি ধৰ্ম্মময় মহাবৃক্ষ; অর্জুন তাহার স্কন্ধদেশ, ভীমসেন তাহার শাখা প্রশাখা; নকুল-সহদেব তাহার পুষ্প ও ফল এবং স্বয়ং ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ, ব্রহ্মা ও ব্রাহ্মণগণ তাহার মূল। আর-
দুর্য্যোধনো মন্যুময়ো মহাক্রমঃ স্কন্ধঃ কর্ণঃ শকুনিস্তস্য শাখাঃ।
দুঃশাসনঃ পুষ্পফলে সমৃদ্ধে
মূলং রাজা ধৃতরাষ্ট্রোহমনীষী।। ঐ, ১/৭১
দুর্য্যোধন একটি অধর্ম বা পাপবৃক্ষ, কর্ণ স্কন্ধ, শকুনি তাহার শাখা; দুঃশাসন পুষ্প ও ফল এবং অবিবেচক রাজা ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন তাহার মূল।
সৌতি বলিলেন-অতএব হে মহর্ষিগণ, আপনাদের ধর্মে মতি হউক। কারণ ধর্মই একমাত্র পরলোকগত ব্যক্তির প্রকৃত বন্ধু। অর্থ ও স্ত্রী সাতিশয় যত্নপূর্ব্বক সেবিত হইলেও কখনও স্থির ও বিশ্বাসযোগ্য হয় না। যদিও আপনারা সর্ব্বদা উদ্যোগী হইয়া ধর্মাচরণে রত আছেন, তবুও এই কথা মহর্ষি স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন-
ধর্মে মতির্ভবতু বঃ সততোত্থিতানাং স হোক এব পরলোকগতস্য বন্ধুঃ। অর্থাঃ স্ত্রিয়শ্চ নিপুণৈরপি সেব্যমানা নৈবাপ্তি-ভাবমুপযান্তি ন চ স্থিরত্বম্।।
-ঐ, ২/৪০১
প্রাচীনকালে ভারতবর্ষে প্রত্যেক আর্য্য বালককে গুরুগৃহে গমন করিয়া গুরুর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শিক্ষা গ্রহণ করিতে হইত। বিদ্যার্থিগণকে গুরুগৃহে কঠোরভাবে ইন্দ্রিয়-সংযম, ব্রহ্মচর্য্য পালন, বিলাসহীন কঠোর জীবন-যাপন এবং কায়মনোবাক্যে গুরুর আদেশ ও নির্দেশ পালন করিতে হইত। গুরুই ছিলেন একাধারে তাহাদের পিতা, মাতা, জ্ঞানদাতা ও পালনকর্তা। গুরু ও বিদ্যার্থিগণের মধ্যে অর্থের আদান-প্রদানের কোন সম্বন্ধ থাকিত না। দেশের রাজা ও ধনী ব্যক্তিগণ অর্থদানে এবং সাধারণ গৃহস্থগণ পুণ্যকৰ্ম্ম বোধে ভিক্ষাদানে গুরুগৃহের ব্যয়-নির্ব্বাহে সহায়তা করিতেন। শিক্ষা সমাপনান্তে সমাবর্তনের সময় বিদ্যার্থিগণ সামর্থ্যানুযায়ী গুরুদক্ষিণা দিতেন।
মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বিরচিত মহাভারত